ক্ষু ব্ধ পার্থ চট্টোপাধ্যায় প্রশ্ন করিয়াছেন, নাড়াজোল রাজ কলেজের ছাত্রদের মাতব্বরি করিবার অধিকার কে দিয়াছে? শিক্ষামন্ত্রীর প্রশ্নটি লইয়া বেশি নাড়াচাড়া না করাই ভাল। তৃণমূল কংগ্রেস ছাত্র পরিষদের লেটারহেডে কলেজের শিক্ষকদের সময়ে আসিবার ফরমান জারি করিবার মধ্যে যে অসভ্যতা আছে, তাহা বক্তব্যের যৌক্তিকতা বিচারের অবকাশটিই রাখে নাই। নচেৎ, শিক্ষকদের নিকট সময়ানুবর্তিতার দাবি করিবার অধিকার ছাত্রদের আছে কি না, সেই প্রশ্নটি ফুৎকারে উড়াইয়া দেওয়ার নহে। পশ্চিম মেদিনীপুরের কলেজটির এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাক্রম হইতে যদি একটি কথা শিক্ষণীয় হয়, তহে তাহা ইহাই: কী ভাবে বলা হইতেছে, তাহার গুরুত্ব কী বলা হইতেছে, তাহার তুলনায় কম নহে। দৃশ্যত, তৃণমূল কংগ্রেস ছাত্র সংসদের সদস্যরা শিক্ষকদের সহিত সংলাপের পদ্ধতি শিখিয়া উঠিতে পারে নাই। ব্যর্থতা সমাজের, নাকি দলীয় আধিপত্যবাদের রাজনীতির, সেই প্রশ্ন আপাতত মুলতবি থাকুক।
এই কলেজে শিক্ষকদের উপস্থিতির হাল কতখানি করুণ, তাহা তদন্তসাপেক্ষ। তর্কের খাতিরে ধরিয়া লওয়া যাউক, ছাত্রদের অভিযোগ যথার্থ। যথাসময়ে ক্লাস লওয়ার দাবি ছাত্ররা করিতেই পারেন। প্রয়োজনে শিক্ষকদের নিকট পত্রও প্রেরণ করা যায়। কিন্তু, তাহা রাজনীতিলাঞ্ছিত লেটারহেডে নহে। শিক্ষকের নিকট কোনও দাবি পেশ করিতে হইলে তাহা ছাত্র হিসাবে করিতে হইবে, কোনও রাজনৈতিক পরিচয়ে নহে। ইহা প্রথম শিক্ষা। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের চিঠি লিখিবার পূর্বে তাঁহাদের নিকট মৌখিক আবেদন করাই বিধেয়। যে কোনও সম্পর্কেরই কিছু নিজস্ব শর্ত থাকে। শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কে মূল শর্ত শ্রদ্ধার। শিক্ষকের নিকট মৌখিক ভাবে নিজেদের সমস্যার কথা পেশ করিবার মধ্যে সেই শ্রদ্ধা রহিয়াছে। প্রথম ধাপেই পত্রাঘাতের মধ্যে আছে ঔদ্ধত্য। সম্পর্কটি শ্রদ্ধার বলিয়া যে শিক্ষকের অন্যায্য আচরণও মানিয়া লইতে হইবে, তেমন কথা নাই। মৌখিক আবেদনে শিক্ষকরা কর্ণপাত না করিলে, লিখিত পত্রেও সাড়া না দিলে, ছাত্ররা আন্দোলন করিতেই পারে। বহু পথেই আন্দোলন— তীব্র আন্দোলন— সম্ভব। ছাত্ররা সাংবাদিক সম্মেলন করিয়া বৃহত্তর জনসমাজের সম্মুখেও নিজেদের সমস্যার কথাটি তুলিয়া ধরিতে পারিত। কিন্তু, প্রতিবাদের কোনও পথই শিক্ষকের অসম্মান করিতে পারে না। এমনকী, কোনও শিক্ষক নিজের দায়িত্ব পালনে শোচনীয় রকম ব্যর্থ হইলেও নহে। শ্রদ্ধার সম্পর্কটি এক বার ভাঙিলে তাহা আর জোড়া লাগে না।
প্রতিবাদ কোন পথে হইতে পারে আর কোন পথে নহে, তাহা জানিতে শিক্ষা নির্বিকল্প। পুঁথিগত শিক্ষা নহে, মূল্যবোধের শিক্ষা। কোন কাজটি করা চলে না, তাহা জানা থাকিলে মানুষ বিকল্পের সন্ধান করে। ছাত্রদের মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্বটি সমাজের। রাজনীতিরও। দলীয় আধিপত্য বিস্তারের আতিশয্যে রাজনীতি হইতে সৌজন্য, মূল্যবোধ সম্পূর্ণ বিদায় লইয়াছে। বামফ্রন্টের এই উত্তরাধিকারটি তৃণমূল কংগ্রেসও সযত্নে বহন করিয়া চলিতেছে। গতিপথটি ভয়ঙ্কর। যে সমাজে নৈতিকতার অলিখিত নিয়মগুলি যথেচ্ছ লঙ্ঘিত হয়, যেখানে মূল্যবোধের দাম কানাকড়িও নহে, সেই সমাজ একমুখি— অধঃপাত ভিন্ন তাহার আর গন্তব্য নাই। শিক্ষামন্ত্রী যখন ছাত্রদের বকিলেনই, তখন এই কথাগুলিও স্মরণ করাইয়া দিতে পারিতেন। এবং, শুধু ছাত্রদেরই নহে।