Advertisement
E-Paper

ভাঙতে ভাঙতে ভুঁই ছুঁয়েছে কুন্তীর একরত্তি ঘর

বয়স হয়েছে, রেশন কার্ড এখনও অধরা। কোনও রকমে পড়শিদের দয়ায় বেঁচেবর্তে থাকা—এমনই বয়স্কদের ভাঙা ঘরে উঁকি মারলেন বিমান হাজরা

বিমান হাজরা

শেষ আপডেট: ১৫ মে ২০২০ ০৩:৫৩

ঘর ভেঙে পড়েছে, বিপিএলে নাম, অশীতিপর কুন্তীরা তবু সমাজের চোখে যেন ব্রাত্য। একাশি বছরের কুন্তী রাজমল্ল সরকারি নথিতে বিপিএল তালিকাভুক্ত। কিন্তু এ পর্যন্ত তিন তিন বার আবেদন করেও তাঁর জোটেনি খাদ্যসাথীর রেশন কার্ড।

আজ গোটা জেলা জুড়েই অজস্র কুন্তীর দেখা মিলবে যে গ্রামে যাবেন সেখানেই। করোনার লকডাউন না এলে হয়তো জানাই যেত না এদের দুর্দশার কথা। মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘির মণিগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের এই একটি মাত্র গ্রাম সংসদেই কুন্তীদেবীর মতো অন্তত ৩০৮ জনের কোনও রেশন কার্ড জোটেনি।

মণিগ্রামের কাছারি বাড়ির খাস জমিতে তাঁর টিনের ছাউনি দেওয়া বাসগৃহ এখন ভাঙতে ভাঙতে মাটি ছুঁয়েছে। আশ্রয় নিয়েছেন এক প্রতিবেশীর ঘরে। তাঁর দুই ছেলে বিয়ে করে সঙ্গ ছেড়েছে মায়ের। সরকারি রেশন সামগ্রী না পাওয়ায় তাঁকে পেট চালাতে হাত পাততে হয় অন্যের কাছে, কখনও বা রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া বোতল বিক্রি করেই ভাত জোটে তাঁর।

Advertisement

নিজের বাড়ির দিকে আঙুল উঁচিয়ে কুন্তীদেবী বলছেন, ‘‘৪০ বছর আগে মারা গিয়েছেন স্বামী পঞ্চ রাজমল্ল। তাঁরই করে যাওয়া বাড়ি ঝড়ে ভেঙে পড়েছে। তিন বার রেশন কার্ডের জন্য আবেদন করে জুটেছে একটা বারকোড। বিনা পয়সায় চাল নিতে সেটাই দেখিয়েছিলাম রেশন দোকানে। ফিরিয়ে দিয়েছে। গত সপ্তাহে পঞ্চায়েতে গিয়ে ফের দরখাস্ত দিয়ে এসেছি। চাল, ডালটুকু পেলে একটা পেট ঠিক চলে যেত।’’

তবে বরাতটা ভাল কুন্তীদেবীর। দিন সাতেক আগে এই প্রথম বার্ধক্য ভাতার এক হাজার টাকা হাতে পেয়েছেন তিনি ‘জয় বাংলা’। সেই টাকায় ক’দিন থেকে দুটো ভাত, আলু বেগুনের ঝোলটা জুটছে তাঁর।

রেশন কার্ড জোটেনি এমন মানুষের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করেন শাসক দল তৃণমূলেরই পঞ্চায়েত সদস্য শিপ্রা সাহা। তিনি বলছেন, ‘‘আমার কাছে ৩০৮ জনের পূর্বের বারকোড সহ আবেদন জমা পড়েছিল। আমি সেগুলি একত্রিত করে জমা দিয়ে এসেছি পঞ্চায়েত অফিসে। এঁরা সকলেই এর আগে কখনও পঞ্চায়েত অফিসে, কখনও ব্লক অফিসে তিন বার করে জমা দিয়েছেন রেশন কার্ডের জন্য আবেদন। বারকোড ছাড়া কিছুই জোটেনি তাঁদের।”

শাসক দলের পঞ্চায়েত সদস্যও ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না রহস্যটা কোথায়? যাঁরা কম্পিউটারে চেক করেছিলেন তাঁরা কেউ কেউ দেখেছেন রেশন কার্ড পেয়েও গিয়েছেন, দেখাচ্ছে ওয়েবসাইটে। কিন্তু সে কার্ড কোথায় জানেন না তারাও। বলছেন শিপ্রাই।

৬৫ বছরের মহামায়া রাজমল্লের স্বামী নিখোঁজ দীর্ঘ দিন। মহামায়া বলছেন, “বাড়িতে ৫ জন লোক। সকলের জন্যই এক সঙ্গে রেশন কার্ডের জন্য আবেদন জমা করেছি একটাই ফর্মে। কিন্তু তাদের মধ্যে ১২ বছরের নাতি তন্ময়ের নামে একটিমাত্র রেশন কার্ড জুটেছে। সেই একটি রেশন কার্ডের চাল, আটাই ভাগ করে খাচ্ছি ৫ জন মিলে।” তিনিও বুঝে পাচ্ছেন না এটা কী করে সম্ভব?
৮০ বছরের অলকা কর্মকারের পরিবারের লোকসংখ্যা ৫ জন। আগে বার্ধক্য ভাতা পেতেন। তাও বন্ধ ৬ মাস। বলছেন, “রেশন কার্ড চেয়ে আবেদন করেছি অনেক বার। টিকিটও দিয়েছে। কার্ড না পেয়ে খোঁজ নিতে গেলে বিডিও অফিসের কর্মীরা পাত্তা দেয় না, পঞ্চায়েত দূর ছাই করে। রেশনে চাল ক’টা পেলে হয়তো দুঃশ্চিন্তাটা কমত।”

ষাটোর্ধ্ব সন্ধ্যা রাজমল্লের ভাগ্যেও জোটেনি রেশন কার্ড। ৫ জনের পরিবার চলত ছেলের মুরগি বিক্রির ব্যবসা থেকে। সে ব্যবসা লকডাউনে বন্ধ। গ্রামবাসীদের ভাত জোটে না, মুরগি খাবে কে?”
বছর ৬৪ বয়সের বাবলু রাজমল্লের আগে একটি রেশন কার্ড ছিল। সেটা বাতিল হয়ে আবার কার্ডের জন্য আবেদন জমা দিয়েছিলেন। বাবলু বলছেন, “কার্ড না মিললেও ৫ জনের জন্য আমার পরিবারের টোকেন এসেছিল। এক স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলার কাছে জানতে পারি সেই টোকেন গাদী গ্রামে চলে যায়। সেখানে ওই নামে কাউকে না পেয়ে টোকেন ফেরত গিয়েছে ব্লক অফিসে। গেলাম ব্লক অফিসে। কিন্তু টোকেনের হদিস মেলেনি আজও। ফলে
রেশন জোটেনি।”

যদু রাজমল্লের বাড়িতে ৩ জন লোক। আবেদন করেও বাড়িতে কার্ড আসেনি। যদুর কথায়, “এক জনের কথায় কম্পিউটারে নেট থেকে কাগজ বের করে দেখি আমার ৩টি কার্ডই ইস্যু হয়েছে। পঞ্চায়েতে গেলাম। বলল বিডিও অফিসে যেতে। কিন্তু সেখানেও কার্ডের হদিশ মেলেনি। অফিসেরই একজন পরামর্শ দিল থানায় ডায়েরি করে ফের ৪ নম্বর ফর্ম পূরণ
করতে হবে।’’

কুন্তীদেবীর বাড়িতে দাঁড়িয়ে যখন তাঁর দুর্ভাগ্যের রোজনামচা শুনছি ঠিক তখনই হাতটা বাড়িয়ে সামনে দাঁড়ালেন এক মহিলা। বুঝতে অসুবিধে হয়নি তিনি অন্তঃসত্ত্বা। নাম রেশমি বিবি। বাড়ি পাশের গ্রাম কিসমত গাদী। বলছেন, “তিন মাস থেকে স্বামী সায়েম শেখ কাজে গিয়ে ওড়িশায় আটকে। টাকা পয়সাও আসছে না। রেশন কার্ডের আবেদন জমা দিলেও তা পাইনি। কী করব, সংসার চলে না। শুক্রবার ক’টা চাল পেয়েছিলাম। সকালে সেটাই আলু ভাতে ফুটিয়ে দুই ছেলেমেয়েকে বাড়িতে খাইয়ে মণিগ্রামে এসেছি ভিক্ষে করতে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেও।”

রেশন কার্ড না পাওয়ার কেন এত অভিযোগ? মনিগ্রামেই এক খাদ্য পরিদর্শক তা খতিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন সাগরদিঘির মণিগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতে এ মাসের প্রথম সপ্তাহে। পঞ্চায়েত সদস্য শিপ্রা বলছেন, “বিক্ষোভের মুখে পড়লে পুলিশ ও বিডিওকে ডেকে কোনও রকমে রেহাই পান তিনি।”
কী বলছে খাদ্য দফতর?

খাদ্য দফতরের মুর্শিদাবাদ জেলা নিয়ামক সাধনকুমার পাঠক বলছেন, ‘‘যাঁদের রেশনকার্ড নেই, তাঁদের তা দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। কিন্তু এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

Coronavirus covid 19
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy