জলের অন্য নাম জীবন। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরেও হাজার হাজার ভারতবাসী সেই জীবনের অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। কিন্তু এমন হওয়ার কথা ছিল না। কারণ, এ দেশে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হত এবং ভারতে অনেক নদী আছে। ফলে ভূপৃষ্ঠের জল থেকেই চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল। আর প্রয়োজনে ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডার তো ছিলই। কিন্তু আমরা এক দিকে, সবার জন্য জলের ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই পারলাম না। অন্য দিকে, এমন ভাবে জলের ব্যবহার করলাম যে সামনের প্রজন্ম নিদারুণ সঙ্কটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। 

কৃষি ও শিল্পের ক্রমবিকাশের ফলেও জলের চাহিদা তৈরি হয়েছে। জল ব্যবহারের দিক থেকে কৃষি এগিয়ে থাকলেও শিল্পও খুব একটা পিছিয়ে নেই। বিশেষজ্ঞেরা জানিয়েছেন, এক জন গ্রামবাসী ও এক জন শহরবাসীর দৈনন্দিন জলের চাহিদার মধ্যে এখন খুব একটা ফারাক নেই। তবে শহরে জলের চাহিদা ও অপচয় দু’টিই ক্রমশ বাড়ছে।

ভারতবর্ষ নদীমাতৃক দেশ। এই দেশের ২৪টি নদী উপত্যকাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা রাজ্য। আবার বেশ কয়েকটি নদী একাধিক দেশের মধ্যে দিয়েও প্রবাহিত হয়েছে। আবহমান কাল ধরে এগুলি জলের প্রধান উৎস। এদের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডারও পুষ্ট হয়েছে। তবে যেখানে বৃষ্টিপাত কম, সে ভাবে নদী নেই সেখানে জলের সঙ্কট ছিলই। ছবিটা যে এখনও বিশেষ বদলেছে তা বলা যায় না। কিন্তু এখন জল সঙ্কটপ্রবণ মানচিত্রে জুড়ে গিয়েছে এমন বেশ কয়েকটি শহর যেখানে আগে সঙ্কটের কথা ভাবাও যায়নি, যেমন চেন্নাই। নীতি আয়োগের পরিসংখ্যানই বলছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের বেশ কিছু শহর জলের অভাবে মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। কিন্তু শুধু শহর নয়, সঙ্কট ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামেও। যেমন, মহারাষ্ট্রের বেশ কিছু কৃষিপ্রধান এলাকায় জলের সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। জলের সন্ধানে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হচ্ছে। এলাকায় জলের জোগান দিতে ট্যাঙ্কারে জল সরবরাহ করতে হচ্ছে। 

আসলে আমরা গোড়ায় গলদ করে ফেলেছি। ভূপৃষ্ঠের জলের ঠিকমতো ব্যবহারের উপরে জোর না দিয়ে ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবহারের উপরে জোর দিয়েছি। পাম্পের ব্যবহার করে সহজে মাটির জল তুলতে শুরু করেছি। এতে এক দিকে, ভূগর্ভস্ত জলস্তর নীচে নামছে থেকেছে, অন্য দিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দূষণের আশঙ্কাও। আর্সেনিক ও ফ্লুরিনঘটিত নানা যৌগ (যেমন, আর্সেনাইড, ফ্লুওরাইড প্রভৃতি) জলে মিশ্রিত অবস্থায় উঠে আসছে। তা সরাসরি শরীরে প্রবেশ করে নানা অসুখের কারণ হয়ে উঠছে। পাশাপাশি, কৃষিক্ষেত্রে অনেক জায়গায় এই ভূগর্ভস্থ জলই ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেকের মতে, সবুজ বিপ্লবের হাত ধরে কৃষিক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবহার বেড়েছে। ফসলের মধ্যে দিয়ে এগুলি আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। এর মধ্যেই আর্সেনিক দূষণের কবলে পড়েছেন দেশের ৮৬টি জেলার মানুষ। পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমানের বিস্তীর্ণ অংশও ‘আর্সেনিক প্রবণ’ বলে ঘোষিত হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে কালনা, পূর্বস্থলী, কাটোয়ার মতো গ্রামীণ ও কৃষিনির্ভর এলাকাও।

জল নিয়ে সঙ্কট কিন্তু সংঘর্ষের দিকেও গড়াচ্ছে। ২০০০ সালের শীতের সময় গুজরাত সরকার কঙ্কাবতী বাঁধের জল জামনগর শহরের মানুষের জন্য রাখা হয়েছিল। এর প্রতিবাদে অন্য এলাকার মানুষ পথে নামে। পুলিশের গুলিতে তিন জনের মৃত্যু হয়। ২০০৩ সালে মহারাষ্ট্র সরকার তাদের জলাধারের এক চতুর্থাংশ জল সংরক্ষণ করেছিল শিল্প ও শহরের জন্য। এতে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন গ্রামের কৃষিজীবীরা। পরিস্থিতি কতটা সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১৬ সালের মার্চে। খরাগ্রস্ত মহারাষ্ট্রের লাতুরে জল নিয়ে দাঙ্গার ভয়ে প্রশাসনকে ১৪৪ ধারা জারি করা থেকে। চোখ ফেরান জেলায়। আমরা দেখেছি, পশ্চিম বর্ধমানের কাজোরা-সহ জামুড়িয়া, অণ্ডাল ও রানিগঞ্জ ব্লকের বেশ কয়েকটি এলাকায় বর্ষা বাদে অন্য সময়ে জল সমস্যা মেটানোর জন্য ট্যাঙ্কারে করে জল পাঠাতে হচ্ছে। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, শীতের শেষ দিক থেকে গ্রীষ্মের প্রথমভাগ পর্যন্ত জলাশয়গুলিতে জল মেলে না। পাশাপাশি, ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে যাওয়ায় টিউবওয়েলগুলিতেও জল মেলা না। সব মিলিয়ে সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করে। 

জলের অপচয়ের পাশাপাশি, মাটির উপরিতলকে ক্রমে কংক্রিটের আস্তরণে ঢেকে ফেলা, পুকুরের মতো জলাশয়গুলিকে পর পর বুজিয়ে ফেলায় সমস্যা তীব্রতর হয়ে উঠেছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডারপুষ্ট হওয়ার পথে বাধা তৈরি হয়েছে।বৃষ্টির জল চুঁইয়ে ভূগর্ভে পৌঁছতে পারছে না। ফলে সেই জলের ভাণ্ডার কমেই চলছে।

নদীর জল ব্যবহারের প্রয়োজন। কিন্তু সেই জলের ভাগ নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে দেশ ও রাজ্যগুলি। তিস্তা ও পদ্মার জল নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের সমস্যার কথা আমরা জানি। কাবেরীর জল নিয়ে তামিলনাড়ু ও কর্নাটকের বিরোধ সুপ্রিম কোর্টে গড়িয়েছে। দেখা যাচ্ছে নদীতে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ ও সংশ্লিষ্ট জলাধার থেকে জল সরবরাহের জন্য যে প্রকল্পগুলি রয়েছে তা থেকেও জল পাওয়ার পরিমাণ কমছে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ৭১টি প্রধান জলাধারের জল ধারণক্ষমতা বেশ কমে গিয়েছে। জলের সঙ্গে বনসৃজনের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রয়েছে। গাছের সংখ্যা বাড়লে ভূগর্ভে জলের সঞ্চয়ও বাড়বে। কিন্তু গাছ কাটার ফলে জলের সঞ্চয়েও টান পড়ছে। ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডারকে মজবুত করতে হলে গাছের সংখ্যা বাড়ানোও একান্ত প্রয়োজন। ভারত-সহ সারা বিশ্বের পরিসংখ্যান বলছে অরণ্যও ক্রমেই কমছে। ফলে আশার আলো নিভে আসছে।

 

কাটোয়ার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মী