Advertisement
২১ জুন ২০২৪

মুখোমুখি

কলেজিয়ামের সুপারিশ সত্ত্বেও বিচারপতি কে এম জোসেফের নাম সুপ্রিম কোর্টের নিকট ফেরত পাঠাইয়া নরেন্দ্র মোদী বুঝাইয়া দিয়াছেন, বিচারপতি নিয়োগে হস্তক্ষেপে তাঁহারা বদ্ধপরিকর।

শেষ আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০১৮ ০০:০০
Share: Save:

কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ রায় দিয়াছেন: সরকারের বিরুদ্ধে বিচারবিভাগের মর্যাদাহানির অভিযোগ করিবার নৈতিক অধিকার কংগ্রেসের নাই, কারণ এই দল সত্তরের দশকে অতি নিন্দনীয় ভাবে বিচারবিভাগের মর্যাদায় আঘাত করিয়াছিল। ‘অনুগত বিচারবিভাগ’ সৃষ্টির জন্য সত্তরের দশকে ইন্দিরা গাঁধীর উদগ্র তৎপরতা অবশ্যই ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে এক কলঙ্কতিলক। কিন্তু তাহার পরে চার দশক অতিক্রান্ত। নৈতিক অধিকার কাহাকে বলে, তাহা পুনরুদ্ধার করিতে কত শতাব্দী প্রায়শ্চিত্তের প্রয়োজন, আইনমন্ত্রীকে সেই প্রশ্ন করিয়া লাভ নাই, তাঁহাদের সকল উত্তরই কর্তা জানেন। কিন্তু প্রশ্নকর্তার অধিকার থাকুক বা না থাকুক, প্রশ্ন স্বনির্ভর। নরেন্দ্র মোদীর সরকার বিচারবিভাগের মর্যাদা নষ্ট করিতেছেন, এই অভিযোগ কেবল কংগ্রেসের নহে, গণতন্ত্রে শ্রদ্ধাশীল বহু নাগরিকেরই। বিচারবিভাগের আত্মশক্তি গণতন্ত্রের আবশ্যিক শর্ত। শাসনবিভাগ সেই শক্তি খর্ব করিলে গণতান্ত্রিক কাঠামো বিপন্ন হয়। মোদীভূমিতে সেই বিপন্নতা উদ্বেগজনক ভাবে বাড়িতেছে।

বিচারপতি নিয়োগ লইয়া সর্বোচ্চ আদালতের কলেজিয়াম এবং সরকারের টানাপড়েনের নূতন অঙ্কটি উদ্বেগে ঘৃতাহুতি দিয়াছে। কলেজিয়ামের সুপারিশ সত্ত্বেও বিচারপতি কে এম জোসেফের নাম সুপ্রিম কোর্টের নিকট ফেরত পাঠাইয়া নরেন্দ্র মোদী বুঝাইয়া দিয়াছেন, বিচারপতি নিয়োগে হস্তক্ষেপে তাঁহারা বদ্ধপরিকর। গুরুতর কোনও কারণ না থাকিলে সর্বোচ্চ আদালতের পাঁচ প্রবীণতম বিচারপতির সুপারিশ প্রত্যর্পণ বিধেয় হইতে পারে না। বিচারপতি জোসেফ যথেষ্ট সিনিয়র বা কর্ম-প্রবীণ নহেন, কেরল হাইকোর্ট হইতে উঠিয়া আসা দুই জন বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টে থাকিলে বিচারকমণ্ডলীর ভারসাম্য বিপন্ন হইবে, সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চে তফসিলি জাতি ও জনজাতির অংশগ্রহণ আবশ্যক— ইত্যাকার যে কৈফিয়তগুলি রবিশঙ্কর প্রসাদেরা ভাবিয়া-চিন্তিয়া স্থির করিয়াছেন, সেগুলির কোনওটিই যুক্তির ধোপে টেকে না। প্রথমত, বিচারপতি নিয়োগে কর্ম-প্রবীণতা একটি মাপকাঠি, একমাত্র নহে। দ্বিতীয়ত, একই এলাকা হইতে দুই বা তিন জন বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টে আগেও ছিলেন, এখনও আছেন। তৃতীয়ত, এখনও সুপ্রিম কোর্টে ছয় জন বিচারপতির আসন শূন্য, এই বছরে আরও সাত জন অবসর লইবেন, সুতরাং তফসিলি জাতি বা জনজাতির বিচারককে অধিষ্ঠিত করিবার বিলক্ষণ সুযোগ আছে। তবে কেন এই প্রত্যাখ্যান?

সেখানেই উদ্বেগের প্রধানতম কারণ। ২০১৬ সালে বিচারপতি কে এম জোসেফ উত্তরাখণ্ডে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির সিদ্ধান্ত নাকচ করিয়াছিলেন। সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ লইতেই সরকার এখন বিচারপতি জোসেফের সুপ্রিম কোর্টে আসিবার পথ বন্ধ করিতে তৎপর— এমন অভিযোগের কথা ভাবিতে না হইলেই ভারতীয় গণতন্ত্রের মর্যাদা অটুট থাকিত, কিন্তু নরেন্দ্র মোদী ও তাঁহার সতীর্থরা পরাজয়ের গ্লানি পুষিয়া রাখেন না— তেমন সুনাম তাঁহাদের নাই। এবং, প্রবীণ আইনজ্ঞ ফলি নরিম্যানের সতর্কবাণী: ‘অতি-সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী’ শাসনের যে ধারা সত্তরের দশকে দেখা গিয়াছিল, তাহা যেন আবার ফিরিয়া আসিতেছে! সুতরাং, দুর্ভাবনা কেন বাধ্যতে! ভাবনা গভীরতর হয়, যখন প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচারপতি জোসেফের নাম পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানোর অধিকার সরকারের আছে। অধিকার অবশ্যই আছে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই অধিকার প্রয়োগের প্রয়োজন কী ছিল, তাহাই তো বিচার্য! বল এখন কলেজিয়ামের কোর্টে। তাঁহারা আপন সিদ্ধান্তে অবিচল থাকিয়া বিচারপতি জোসেফের নাম আবারও সুপারিশ করিবেন, না সরকারের আপত্তি মানিয়া লইবেন, তাহাই প্রশ্ন। অতি বৃহৎ প্রশ্ন।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE