গত মাসের শেষ দিন উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তে অবস্থিত শান্তি-গ্রাম পানমুনজম-এ উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সহিত মিলিত হইয়াছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জি২০ শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে এশিয়া সফরে আসিয়া অকস্মাৎ টুইটারে কিমের সহিত দেখা করিবার অনুরোধ জানান ট্রাম্প। রাজি হইয়া যান কিমও। এবং ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে উত্তর কোরিয়ায় পদার্পণ করিয়া নিঃসন্দেহে ইতিহাস সৃষ্টি করিলেন তিনি। বৈঠক প্রসঙ্গে উত্তর কোরিয়াও অত্যন্ত সদর্থক। সরকারি সংবাদমাধ্যম কেবল ‘ঐতিহাসিক’, ‘অভূতপূর্ব’ ইত্যাদি বিশেষণেই ক্ষান্ত দেয় নাই, বৈঠককে ‘দুই নেতার ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক’ বলিয়াও চিহ্নিত করিয়াছে। ইহার অব্যবহিত পূর্বে হ্যানয়তে প্রবল মতভেদের ফলে দুই রাষ্ট্রনেতার আলোচনা মাঝপথে থমকাইয়া গিয়াছিল, বৈঠক ছাড়িয়া উঠিয়া গিয়াছিলেন ট্রাম্প, ক্ষোভ প্রকাশ করিয়াছিলেন কিমও। অতএব, ডিমিলিটারাইজ়ড জ়োনে নূতন করিয়া দুই নেতার দৃশ্যত উষ্ণ সাক্ষাতের পর বিশ্ব-রাজনীতির আশান্বিত হইবার কারণ আছে।

আপন নামাঙ্কিত পুস্তকের ন্যায় আপনাকে ‘আর্ট অব দ্য ডিল’ বলিতে পছন্দ করেন ট্রাম্প। অতীতে উহা ব্যবসা প্রসঙ্গে বলা হইলেও রাজনীতিতে তাহার প্রাসঙ্গিকতা কম নহে। ট্রাম্প দাবি করিতেই পারেন, তাঁহার জমানায় সিঙ্গাপুরে বৈঠকের মাধ্যমেই দুই দেশের জল-অচল সম্পর্কটি কিয়দংশে সহজ হইয়াছে, এযাবৎ কাল বিচ্ছিন্ন সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রটিকে আলোচনার টেবিল অবধি লইয়া আসা সম্ভব হইয়াছে। অতএব, কিমের সহিত দুই কোরিয়ার সীমান্তে কুড়ি পদক্ষেপ হাঁটিয়া আসিবার পরে তাহার কৃতিত্ব দাবি করা অন্যায় হইবে না, এবং সাম্প্রতিক বৈঠকের অনুরোধটি ট্রাম্পের তরফ হইতেই আসিয়াছিল। কিমকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণের অঙ্গীকারও করিয়াছেন তিনি। অপর পক্ষে, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে যে ঐতিহাসিক বোঝা এবং অচলাবস্থা ছিল, উহা ভাঙিতে কিছু তৎপরতা দেখাইয়াছেন কিমও। সুতরাং, দুই রাষ্ট্রনেতার আন্তরিক সদিচ্ছা প্রকাশের ফলেই সামান্য হইলেও আগাইবার পথ প্রশস্ত ও মসৃণ হইল।

তবে আশা যত, প্রশ্ন ততোধিক। কারণ করমর্দনের চিত্র ব্যতীত অবশিষ্ট সকলই তমসাচ্ছন্ন। ট্রাম্প ও কিম উভয়ের আচরণ হইতে বুঝা যায় যে তাঁহারা দেখনদারিতে অধিক বিশ্বাসী। কাজ হউক বা না হউক, উত্তর কোরিয়ার এলাকায় পা রাখা গিয়াছে, ইহাতেই তাঁহারা খুশি। না হইলে ফ্রিডম হাউসে এক ঘণ্টার অধিক বৈঠক হওয়া সত্ত্বেও কোনও সম্মতিতে পৌঁছাইতে পারিলেন না যাঁহারা, তাঁহাদের এত উচ্ছ্বাসের কারণ কী? উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে যাহা সর্বাপেক্ষা বড় উদ্বেগ, সেই পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নটি সম্ভবত এই বৈঠকে এক বারও উঠে নাই। কেবল ভবিষ্যৎ আলোচনার অঙ্গীকারটুকু মাত্র হইল। এ দিকে উত্তর কোরিয়া নিজের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার ক্রমশ বৃদ্ধি করিয়া চলিতেছে। আর একটি প্রশ্নও উঠিবে বইকি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে কিম-এর সঙ্গে সহাস্য বৈঠক করিলেন, এবং ইচ্ছাপূর্বক কোথাও তাঁহাকে একটুও অস্বস্তিতে ফেলিলেন না, ইহা কি সত্যই প্রশংসার বিষয়? এমন নহে তো যে, নিজে আদ্যন্ত কর্তৃত্ববাদী বলিয়াই কিম-এর মতো দমনপন্থী অত্যাচারী শাসকের সহিত স্বচ্ছন্দ বোধ করিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প?