বিগত বৎসরের উপান্তে মেট্রো রেলে আগুন লাগিবার ঘটনায় বিস্তর আলোচনা হইয়াছিল। কেন আগুন লাগিয়াছিল, রক্ষণাবেক্ষণের গাফিলতি কেন, প্রাত্যহিক নজরদারি দুর্বল কেন, আপৎকালীন ব্যবস্থায় কেন খামতি— এ হেন বহু প্রশ্ন সেই দিন উত্থাপিত হইয়াছিল, যাহার সদুত্তর তৎক্ষণাৎ না মিলিলেও অদূর ভবিষ্যতে কিঞ্চিৎ সতর্কতার আশা করা অন্যায় ছিল না। কিন্তু হায়! নূতন বৎসরের প্রথম দিনই লাইনে স্ফুলিঙ্গ নজরে পড়ায় দীর্ঘ ক্ষণ বন্ধ রাখিতে হয় পরিষেবা। দ্বিতীয় দিন আবার কামরার দরজা বিভ্রাট, এবং আত্মহত্যা। আগ্রহ জন্মিতে পারে, ঠিক কী অবস্থায় চলাচল করিয়া থাকে মেট্রো? তদন্ত বলিতেছে, পরিকাঠামোয় ঘুণ ধরিয়াছে। প্রথমত, নোয়াপাড়া হইতে কবি সুভাষ অবধি আঠাশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করিতে ভরসা মাত্র বারোটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রেক, যেগুলিকে কোনও রূপেই অত্যাধুনিক বলা চলে না। হাতে রহিয়াছে আরও তেরোটি সাধারণ রেক, যেগুলি কলিকাতা মেট্রোর জন্মলগ্ন হইতে যাত্রী বহনের কাজে রত! স্বভাবতই, তাহারা ক্লান্ত বোধ করে, কদাপি দেহরক্ষাও করিয়া থাকে, এবং তাহাদের যুগটি কালের গর্ভে তলাইয়া যাইবার ফলে মেরামতির কালে যন্ত্রাংশ পাওয়া দুষ্কর হয়। দ্বিতীয়ত, কর্মীর অভাবে ভুগিতেছে মেট্রো। সুষ্ঠু পরিষেবার জন্য ২৫৯ জন মোটরম্যানের প্রয়োজন থাকিলেও বাস্তবে সংখ্যাটি ১৯২, যাহার ভিতর একশোজনই পূর্ব বা দক্ষিণ-পূর্ব রেল হইতে ডেপুটেশনে গৃহীত। ফলত, বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী নাই। অতএব, গত নয় মাসে ৪.৩২ শতাংশ আয় বাড়িলেও পরিষেবায় বিন্দুমাত্র প্রতিফলন ঘটে নাই।

অপর গণপরিবহণ হইতে পাতালরেল চড়িবার অভিজ্ঞতাটি কিঞ্চিৎ পৃথক। রাষ্ট্র তথা প্রশাসনের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখিয়া পাতাল রেলে সওয়ার হইতে হয়। বিপদ ঘটিলে যান হইতে প্রস্থান কিংবা পদব্রজে ভ্রমণ করিবার সুযোগ নাই। সেই স্থলে প্রশাসনের গাফিলতির চিত্রটি প্রকট হইলে বুঝিয়া লইতে হয়— অবহেলাই নিয়ম, ভবিতব্য। ভ্রম হইবে, ক্ষতি হইবে, উত্তেজনা হইবে। অতঃপর বিস্মৃতি ঘটিবে, এবং পুনরায় ভ্রম হইবে। ভাগ্যচক্রে এক দুর্ঘটনার আঁচ নিভিয়া যাইবার অর্থ কেবল পরবর্তীর জন্য প্রতীক্ষা। অতএব, সীতার ন্যায় কলিকাতার জনতাকেও পাতালে প্রবেশ করিতে হইলে তাহা আপন দায়িত্বেই হইবে। হিসাব বলিতেছে, প্রতি দিন গড়ে সাত লক্ষ যাত্রী মেট্রো চড়েন। যানজট দীর্ণ শহরে যাত্রাপথের সময় বহুগুণ কমাইয়া দেয় মেট্রো— এক কালে লোকমুখে ইহা ‘লাইফলাইন’ আখ্যাতেও ভূষিত হইত। ইদানীং বিপদের পাল্লাটিই ভারী। রেক বা আলো-পাখা বা দরজা— আংশিক বৈকল্য নিয়মে পর্যবসিত হইয়াছে। কর্তৃপক্ষের আশ্বাস দূরস্থান, বহু সময় অনিয়মিত চলাচল বিষয়ে সামান্য বিবৃতিও থাকে না। বিষয়টি গুরুতর, কেননা নাগরিক জীবনের প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাইতেছে পরিস্থিতিটি এমন। যেমন নগরের সব পুরাতন বাড়িগুলিই জতুগৃহ হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। অগ্নিকাণ্ড ঘটিলে হাহাকারের রব উঠে। তাহার পর যে কে সেই। বিপদ হইতে পারে জানিয়াও বিপদ আটকাইবার কোনও পরিকল্পনা নাই। বিপদ হইলে আর কী-ই বা করিব, এমনই একটি নিয়তিবাদে নাগরিক কর্তৃপক্ষ অভ্যস্ত। নাগরিক সমাজও।