সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সকলই শোভন

European union's MPs
—ফাইল চিত্র

কিছু কিছু চিত্রের মূল্য সত্যই সহস্র শব্দের সমান। যেমন মঙ্গলবার শ্রীনগরের ডাল লেকে শিকারায় ভ্রমণরত ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলের বহুলপ্রচারিত ছবিখানি। সুসজ্জিত বহুবর্ণ জলযানে সারি সারি বিদেশি পর্যটক, সকলেই দৃশ্যত আহ্লাদিত, কাহারও কাহারও আননে বিকশিত হইয়াছে দন্তরুচিকৌমুদী। চিত্রটি বিমল আনন্দে জানাইতেছে: আমার চোখে তো সকলই শোভন। গত প্রায় তিন মাস যাবৎ কাশ্মীরের পরিস্থিতি যে রূপ, তাহাতে এই দৃশ্য সম্পূর্ণ বিসদৃশ। চিত্রটি বানানো। ঠিক যেমন বানানো ইউরোপীয় অতিথিদের এই সফর। এবং বানানো বলিয়াই তাহা তাৎপর্যপূর্ণ। এই সফরের সংগঠক ও পৃষ্ঠপোষকদের হৃদয়ে উপত্যকার প্রকৃত চিত্রটি মেম-সাহেবদের দেখাইবার কোনও সৎ ইচ্ছা ছিল, এমন কথা মনে করিবার কোনও উপায় নাই। স্পষ্টতই, তাঁহারা বাছাই করিয়া দর্শক আনিয়াছিলেন এবং তাঁহাদের বাছাই করা দৃশ্যাবলি দেখাইয়াছেন। রেডিমেড দ্রষ্টা, রেডিমেড দৃশ্য। আমার চোখে সকলই শোভন না হইবার জো আছে?

কে বা কাহারা এই বিচিত্র উদ্যোগটির ব্যবস্থাপক, তাহা লইয়া রকমারি ধোঁয়াশা বাতাসে ভাসিতেছে। কিন্তু নয়াদিল্লির প্রবল অনুপ্রেরণা ও প্রবলতর সহযোগিতা না থাকিলে কোনও ‘আন্তর্জাতিক বিজ়নেস ব্রোকার’ একটি উচ্চপর্যায়ের রাজনীতিক দলকে কাশ্মীরে ‘কনডাক্টেড টুর’ করাইয়া দিবেন, এমন কথা অতি বড় নির্বোধেও বিশ্বাস করিবে না। প্রতিনিধিদলের প্রায় সকলেই ইউরোপীয় রাজনীতির দক্ষিণমুখী শিবির হইতে সংগৃহীত, যে শিবিরের সহিত শাসকদের কেন্দ্রীয় সরকার ও তাহার চালক দল/পরিবারের আত্মিক সংযোগ নিবিড়, ব্যবহারিক সম্পর্কও উত্তরোত্তর নিবিড়তর। এবং, ইইউ পার্লামেন্টের দুই-এক জন সদস্য উপত্যকার মানুষের সহিত অবাধে কথা বলিবার শর্ত উচ্চারণ করিবামাত্র যে ভাবে দল হইতে ছাঁটাই হইয়াছেন, তাহার অর্থও সহজবোধ্য। স্পষ্টতই, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য বিশ্বের নিকট এই কথা প্রচার করা যে ৩৭০ ধারা বিলোপের পরে কাশ্মীর তোফা রহিয়াছে। প্রচার ও সত্যের মধ্যে দূরত্ব বিপুল। সত্য ইহাই যে, কাশ্মীরে মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন, অবরুদ্ধ জীবন কাটাইতেছেন। যাহাকে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রচারকরা শান্তি বলিয়া প্রচার করিতেছেন তাহাকে শ্মশানের শান্তি বলে। এই সত্য নিশ্চয়ই তাঁহাদের অজানা নহে। তাঁহারা ইহাও জানেন যে, দুনিয়া জুড়িয়া কাশ্মীর লইয়া বিস্তর প্রশ্ন ও সমালোচনা উঠিয়াছে, উঠিয়া চলিয়াছে। এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতেই বিদেশি এমপিদের বাছাই করিয়া আনিয়া কাশ্মীরের সুসমাচার প্রচারের এই বিশেষ উদ্যোগ।

এই চেষ্টার অনৈতিকতা লইয়া উদ্যোগীরা কিছুমাত্র চিন্তিত বলিয়া মনে হয় না। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এই আয়োজন, তাহা কি এতদ্দ্বারা সিদ্ধ হইয়াছে? না কি, বিপরীত ফল ফলিয়াছে? ভূতপূর্ব বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদ বলিয়াছেন, গোটা পরিকল্পনাটিই নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক। মন্তব্যটি অযৌক্তিক নহে। প্রথমত, সফরটি যে সাজানো তাহা সম্পূর্ণ ধরা পড়িয়া গিয়াছে। দ্বিতীয়ত, কাশ্মীর প্রশ্নটিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চের বাহিরে রাখিবার যে নীতি ভারত সরকার একমনে অনুসরণ করিয়া আসিতেছে, বিদেশিদের ডাকিয়া আনিবার ফলে কার্যত ঠিক তাহার বিপরীতটিই ঘটিল। বিদেশ নীতির পক্ষে ইহা অত্যন্ত ক্ষতিকর। তৃতীয়ত, কাশ্মীর ‘স্বাভাবিক’ বলিয়া বিদেশি রাজনীতিকদের আসিতে দেওয়া হইতেছে, অথচ সেখানে এখনও স্বদেশি রাজনীতিকদের প্রবেশ ও চলাচল কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ! ইহা কী ধরনের জাতীয়তাবাদ? এই প্রশ্নগুলির কোনও সদুত্তর নাই, মিথ্যার কারবারে সদুত্তর থাকিতে পারে না। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন আচরণে নৈতিকতা এবং বিচক্ষণতা, দুইয়েরই অভাব বারংবার প্রকট হইয়াছে। কাশ্মীরের প্রমোদভ্রমণ সেই ইতিহাসের নূতন অধ্যায়।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন