Advertisement
E-Paper

কী চাহিতেছেন?

অমিত মিত্র স্মরণ করাইয়া দিতে পারেন, যাহারা সাগরে শয্যা পাতে, শিশিরে তাহাদের ভয়ের কারণ থাকে না। আগামী অর্থবর্ষে রাজ্য সরকারকে ফের প্রায় ত্রিশ হাজার কোটি টাকা ধার করিতে হইবে।

শেষ আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ০০:০০

অমিত মিত্র স্মরণ করাইয়া দিতে পারেন, যাহারা সাগরে শয্যা পাতে, শিশিরে তাহাদের ভয়ের কারণ থাকে না। আগামী অর্থবর্ষে রাজ্য সরকারকে ফের প্রায় ত্রিশ হাজার কোটি টাকা ধার করিতে হইবে। ৩৫০ কোটি টাকা অঙ্কটি সেই তুলনায় যৎকিঞ্চিৎ। ভিন্‌ রাজ্যে কাজ হারাইয়া পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়া আসা ৫০,০০০ শ্রমিককে মাথাপিছু ৫০,০০০ টাকা, এবং ডিমনিটাইজেশনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য আরও ১০০ কোটি— বাজেটে এই দুই নূতন। অর্থমন্ত্রী জানিবেন, প্রশ্ন খরচের পরিমাণ লইয়া নহে। সত্যই, রাজ্য বাজেটের প্রেক্ষিতে সাড়ে তিনশত কোটি টাকা বিরাট অঙ্ক নহে। কিন্তু, যেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করিতেও বাজার হইতে ঋণ করা ভিন্ন কার্যত উপায়ান্তর নাই, সেখানে একটি পয়সাও অতিরিক্ত খরচ করিবার অধিকার সরকারের থাকে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁহার শাসনের দ্বিতীয় দফাতেও যে কথাটি বুঝিতে নারাজ, তাহা হইল, খরচ করিবার জন্য উপার্জন বাড়াইতে হয়। মিত্রমহাশয় রাজস্বের পরিমাণ যথেষ্ট বাড়াইতে পারেন নাই। দোষ তাঁহার নহে। রাজস্বের পরিমাণ নির্ভর করে রাজ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণের উপর। এই রাজ্যে আদৌ যদি কোনও শিল্পনীতি থাকে, তবে তাহাতে রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রসারণের কোনও সুবিধা হয় নাই। আর, যদি শুধু জমি অধিগ্রহণ না করাই শিল্পনীতি হয়, তবে তো আর প্রশ্নই থাকে না। ব্যয় করিবার নৈতিক অধিকার অর্জন করিতে চাহিলে পূর্বে আয়ের কথা ভাবিতে হইবে, অমিত মিত্রের সেই কথাটি বলিবার সুযোগ ছিল। তিনি পরোয়া করেন নাই।

ব্যয় করিবার নৈতিক অধিকারটি অর্জিত হইলেও প্রশ্ন থাকিয়া যায়— কোথায় ব্যয় করিব? যে পঞ্চাশ হাজার শ্রমিককে টাকা দেওয়া হইবে, তাঁহাদের চিহ্নিত করা হইবে কী উপায়ে, ৫০,০০০ টাকায় আদৌ কোনও সুস্থায়ী জীবিকা তৈরি করা সম্ভব কি না, এই প্রশ্নগুলি গৌণ। রাজ্য বাজেট বস্তুটি নরেন্দ্র মোদীকে রাজনৈতিক গোল দেওয়ার পরিসর হইতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও উহ্য থাকুক। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টতই এই গোত্রের খয়রাতিকে একটি উন্নয়নের মডেল জ্ঞান করেন। জানা প্রয়োজন, মডেলটি আসলে কী? যত ক্ষণ অবধি সেই প্রশ্নের উত্তর না মিলিতেছে, তত ক্ষণ অবধি এই খরচগুলিকে নিছক খামখেয়াল ভিন্ন আর কিছু ভাবিবার কারণ নাই। দুই দফায় প্রায় ছয় বৎসর অতিক্রান্ত— এখনও রাজ্য সরকারের উন্নয়ন ভাবনার ছবিটি অপ্রকাশিতই থাকিল কেন? ছবি নাই বলিয়াই কি?

উন্নয়নের নিশ্চিততম পথ বৃহৎ শিল্পায়ন। শিল্প স্থাপিত হইলে রাজ্যের অর্থনৈতিক আয়তন বাড়ে, এবং সরকারের হাতে আসা বর্ধিত রাজস্ব হইতে কল্যাণমূলক কাজের পরিমাণও বৃদ্ধি করা যায়। কিন্তু, তাহাই একমাত্র পথ নহে। মুখ্যমন্ত্রী সেই পথে হাঁটিতে না চাহিলেও বহু বিকল্প রহিয়াছে। ক্ষুদ্র শিল্পকে কেন্দ্র করিয়াও বৃহৎ উন্নয়ন ভাবনা সম্ভব। কিন্তু, কী ভাবে রাজস্ব আসিবে, এবং কোন পথে তাহা খরচ হইবে, কী উদ্দেশ্যে খরচ হইবে, তাহার গোটা ছবিটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। মুখ্যমন্ত্রী যদি ন্যূনতম সর্বজনীন আয়ের নীতিটিকে ব্যবহার করিতে চাহেন, তাহা সম্ভব; যদি মানুষের প্রাথমিক চাহিদাগুলিকে নিশ্চিত করিয়া তাঁহাদের ভার লাঘব করিতে চাহেন, তাহাও সম্ভব। কিন্তু তিনি কী চাহেন, তাহা জানিতে এবং জানাইতে হইবে। ক্লাবে-ক্লাবে খয়রাতি করিলে তাহার সামাজিক লাভ কতখানি, সেই প্রশ্নের অর্থশাস্ত্রসিদ্ধ উত্তর না থাকিলে সমালোচনাই হইবে। তেমনই, ডিমনিটাইজেশনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য একশত কোটি টাকা খরচ করিলে, ঘরে ফেরা শ্রমিকদের ‘ডাল সিদ্ধ-ভাত’ খাওয়াইলে তাহার দীর্ঘমেয়াদি সুফল কী, জানাইতে হইবে। নচেৎ, তাহা অর্থনীতি হয় না, রাজনীতিই থাকিয়া যায়।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy