Advertisement
E-Paper

অনর্থ(ক)

বাতাস যখন প্রতিকূল, তখনই বোঝা যায়, কান্ডারি কতখানি হুঁশিয়ার। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আচরণে একটি লক্ষণ বারংবার প্রকট হইয়াছে। যে কোনও বিষয়ে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হইলে তাঁহার আত্মনিয়ন্ত্রণের রশি যেন হাতছাড়া হইয়া যায়, তিনি দিশাহারা রোষের শিকার হইয়া পড়েন, তাঁহার কথায় এবং কাজে অপ্রয়োজনীয় অসংযম প্রকাশ পায়। তানিয়া ভরদ্বাজ হইতে শিলাদিত্য চৌধুরী, মীরা পান্ডে হইতে বিনোদ জুতসি নাম বদলায়, কুনাট্য বদলায় না।

শেষ আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০১৪ ০০:০০

বাতাস যখন প্রতিকূল, তখনই বোঝা যায়, কান্ডারি কতখানি হুঁশিয়ার। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আচরণে একটি লক্ষণ বারংবার প্রকট হইয়াছে। যে কোনও বিষয়ে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হইলে তাঁহার আত্মনিয়ন্ত্রণের রশি যেন হাতছাড়া হইয়া যায়, তিনি দিশাহারা রোষের শিকার হইয়া পড়েন, তাঁহার কথায় এবং কাজে অপ্রয়োজনীয় অসংযম প্রকাশ পায়। তানিয়া ভরদ্বাজ হইতে শিলাদিত্য চৌধুরী, মীরা পান্ডে হইতে বিনোদ জুতসি নাম বদলায়, কুনাট্য বদলায় না। নির্বাচন পরিচালনাকে কেন্দ্র করিয়া পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অন্যায় ও অশোভন প্রতিক্রিয়া প্রায় অবধারিত হইয়া দাঁড়াইয়াছে। পঞ্চায়েত ভোটের স্মৃতি এখনও পুরানো হয় নাই, লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া আবার সেই কাহিনির নূতন সংস্করণ রচিত হইল। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশের খবর পাইবার সঙ্গে সঙ্গে জনসভার মঞ্চে দাঁড়াইয়া মুখ্যমন্ত্রীর তীব্র এবং তাত্‌ক্ষণিক জেহাদ ঘোষণায় সেই একই মানসিকতার প্রতিফলন, যে মানসিকতা কোনও সমালোচনা সহ্য করিতে পারে না, মতের বিরুদ্ধে কেহ কিছু করিলেই অগ্রপশ্চাত্‌ বিবেচনা না করিয়া হঠকারী আচরণ করিয়া বসে, যাহা সর্বদা তটস্থ হইয়া থাকে বুঝি বা কেহ আসিয়া আমার এক্তিয়ারে হস্তক্ষেপ করিল, আমার ক্ষমতা বুঝি খর্ব হইল! ইহা প্রশাসকের ধর্ম হইতে পারে না।

প্রাথমিক যুদ্ধ ঘোষণা হইতে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পশ্চাদপসরণ করিয়া মুখ্যমন্ত্রী বুঝাইয়া দিয়াছেন, তিনি আপন ভ্রান্তি টের পাইয়াছেন। নির্বাচন কমিশন রাজ্যে নির্বাচন বন্ধ করিয়া দিলে লজ্জায় ও সংকটে পড়িতে হইবে এই সহজ সত্য উপলব্ধি করিতে তাঁহার বিলম্বের কারণ ছিল না। কিন্তু ভাঙিব, তবু মচকাইব না, এই মানসিকতা স্বভাবে দুর্মর। সরাসরি ভুল স্বীকার করিয়া লওয়াই যখন বিচক্ষণতার পরিচয় হইত, মুখ্যমন্ত্রী তখনও সে পথে হাঁটেন নাই, নানা ভাবে আপন আহত অভিমান ঘোষণায় ব্যগ্র হইয়াছেন। এক দিকে চিহ্নিত আধিকারিকদের নির্বাচনের পরেই আবার আপন আপন পদে ফিরাইয়া আনিবেন বলিয়া আগাম প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন, যাহা প্রশাসনিক আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অন্য দিকে, ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার সম্পর্কে তিনি যে ভাবে যে সমস্ত মন্তব্য ছুড়িয়া দিয়াছেন, তাহা আর যাহাই হউক, একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে মানায় না।

বস্তুত, সমগ্র ঘটনাটির কোনও প্রয়োজনই ছিল না। ভোটের মরসুমে পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচন কমিশন এ ধরনের বদলির নির্দেশ দিয়াই থাকে। এ বারেও অন্তত আরও চারটি রাজ্যে দিয়াছে। সর্বত্রই রাজ্য প্রশাসনের কর্তারা পত্রপাঠ নির্দেশ কার্যকর করিয়াছেন, কেবল পশ্চিমবঙ্গেই ‘যুদ্ধং দেহি’। বামফ্রন্ট আমলেও নির্বাচন কমিশনের সহিত রাজ্য সরকারের দ্বৈরথ দেখা গিয়াছে। জ্যোতি বসু টি এন শেষন সম্বাদ রীতিমত ঐতিহাসিক। পরেও নানা প্রশ্নে বামফ্রন্ট কর্তারা কমিশনের বিরুদ্ধে তোপ দাগিয়াছেন, অচলাবস্থার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। এই লড়াই-খ্যাপামি হয়তো কিছুটা বঙ্গীয় স্বভাব। তবে সেই নিক্তিতেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আচরণ বিসদৃশ। স্মরণীয়, বামফ্রন্ট আমলে ভোটের সময় শাসকদের দলতন্ত্রের অভিযোগ তিনিই সর্বাধিক তুলিতেন, তখন নির্বাচন কমিশন প্রশাসনকে চাপে ফেলিলে তিনি খুশি হইতেন। অথচ আজ সেই একই পরিস্থিতিতে তিনি সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান লইতেছেন! কমিশনের মতের সহিত তাঁহার মত না মিলিতেই পারে। কিন্তু নির্বাচনী মরসুমে কমিশনের মতই শেষ কথা, এই সত্য অনস্বীকার্য। আপন মর্যাদা, আপন সরকারের মর্যাদা এবং সর্বোপরি পশ্চিমবঙ্গের মর্যাদার স্বার্থেই মুখ্যমন্ত্রীর সংযম অভ্যাস করা আবশ্যক। তাঁহাকে বুঝিতে হইবে, হুমকি দিয়া মর্যাদা আদায় করা যায় না।

anandabazar editorial
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy