Advertisement
E-Paper

অতিক্রমী রায়

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সম্প্রতি-প্রদত্ত ঐতিহাসিক রায়টি মানিয়া চলিলে ভারতীয় রাজনীতিতে শীঘ্রই বিরাট পরিবর্তন আসিতেছে বলা যায়।

শেষ আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০১৭ ০০:০০

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সম্প্রতি-প্রদত্ত ঐতিহাসিক রায়টি মানিয়া চলিলে ভারতীয় রাজনীতিতে শীঘ্রই বিরাট পরিবর্তন আসিতেছে বলা যায়। গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে কোনও ভাবেই ধর্ম, জাতপাত, ভাষা কিংবা অন্যান্য সামাজিক বৈষম্যচিহ্নের ভিত্তিতে ভর করা যাইবে না: এমন একটি রায়ের অর্থ, শল্য-চিকিৎসার মাধ্যমে ভারতীয় রাজনীতির বর্তমান ডিএনএ-টিকে দ্রুত পরিশোধিত করা। বিশেষত কয়েকটি প্রদেশের ক্ষেত্রে নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারী সব কয়টি দলকেই ইহার ফলে অস্তিত্বের পরীক্ষায় পড়িতে হইবে। সামনেই কয়েকটি প্রদেশে ভোট। সেই সব জায়গায় বরাবর ধর্ম কিংবা জাতপাতের ভিত্তিতে সংঘটিত ভোটব্যবস্থা রাতারাতি ভাঙিয়া নূতন করিয়া গড়িতে হইলে কী তাহার পরিণাম হইবে, ভবিষ্যৎই বলিবে। তবে একটি কথা স্বীকার করিতে হইবে। দেশের সংবিধানে যে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শটি গভীর ভাবে প্রোথিত, বর্তমান সময়ে বারংবার বিভিন্ন সূত্রে সুপ্রিম কোর্ট তাহা মনে করাইয়া দিয়াছে ঠিকই। কিন্তু এত দ্ব্যর্থহীন ও এত জোরালো ভাবে আর কোনও রায়ে আদর্শটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় নাই। অতি কঠিন পরিস্থিতিতে, প্রতিকূল রাজনীতির আবহে ধর্মনিরপেক্ষতার স্তম্ভটিকে এই ভাবে ফিরাইয়া দিবার প্রচেষ্টার জন্য সংশ্লিষ্ট বিচারপতিদের কাছে ভারতীয় সমাজ কৃতজ্ঞতাবদ্ধ থাকিবে। সহজ শুনিতে হইলেও রায়টি মোটেই সহজ ছিল না।

সহজ ছিল না, কেননা জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১২৩(৩) ধারাটির ব্যাখ্যা লইয়া বহুবিধ বিতর্ক রহিয়াছে। ধর্ম, জাতি, ভাষা, সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে ভোট চাওয়া কি প্রার্থীর দিক হইতে নিষিদ্ধ, না কি ভোটদাতা সমাজের কাছে প্রচারের দিক হইতে নিষিদ্ধ, এই বিষয়ে অস্পষ্টতার অবকাশ ছিল। উপরন্তু ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্টেরই প্রদত্ত অন্য একটি রায়ে জাস্টিস বর্মা যে ভাবে হিন্দুত্বকে হিন্দুধর্মের সহিত এক করিয়া দেখিয়া উভয়কেই ভারতীয় ‘জীবনশৈলী’ হিসাবে রাজনৈতিক ছাড়পত্র দিয়াছিলেন, তাহাতে রাজনীতি ও ধর্মের মৌলিক বিরোধের জায়গাটি নীতিগত ভাবে অনেক অস্পষ্ট হইয়া গিয়াছিল। বাস্তবিক, ওই রায়টিকে পরবর্তী কালে আরএসএস ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠী নানা ভাবে ‘কাজে’ লাগাইয়াছে। আজ একুশ বৎসর পর সেই অস্পষ্টতার জায়গাটি সর্বোচ্চ আদালত নিজেই স্পষ্ট করিয়া দিল। ভারতীয় রাজনীতিকে ধর্ম (এবং অন্যান্য বিভাজনকারী আইডেন্টিটি) হইতে বিযুক্ত না করিলে ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটির কোনও অর্থ নাই, এই রায় তাহাই বলিতেছে।

স্বাগত জানাইবার পর অবশ্য কতগুলি সংশয় থাকিয়া যায়। বিচারকরা যে সংখ্যাগরিষ্ঠের অত্যাচার ও অনাচারের দিকে তাকাইয়াই প্রধানত রায়টি দিয়াছেন, তাহা নিঃসন্দেহ। কিন্তু ধর্ম, জাতপাত ইত্যাদি বিভাজনরেখার অপর পার্শ্বে দেশের যে সংখ্যালঘু, প্রান্তিক সমাজগুলি সামাজিক সুবিচারের আশায় সত্তা-পরিচিতির রাজনীতির আশ্রয় লয়, তাহাদের ক্ষেত্রে এই রায় বুমেরাং হইয়া দাঁড়াইবে না তো? দলিতকে যদি তাহার দলিত পরিচয়ের বাহিরে গিয়া রাজনীতির কথোপকথন চালাইতে হয়, তাহা কি যথেষ্ট কার্যকরী হইবে? সামাজিক বিভেদ হইতে বিযুক্ত রাজনীতি কি অত্যধিক বায়বীয় বা বিমূর্ত হইয়া পড়িবে না? প্রশ্নগুলি উঠিতেছে এই জন্য যে ৪-৩ দুই দলে বিভক্ত বিচারকদের মধ্যে রায়ের বিরুদ্ধ পক্ষের তিন বিচারক কিন্তু কোনও তথাকথিত ‘সাম্প্রদায়িক’ যুক্তি দেন নাই, বরং সুচিন্তিত সমাজ-দার্শনিক যুক্তিই উত্থাপন করিয়াছেন। সেই যুক্তিগুলিও একেবারে ব্রাত্য নয়। অর্থাৎ এই রায় ঐতিহাসিক হইলেও বিতর্কিত, বিতর্কযোগ্য। আশার কথা, এত উচ্চমানের বিতর্কও সাম্প্রতিক ভারত বড় একটা দেখে নাই!

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy