Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৮ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

প্রবন্ধ

গ্রিস আমাদের কী শিক্ষা দিচ্ছে

রণবীর সমাদ্দার
১২ মে ২০১৫ ০০:০২
আর্তি। সিন্‌টাগমা স্কোয়ার, আথেন্স, গ্রিস। মে ২০১৫। ছবি: রয়টার্স।

আর্তি। সিন্‌টাগমা স্কোয়ার, আথেন্স, গ্রিস। মে ২০১৫। ছবি: রয়টার্স।

ই উরোপীয় ইউনিয়নের আদি সদস্য গ্রিসের অবস্থা এখন ‘ন যযৌ ন তস্থৌ’। একমাত্র আরও ঋণ নিয়ে পুরনো ঋণের সুদ দেওয়া এবং পুরনো ঋণের কিছুটা করে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা ছাড়া সম্ভবত গ্রিসের সামনে অন্য পথ নেই। ২০০৮-০৯-এর মন্দা গ্রিসকেও আঘাত করে, যেমন আরও নানা দেশকে করেছিল। ২০১০-এ ইউরো মুদ্রাভুক্ত দেশগুলো, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) এবং আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার (আইএমএফ) গ্রিসকে ১১০ বিলিয়ন অর্থাৎ ১১০০০ কোটি ইউরো ঋণ দেয়। শর্ত ছিল, ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কার প্রবর্তন করা চাই অবিলম্বে।

ইতিমধ্যে গ্রিসকে দেওয়া হয় এক দ্বিতীয় দফা ঋণ, প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ইউরোর মতো। এবং গ্রিসের ব্যাংকগুলো যাতে পুঁজি নিয়ে আবার কাজ করতে পারে, তার জন্য ৪৮ বিলিয়ন ইউরো। আর্থিক সংকোচনের শর্তে গ্রিসকে ঋণ দেওয়া হতে থাকল ২০১৪ পর্যন্ত। জনজীবনে আর্থিক সংকোচনের ফল হল ভয়াবহ। চাকুরি, মজুরি, আয় সংকোচ হল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় নেমে গেল প্রচণ্ড ভাবে। তিন মহাজন, অর্থাৎ ইসিবি, ইউরোপীয় কমিশন এবং আইএমএফ— ‘ট্রয়কা— গ্রিসের সার্বভৌমত্ব প্রায় নিঃশেষ করল। কিন্তু জনসাধারণ তো বলেনি যে এ ভাবে দেশ চালাতে। গ্রিসের সামরিক খাতে ব্যয় জাতীয় অর্থনীতির অনুপাতে ইউরোপের শীর্ষ ব্যয়কারী দেশগুলির অন্যতম। জনসাধারণ বলেনি যে, সামরিক খাতে এত ব্যয় করতে হবে এবং তুরস্কের সঙ্গে এত বিবাদ রাখতে হবে। জনসাধারণ বলেনি যে, দুটো বন্দর, জাহাজ ব্যবসায় এবং পুরনো সভ্যতা সংস্কৃতির নিদর্শনের ব্যবসার মধ্যে দেশকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। গ্রিসের সর্বাপেক্ষা কম মজুরির এবং কম সম্মানের কাজ করত এবং এখনও করে বাইরের শ্রমিকরা। ইউরোপের বিলাসী, অনুৎপাদক জীবনযাত্রায় গ্রিসের ধনী, মধ্যবিত্তের একাংশ এবং প্রায় গোটা রাজনৈতিক শ্রেণি মত্ত ছিল, যখন অবশেষে জনসাধারণ বেঁকে বসল।

এই নয়া উদারনৈতিক কর্মসূচি, সার্বভৌমত্ব বিসর্জন এবং এক সামগ্রিক বাজারি অভিমুখের বিরুদ্ধে গ্রিসের জনসাধারণ একজোট হল, যার ফলে এল ২০১৫-র জানুয়ারি নির্বাচনে গ্রিসের বামপন্থী দল সিরিজার বিজয়। সিরিজার জয়ে ইউরোপীয় ধনকুবেরদের টনক নড়ল। তারা শঙ্কিত হয়ে পড়ল, মহাজনী ব্যবসায় এ বার যদি ছেদ ঘটে! ঋণ দেওয়া বন্ধ হল। বলা হল, বেসরকারিকরণ কর্মসূচি জবরদস্ত ভাবে চালিয়ে গেলে সরকারের হাতে যে-টাকা আসত, তা দিয়ে ঋণ অনেকটা শোধ হত। অর্থাৎ, দেশের সম্পত্তি বেচে দেশ বাঁচাও!

Advertisement

দোটানা

সতর্কতা, প্রাজ্ঞতা, রক্ষণশীলতা এবং স্থবিরতা হল সব দেশের, সব কালের সরকারি বৈশিষ্ট্য। আমাদের দেশে ১৯৭৭-এর পরে বামপন্থী সরকারের যে হাল হয়েছিল, সিরিজার প্রায় তথৈবচ অবস্থা। জনতা যদি দু’পা এগোতে চায়, সরকার এগোবে বড় জোর আধ পা। ফলে নতুন করে ঋণদানে তিন মহাজন অসম্মত হতেই নবনির্বাচিত গ্রিক প্রধানমন্ত্রীকে দৌড়তে হল ব্রাসেলস এবং বার্লিনে। ক্রমাগত আলোচনায় কোনও ফল হয়নি। সিরিজা ঋণ চায়, মহাজনরা শর্ত বিনা ঋণ দেবে না। জনসাধারণ এ দিকে হতাশ হয়েছে। হতোদ্যম মানুষ ভাবছে, সিরিজাও কি পুরনো পথ নেবে?

ইউরোপীয় ব্যাংকের নীতি হল, যে কোনও মূল্যে ঋণগ্রস্ত দেশগুলিকে ঋণ প্রত্যাবর্তনে বাধ্য করা। এই ঋণ অর্থপতি এবং শাসককুলকে স্থূলকায় করেছে, দুর্নীতি, কর ফাঁকি, রাজস্ব নীতিতে নানা সুবিধা, অস্ত্র ব্যয় এবং এক নির্দিষ্ট ধরনের শিল্প নীতির মাধ্যমে। এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনীতি এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে সাধারণ শ্রমজীবীদের জীবনকে ক্রমাগত অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেওয়ার নীতি।

সিরিজা সরকার ক্ষমতায় এসেছিল জাতীয় সম্পদের ওপর গণতান্ত্রিক অধিকার স্থাপনের স্লোগান দিয়ে। কিন্তু সেই স্লোগান থেকে নবনির্বাচিত সরকার পিছিয়ে আসছে মহাজনত্রয়ীর সঙ্গে কথাবার্তার প্রয়োজনে। কারণ, অন্য যে পথ ছিল সিরিজার সামনে কথাবার্তার অস্ত্র হিসেবে, তা হল, দেশকে দেউলিয়া ঘোষণা করা। তাতে ইউরোপীয় মুদ্রা ইউরোর ওপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম হত। কিন্তু এ ধরনের ‘দেউলিয়া ঘোষণা’ শুধু আন্দোলনের থেকেই জন্ম নিতে পারে। হয়তো সিরিজা সমগ্র ইউরোপ মহাদেশে তেমন এক আন্দোলন গড়তে চায়। কিন্তু আপাতত সিরিজা পিছিয়ে এসেছে কথাবার্তার তাগিদে, বিশেষত সামাজিক সম্পদের উপর গণপ্রভুত্ব স্থাপনের ক্ষেত্রে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং গ্রিসের মাঝে গত দু’মাসের কথাবার্তায় গ্রিক জনসাধারণের ইচ্ছার মর্যাদা দেওয়া হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সে দায়ও নেই। এই সম্মিলিত ইউরোপ আসলে এক আন্তঃরাষ্ট্রিক সংস্থা, যার গণতান্ত্রিক নির্যাস মানবাধিকারের কিছু উদারনৈতিক কথাবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই প্রতিষ্ঠানের কাজ হল, সামাজিক সম্পদ ক্রমাগত কমিয়ে আর্থিক প্রভুত্বের শক্তি বৃদ্ধি করা। কাজেই, এ এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে ইউরোপের সম্মিলিত মুদ্রা ইউরো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা অনেকে ভাবতে শুরু করেছে।

গ্রিস সত্যিই ইউরো থেকে বেরিয়ে এলে তার কী ফল হতে পারে? সে ক্ষেত্রে গ্রিসের সরকার জাতীয় অর্থনীতির প্রসারের জন্য উপযোগী আর্থিক এবং মুদ্রানীতি নিতে পারে, মূল্যস্ফীতি সংক্রান্ত নিজস্ব নীতি প্রণয়ন করতে পারে। তার সঙ্গে সঙ্গে তারা দেশের বাণিজ্য নীতির সংস্কার করতে পারে, নিজের দেশের ব্যাংকের জন্য নিজস্ব রক্ষাকবচ তৈরি করতে পারে। যদিও অসুবিধাও হবে অনেক। কিন্তু দুর্বার বিশ্বায়নের এই যুগে সেই দুঃসাহস দেখানোর ক্ষমতা কি গ্রিস এবং সিরিজার আছে? গ্রিক সরকার আপাতত পিছিয়েছে ইউরোপের হুমকির সামনে। কিন্তু স্পেন, পর্তুগাল, ইতালির শ্রমজীবী এবং দেশপ্রেমিক জনসাধারণ তাকিয়ে আছে গ্রিসের দিকে। সিরিজা ইউরোপীয় অর্থপতিদের সম্মিলিত শক্তির সামনে কত দূর বলতে পারবে যে, আমরা আমাদের পথ থেকে সরব না? আর্থিক স্বনির্ভরতার সে পথে কষ্ট আছে, বাধা আছে। নানা সুবিধায় অভ্যস্ত গ্রিক জনসাধারণ পারবে সেই পথ নিতে?

নৈরাজ্যবাদী স্বপ্ন

ইউরোপের কিছু কিছু শহরে কান পাতলেই এখন শোনা যাবে যে ইউরোপে বিপ্লব আসন্ন। মাদ্রিদের নানা আলোচনাকক্ষে শোনা যাবে উত্তেজিত বিদ্রোহী কণ্ঠ। গ্রিক সংকট হল ইউরোপীয় বিপ্লবের পূর্বমুহূর্ত। এক অনাগত ইউরোপীয় নাগরিক সমাজের আন্দোলনের ভরসায় এই নৈরাজ্যবাদীরা। এদের সঙ্গে কথা বলুন, এরা বলবে, গ্রিস ইউরোপীয় পুঁজিবাদের প্রথম শিকার। এর উত্তর আসবে মহাদেশ জুড়ে। কিন্তু কোথায় সে প্রত্যুত্তর?

ইউরোপের অভ্যন্তরীণ মানসিক শক্তি আজ তলানিতে ঠেকেছে। যুক্ত প্রতিরোধের যে-স্বপ্ন নৈরাজ্যবাদীরা দেখছে, সেই স্বপ্ন এখনও অধরা। সিরিজার নেতা গ্রিক প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই বলেছেন, ইউরোপ তাঁদের সংগ্রামে সহায়তা দানে ব্যর্থ হয়েছে।

ফলে, এই সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে যে, জাতীয় প্রতিরোধের পতাকা গ্রিসে বামপন্থীদের হাত থেকে চলে যেতে পারে। তখন গ্রিসে অর্থনীতি বাঁচানোর নামে উগ্র দেশপ্রেম, বিদেশি শ্রমজীবী মানুষের ওপর আক্রমণ, বর্ণান্ধতা বাড়বে। গণতন্ত্র অন্য দিকে মোড় নেবে। বাস্তববাদিতা এবং জাতীয় প্রতিরোধ ছাড়া পথ নেই। প্রয়োজনে ইউরোপের সম্মিলিত মুদ্রা ইউরো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তার মানে ইউরোপ ত্যাগ নয়। ইউরোপের অনেক দেশ আছে, যেমন সুইডেন, যাদের নিজস্ব মুদ্রা আছে।

গ্রিস হল এক অভ্যন্তরীণ নয়া উপনিবেশ। এই যুগে কোনও আন্তর্জাতিক পুঁজি ঋণগ্রস্তদের বাঁচাবে না, দরিদ্র দেশকে উন্নত করবে না, যতক্ষণ না এই বিশ্বায়নের যুগে দেশগুলি ন্যূনতম ভাবে আত্মনির্ভর হচ্ছে। এই উপলব্ধিতে পৌঁছচ্ছে যে, নিজের জনসাধারণের এবং আত্মমর্যাদার জন্য রাষ্ট্রকে দৃঢ় হতে হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ক্যালকাটা রিসার্চ গ্রুপ-এর অধিকর্তা। মতামত ব্যক্তিগত।

আরও পড়ুন

Advertisement