রাজ্য-রাজনীতি এই মুহূর্তে এক অদ্ভুত মোড় নিয়েছে। এখনই একে ক্রান্তিকাল বললে অবশ্যই সেটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। তবে পরিস্থিতি যে ভাবে গড়াচ্ছে, তাতে জটিলতা যে আরও বাড়বে, তা অনুমান করা যায়। সে ক্ষেত্রে বহু আকস্মিকতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়ার নয়। কবে, কী ভাবে, কোন দিক থেকে কী ঘটবে বা ঘটানোর চেষ্টা হবে, এখনই সেটা বলা কঠিন। তবে ‘মূল’ লক্ষ্য সম্পর্কে কোনও ধন্দের কারণ আছে বলে মনে হয় না। আগামী দিনগুলিতে রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভাবে যত রকমে সম্ভব খুঁচিয়ে যাওয়াই হবে বিজেপির অন্যতম কৌশল। তারা চাইবে, সেই পাতা ‘ফাঁদ’-এ মমতা পা দিন!

ভোট মেটার দিন পনেরোর মধ্যেই রাজ্যে খুনোখুনির যে বাতাবরণ তৈরি হল, তা উদ্বেগজনক হলেও বিস্ময়ের তেমন কিছু নেই। বস্তুত সকলেই জানেন, নির্বাচনের ফল এই ‘সংগ্রাম’-এর উৎস। এবং তার পরিণামে এই সবই হওয়ার ছিল। তবে তার দায় একা বিজেপি বা একা তৃণমূলের উপর চাপালেও সেটা অতি সরলীকরণ হয়ে যাবে। ভাগাভাগির কমবেশি নিয়ে তর্ক থাকতে পারে। কিন্তু তালি এক হাতে বাজে না। ইট ও পাটকেল সর্বদাই পরস্পরের পরিপূরক! তারা তাদের কাজ করছে।

বিরোধীরা পথে নেমে আন্দোলন করবেন, শাসক তাতে বাধা দেবেন— এটাই রাজনীতির স্বাভাবিক ধর্ম। চিরকাল এটা হয়ে এসেছে। কিন্তু সেই আন্দোলন বা প্রতিবাদ যখন ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং রক্তক্ষয়ী লড়া‌ইয়ের চেহারা নেয়, তখন বুঝতে হবে কোথাও সেই প্রতিরোধের  ‘জোর’ বাড়ছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বার বার এমন দৃষ্টান্তের সাক্ষী। 

কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বামেদের আন্দোলন তেমন মাত্রায় পৌঁছেছিল বলেই রাজ্যে প্রথম অ-কংগ্রেসি যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসে। অগ্রজ সাংবাদিকদের কাছে শুনেছি, একটা সময় এসেছিল যখন বিরোধীরা একটা বাসে আগুন দিলে ‘জনগণ’ সোৎসাহে আর চারটি বাস পোড়ানোর প্ররোচনা দিত! অর্থাৎ, মানুষ চাইত শাসক ধাক্কা খাক।

বামেদের বিরুদ্ধে মমতার নেতৃত্বে তৃণমূলের একের পর এক আন্দোলন সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। তাঁর আন্দোলন খুব কমই ‘অহিংস’ থাকত। প্রতিরোধ, মারামারি, লাঠি-গুলি-রক্তপাত, জীবনহানিই ছিল বেশি। আজকের মুখ্যমন্ত্রী নিজে তার সামনে থাকতেন। আপাদমস্তক ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন তিনি। মার খেয়ে প্রাণসংশয় হয়েছে কত বার। তবু রাস্তা থেকে তিনি সরেননি। মানুষও তাঁর পাশ থেকে সরে যায়নি। অবশেষে সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রাম বৃত্তটি সম্পূর্ণ করে। সিঙ্গুরে জমি-আন্দোলনের ফলে রাজ্যের শিল্পায়ন ঘা খাবে কি না, সেই বিচারের চেয়ে বেশি ‘চাহিদা’ তখন সিপিএমকে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার। নন্দীগ্রামে নির্বিচার গুলি চালিয়ে লোক মারার ঘটনা সমাজের গণ্যমান্যদের দলীয় পতাকার বাইরে একসঙ্গে হাঁটার জায়গা করে দেয়। সেই মিছিল আজও স্মরণযোগ্য। এ-সবেরই পুরো ‘সুফল’ পান মমতা। ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচনেই  ক্ষমতাসীন বামফ্রন্টকে পিছনে ফেলে মমতার তৃণমূল বেশি আসন পেয়ে যায়। এর পরে ২০১১ নিয়ে আর কোনও সংশয় ছিল না। 

এ ক্ষেত্রে একটি লক্ষণীয় বিষয় হল, বিরোধী হিসেবে বাম বা তৃণমূল বিভিন্ন সময় যে সব আন্দোলনের মাধ্যমে শাসকদের চাপে ফেলতে পেরেছে, সেগুলির পিছনে কোনও না কোনও রাজনৈতিক, সামাজিক, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট দাবি থাকত। কোনওটা দাগ কেটেছে, কোনওটা কাটেনি। কোনওটা অধিকাংশ মানুষের সমর্থন পেয়েছে, কোনওটা পায়নি। কিন্তু প্রতিবাদের পন্থা ছিল দীর্ঘমেয়াদি। ‘ফল’ রাতারাতি ফলেনি।

ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আজকের বিরোধীপক্ষের ‘আন্দোলন’-এর ছবিটা বেশ অন্য রকম। আপাতত যেটা বেশি ভাবাচ্ছে, তা হল এখনকার সংঘাত এবং তার চরিত্র। এক কথায় বললে, রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল বিজেপির এখনকার দাপাদাপি আসলে দ্রুত নিজেদের দখলদারি কায়েম করার। এর উপর কোনও বৃহত্তর জনস্বার্থ, নীতিগত অবস্থান বা সামাজিক বিষয়ের তকমা সেঁটে দিলে তা হবে সত্যের অপলাপ। 

সবাই বোঝেন, আসনের হিসেবে তৃণমূল কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বিজেপি ১৮টি আসন পেয়ে যাওয়ায় রাজ্যের রাজনৈতিক হাওয়া বদলে গিয়েছে। শাসক দল মানুক বা না-মানুক, আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে মমতার সরকারের পক্ষে এটি খুব স্বস্তিকর নয়। তাঁর পক্ষে আরও বিড়ম্বনার হল, সিপিএম এবং কংগ্রেসের কার্যত মুছে যাওয়া। সরাসরি তৃণমূল বনাম বিজেপি লড়াই হলে ভোট ভাগের অঙ্কটাও অন্য রকম হতে বাধ্য। বস্তুত লোকসভার ফলের ভিত্তিতে তৃণমূল এবং বিজেপির ভোটের ভাগ অনেকটাই কাছাকাছি। তৃণমূল ৪৩ শতাংশ, বিজেপি ৪০।

এই অবস্থায় তৃণমূল ভোটের ফলের প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই বিজেপির আগ্রাসী ভূমিকায় মাঠে নেমে পড়া এক সুচিন্তিত কৌশল। আর এই লড়াইয়ের পিছনে বেশির ভাগই রয়েছে এলাকা দখল, পার্টি অফিস দখল, জোর করে মিছিল বার করে উত্তেজনা সৃষ্টির মতো ঘটনা। শাসক দল এবং সরকার সর্বত্র বাধা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তৃণমূল দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে উপযুক্ত সংযম দেখাচ্ছে না। বরং কথায়-কাজে আগুনে ঘি ঢালছে তারাও। সব মিলিয়ে আগুন নিভছে না। পরিণাম অনিবার্য ভাবেই গড়াচ্ছে আইনশৃঙ্খলা অবনতির দিকে। বল চলে যাচ্ছে দিল্লিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে বসে থাকা অমিত শাহের কোর্টে। 

বিজেপির কৌশল তো এটাই! রাজ্যে ৩৫৬ জারি করে সরকার ভেঙে দেওয়ার হুমকি সেই পথেই সুচিন্তিত পদক্ষেপ। খোদ রাজ্যপালের কথাতেও যে ইঙ্গিত অনেকটা পরিষ্কার।

বিজেপি জানে, তৃণমূল থেকে বিধায়ক ভাঙিয়ে সরকার ফেলার জন্য এই মুহূর্তে প্রায় দেড়শো জনের সমর্থন দরকার। তা মুখের কথা নয়। কেন্দ্রে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার জোরে সরকার ভেঙে দেওয়ার ‘চাপ’ তৈরি করা তুলনায় সহজ। যদিও এ ভাবে সরকার ভাঙলে মমতাই হয়তো আখেরে লাভবান হবেন। কিন্তু এটাও বুঝতে হবে, প্ররোচনা দিয়ে রাজ্যকে অগ্নিগর্ভ করে তুলতে পারলে সেটা ‘প্রশাসক’ মমতার বিরুদ্ধে যেতে পারে। 

অন্য দিকে মমতা আরও দু’বছর কাজ করার সময় পেলে নিজের জমি ফের শক্ত করে ফেলবেন না, তা-ও বলা যায় না। কারণ বিরোধী রাজনীতি করার সময় ধাক্কা খেয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা তিনি একাধিক বার দেখিয়েছেন। যদিও তা ছিল মূলত আন্দোলননির্ভর। এখন তাঁরও অবস্থান বদলেছে। শাসকের আসনে বসা মমতা সেই কাজে কতটা দক্ষতা দেখাতে পারবেন, সেটা ভবিষ্যৎ বলবে। ইতিমধ্যেই এক জন পেশাদার ভোট-কুশলীকে ডেকে আলোচনা শুরু করে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, লড়াইটা শক্ত জমিতেই হবে এবং তার প্রস্তুতিতে তিনি নেমে পড়েছেন।

অতএব রাজ্যে অশান্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মমতা যদি ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকেন এবং সেই সুবাদে নিরন্তর কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকে রাজ্যে খোঁচা আসতে থাকে, তা হলে ‘লাভ’ হবে কার— তৃণমূলের, না বিজেপির?

উত্তর নিষ্প্রয়োজন।

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও।সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।