সূচ্যগ্র মেদিনীও ছাড়িব না, ইহা হইল দুর্বৃত্তের পণ। তাহার সহিত তর্ক করিয়া মহাভারতের যুগেও লাভ হয় নাই, এই যুগেও হইবে না। অতএব নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রী মানেকা গাঁধীর কর্তব্য স্পষ্ট। কন্যাশিশুদের স্কুলে পাঠাইবার জন্য তাঁহার প্রস্তাবিত উদ্যোগ লইয়া যাঁহারা শোরগোল তুলিয়াছেন, তাঁহাদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিতে হইবে। সম্প্রতি খসড়া জাতীয় মহিলা নীতি লইয়া অনলাইন আলাপে মন্ত্রীর প্রতি যে সকল প্রশ্ন ও মন্তব্য আসিয়াছে, তাহার অধিকাংশই পুরুষদের বঞ্চনায় শঙ্কিত-ব্যথিত ব্যক্তিদের। যাহার মূল সুর, পুত্রশিশুরা কি বঞ্চিত নহে? তাহাদেরও কি উৎসাহ-অনুদানের প্রয়োজন নাই? পুরুষেরও কি উচ্চশিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগের উপর দাবি নাই? একই ভাবে হরিয়ানার জাঠ সম্প্রদায়, গুজরাতের পতিদার সম্প্রদায় আর্থ-সামাজিক পরিমাপে যথেষ্ট উন্নত হইয়াও উচ্চশিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণ দাবি করিতেছে। তাহাদের প্রশ্ন, এতগুলি জাতি যে সুবিধা পাইতেছে, তাহাদের কি সেই সুবিধায় অধিকার নাই?
ইহার উত্তর, না। মহিলা, দলিত, আদিবাসী তথা যে কোনও গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা প্রকৃত প্রস্তাবে তাঁহাদের ক্ষতিপূরণ। লিঙ্গ বা জাতিগত পরিচয়, বা কোনও রূপ প্রতিবন্ধকতার জন্য তাঁহাদের প্রতি যে দীর্ঘ, বহু প্রজন্মবাহিত আর্থসামাজিক বঞ্চনা-অবমাননা ঘটিয়াছে, রাষ্ট্র তাহা পূরণ করিতেই কিছু অধিক সুবিধা দিতেছে। সেই ক্ষতি যাহার হয় নাই, ক্ষতিপূরণে তাহার কী অধিকার থাকিতে পারে? ‘ও পাইতেছে, তাই আমাকেও দিতে হইবে,’ ইহা গ্রহণযোগ্য যুক্তি নহে। পুরুষ, উচ্চবর্ণ, বিত্তবানদের কি সমস্যা নাই? প্রশাসন কিংবা বিচারব্যবস্থা কি সর্বদাই তাঁহাদের প্রতি ন্যায় করিতেছে? তাহা অবশ্যই কেহ দাবি করিবে না। শিক্ষা, নিয়োগ, বিচার, সকল ক্ষেত্রেই বর্ণ-লিঙ্গ-বিত্ত ব্যতিরেকেও নানা প্রকার অন্যায় ঘটিতেছে। তাহার প্রতিবাদ ও প্রতিকার প্রয়োজন। কিন্তু সেই চেষ্টা মহিলা, নিম্নবর্ণ বা আদিবাসীর প্রাপ্য সুবিধার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে পরিণত হইবে কেন? তাহাদের আগে পুরুষ-উচ্চবর্ণের দাবি পূরণের দাবিতে আত্মপ্রকাশ করিবে কেন? ইহা আন্দোলন নহে, অপরের অধিকারের অবদমন। তাহার ফলে ঐতিহাসিক কলঙ্কের উপর সমকালের অন্যায়ের কালো দাগ গাঢ়তর হয়। একবিংশ শতাব্দীর ভারতেও মানব-উন্নয়নের যতগুলি সূচক আছে, তাহার সবগুলিতেই বহু ধাপ পিছাইয়া মহিলারা। আর্থিক সূচকেও তাহাদের অবস্থা অনুরূপ। সংরক্ষণের সুবিধাপ্রাপ্ত অধিকাংশ তফশিলি জাতি, জনজাতির অনগ্রসরতাও নানা সূচকের বিচারে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে।
দুঃখের বিষয়, দুর্বলের কাতর আবেদন অপেক্ষা দুর্বৃত্তের অশিষ্ট শোরগোল রাজনৈতিক মহলকে অধিক বিচলিত করে। তাই ইউপিএ এবং এনডিএ, কোনও জোটই জাঠদের অন্যায় আবদারের বিরোধিতা করিতে সাহস করে নাই। তাহাদের মদত দিতেই আগ্রহ দেখাইয়াছে বেশি। শেষ অবধি আদালতকে অন্যায় সংরক্ষণের দাবি বাতিল করিতে হইয়াছে। এই রাজ্যে কন্যাশিশুদের প্রতি সরকারের বিশেষ সুবিধাদানের প্রতিক্রিয়া সামলাইতে ‘সবুজসাথী’-র ন্যায় প্রকল্প তৈরি করিয়া সকল শিশুকে সাইকেল বিতরণের ন্যায় সুবিধা দিতে হইতেছে। ইহার শেষ কোথায়? প্রশ্ন কেবল অপচয়ের নহে। অন্যায় দাবির নিকট নতিস্বীকারও অন্যায়। সরকারকে দুর্বল ও দুর্গতের পক্ষে দাঁড়াইবার নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করিতেই হইবে। সংরক্ষণই মহিলা বা দলিত-আদিবাসীর প্রতি সুবিচারের একমাত্র উপায় নহে। বিভিন্ন আইন, নীতি ও প্রকল্পের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায় রূপায়িত হয়। সরকার সহজে ভীত হইলে এইগুলির কোনওটিরই বাস্তব প্রয়োগ হইবে না।