সত্য কিংবা ত্রেতা যুগে মৃগয়া নামক ‘ক্রীড়া’র কদর ছিল বেশ। কিন্তু তাহার ভিত্তিতে বিশ শত ষোলো সালের ক্রীড়াবিশ্বে নিজেকে পরিচিত করা কি ভারতের পক্ষে উচিত কাজ হইতেছে? অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় সলমন খানকে ভারতের প্রতিনিধি করা বিষয়ে যে বিতর্ক দানা বাঁধিয়াছে, ইহাই তাহার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। অদ্যাবধি সলমন খানের ক্রীড়াক্ষেত্রে কোনও অবদান আছে বলিয়া শোনা যায় নাই। বাস্তবিক, বলিউডের এক বিশেষ ঘরানার নৃত্য ও মারপিট শৈলী ছাড়া বিপন্ন প্রজাতির চিঙ্কারা হরিণ শিকার, এবং ও রাত্রিকালে উদভ্রান্ত গাড়ি চালনা: বলিউড ব্যতীত মাত্র এই দুই ক্ষেত্রেই যেহেতু সলমন খান কৃতী বলিয়া জানা যায়, এবং দুইটি ক্ষেত্রেই যেহেতু দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁহার অপরাধী দুর্নাম আদালত-চত্বর পর্যন্ত। সুতরাং প্রাক্তন অলিম্পিক-ব্যক্তিত্ব মিলখা সিংহ যে আপত্তি তুলিয়াছেন, তাহা দেড়শত শতাংশ সঙ্গত। ভারতীয় ক্রীড়াজগতের দৈন্য লইয়া প্রচ্ছন্নে অশ্রুমোচনই ভাল ছিল, তাহাকে এমন ভাবে প্রকাশ্য পরিহাসে পরিণত করিয়া, এমন এক জন বিতর্কিত ‘সেলিব্রিটি’কে দেশের অলিম্পিক অ্যাম্বাসাডর করিয়া জাতীয় গৌরব কতটুকু বর্ধিত হইল, এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়া কর্তৃপক্ষের পার নাই।
প্রশ্নটি ক্রীড়া-তারকাদের নিকট জরুরি। কিন্তু তাহার উপরে তাঁহাদের জন্য মর্মান্তিক যন্ত্রণাদায়কও বটে। এই সিদ্ধান্ত তাঁহাদের বুঝাইয়া দিল যে তাঁহাদের অবিশ্রান্ত পরিশ্রমজাত দক্ষতা ও নৈপুণ্য বিপণনের জন্য শেষ পর্যন্ত সলমন খানদের কৃপানির্ভর হওয়াই তাঁহাদের নিয়তি। ইহাও বুঝাইয়া দিল যে, এমনকী দেশের দৃষ্টিতেও দেশের ক্রীড়ানায়করা কেহই এত বড় তারকা নহেন, যাঁহারা তাঁহাদের নিজস্ব ভুবনের প্রতিনিধিত্বের যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতে পারেন। কিন্তু ক্রীড়াজগতের বাহিরেও বিষয়টি গুরুতর। অলিম্পিকের মতো একটি আন্তর্জাতিক গৌরবমঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্বের ভার সলমন খানের উপর থাকিলে সাধারণ ভারতীয় নাগরিকের কাছেও তাহা অগ্রহণযোগ্য হইবার কথা। বহির্বিশ্ব যদি মনে করে, ইহা চলচ্চিত্র-চাকচিক্যের তলায় ক্রীড়াদুনিয়ার মালিন্য লুকাইবার বন্দোবস্ত, দোষ দেওয়া যাইবে না। ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রের দারিদ্র যতই গগনচুম্বী হউক, এতখানি করুণ অবস্থা হইবারও কোনও কারণ নাই।
বাকি থাকিল বিপণনের পরিচিত অপরিণত যুক্তি। অমিতাভ বচ্চন যদি পোলিয়ো খাওয়াইবার বিজ্ঞাপন করিলে পোলিয়ো খাওয়াইবার হুড়াহুড়ি পড়িয়া যায়, তাহা হইলে সলমন খান অলিম্পিকে ভারতের বিজ্ঞাপন করিলে ক্ষতি কী, এই অর্বাচীন তর্ক। মনে রাখিতে হইবে, অমিতাভ বচ্চন বিজ্ঞাপনে হাজির হইয়া যাহা করেন না, সলমন খান কিন্তু প্রধানত তাহাই করিতেছেন। দেশের মুখ হইয়া উঠিতেছেন। দেশের প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। তাহা ছাড়া, পোলিয়ো খাইবার জন্য যে সরল প্রচারটি লাগে, অলিম্পিকের জন্য নিশ্চয়ই তাহার প্রয়োজন নাই। পোলিয়ো টীকা যে ভাবে সমাজের সর্ব স্তরে প্রচারিত হওয়া জরুরি, অলিম্পিক সেই পদ্ধতিতে প্রচারিত হইবার প্রয়োজন নাই, তাহা বাঞ্ছিতও নয়। ভারতীয় জনগণ ভিড় করিয়া কুস্তি কিংবা তিরন্দাজি প্রতিযোগিতা না দেখিতে বসিলেও অলিম্পিক তাহার গরিমা এক বিন্দু হারাইবে না। যেটুকু প্রচার ইত্যবসরে হইবে, তাহা সলমন খানেরই প্রচার, অলিম্পিকের প্রচার নহে। সুতরাং, শেষ ও চূড়ান্ত প্রশ্ন হইল— অলিম্পিক সলমনকে পাইল, না কি সলমনই অলিম্পিককে পাইলেন?