Advertisement
E-Paper

চিকিৎসায় মানুষের অভিজ্ঞতাও মর্যাদা পাক

বিজ্ঞানীরা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে বিজ্ঞান আর সংস্কার মিলে যা তৈরি করে, তার চিন্তাবিধ্বংসী ক্ষমতা ওঝার তুকতাকের থেকে প্রবল। ‘লিচুকাণ্ড’ তা দেখিয়ে দিল।বিজ্ঞানীরা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে বিজ্ঞান আর সংস্কার মিলে যা তৈরি করে, তার চিন্তাবিধ্বংসী ক্ষমতা ওঝার তুকতাকের থেকে প্রবল। ‘লিচুকাণ্ড’ তা দেখিয়ে দিল।

অভিজিৎ চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০২ জুলাই ২০১৪ ০০:১৬

বাচ্চা জন্মালেই তারা সবাই বেঁচে থাকবে, হাসবে, বড় হবে এই ভরসার জায়গা এ দেশে আমরা এখনও তৈরি করতে পারিনি। মুখে-ভাতের আগে বাচ্চার নামকরণ এখনও লোকাচারে বারণ। সেই আচারই আজও ‘সব বাচ্চা কোলে থাকে না, কিছু যায় গোরে’, ‘সব মায়ের কোলে কাঁথা সয় না, কাঁটা থাকে’ গোছের প্রবাদ, সংস্কার আর বিশ্বাসের লাঙল ধরে শিশুকথা আবাদ করে চলে। দু’পাঁচটা বাচ্চার চলে যাওয়া এ পাথুরে গ্রামজীবনের অনুভূতিকে বিশেষ দোলায়িত করে না। শিশু পরিচর্যা যে এগোচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু যা হওয়া উচিত আর যা হয়েছে, দুইয়ের ফারাক আজও বিরাট।

এরই মাঝে আমরা শিউরে উঠি, যখন ঝাঁকে ঝাঁকে শিশু মারা যায়, টলটলে দিঘিতে ভেসে ওঠা মাছের মতো। এমনটাই হয়েছিল বছরখানেক আগে বিহারের সারণ জেলার ধরমসতি গ্রামে। মিড ডে মিলের খাবার খেয়ে নিথর হয়ে যাওয়া জনাপঞ্চাশ দরিদ্র পরিবারের শিশুর মায়েদের কান্না কয়েকটা কমিটি হয়ে এখন ফাইলবন্দি। ধূসর হয়েছে আমাদের স্মৃতি। এরই মাঝে শিশুমৃত্যুর হড়পা ঘটে গেল মালদহের কালিয়াচকে। ডজন দুয়েক শিশু খিঁচুনি, জ্বর নিয়ে ঝটপট মারা গেছে। পাঁচ গুণ শিশু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এরা মূলত নিম্নবিত্ত পরিবারের। অসুস্থতার কারণ হিসেবে চিকিৎসক-বিজ্ঞানীরা কেউ কেউ প্রাথমিক ভাবে চিহ্নিত করেছিলেন কাঁচা লিচু খাওয়াকেই, তার থেকেই নাকি বাচ্চাদের স্নায়ুর কালান্তক প্রদাহ হয়েছে, বলেছিলেন তাঁরা। সিদ্ধান্তের পক্ষে বিজ্ঞানসম্মত বিচার কতটা আছে, সে বিষয়ে যথেষ্ট জানার আগেই অনেকে খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন।

এটা অভিনব কিছু নয়। মূল অসুখ, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হয়, তা নিয়ে মানুষের উৎসাহ অনেক কম, নতুন কোনও ‘অসুখ’-এর খোঁজ দিলে তা অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। অনেকটা তারার সৌন্দর্যে আনন্দ না পেয়ে উল্কায় বিমোহিত হওয়ার মতো। অপুষ্টি আর স্নায়ুর সংক্রামক ব্যাধিতেই শিশুমৃত্যু হয়েছে, এ সম্ভাবনাই প্রবল। কিন্তু ‘কাঁচা লিচুই দোষী’, এমন একটা আশ্চর্যজনক খবর যেই না শোনা গেল, সঙ্গে সঙ্গে তা ছড়াল লোকমুখে, সংবাদমাধ্যমে। অপুষ্টির মৃত্যু খবর হয় না, কিংবা আমাদের বড় বেশি লজ্জা দেয়। লিচুকে দায়ী করতে পারলে সংবাদ-তৃষ্ণা মেটে, লজ্জা ঢাকারও সুবিধে হয়। এখানেও তা-ই হল। কিন্তু লিচু খাওয়া থামার পরেও শিশুমৃত্যুর প্রবাহ যখন কমল না, তখন সবাই নড়েচড়ে বসে আবিষ্কার করলেন এই মূঢ় বিজ্ঞানের দীনহীন ‘রূপ’। অতএব, লিচুর শাপমুক্তি। এরই মধ্যে বলে রাখা দরকার, মালদহের লোকজীবন কিন্তু অনেক দুর্ভাগ্যের আর দুঃখের মাঝেও লিচু-তত্ত্বে বিশেষ ভরসা পায়নি, গ্রামের মানুষ বলেছেন, গাছের ফল খেয়ে শিশু মরতে পারে? মায়ের দুধ খেয়ে বাচ্চা মরে নাকি কখনও? কিন্তু শোরগোল-তোলা ‘বিজ্ঞানী’ আর সংবাদ-শিকারি মিডিয়া লোকপ্রজ্ঞায় সচরাচর কান দেন না। আর তাই, লোকস্বাস্থ্যের নানান সমস্যায় এ দেশের বিজ্ঞানীদের ভূমিকা নতুন করে পরখ করে দেখার প্রয়োজনটা হঠাৎ করে সামনে এসে পড়েছে।

জীবনলব্ধ নানা ধ্যানধারণায় পুষ্ট থাকে লৌকিক জীবন। পুঁথিগত শিক্ষার অলংকার না থাকলেও, আচার ও সংস্কৃতি সম্পৃক্ত সাধারণ মানুষের জীবনে বিজ্ঞানের যথেষ্ট প্রভাব থাকে। আদিবাসী মানুষের পরিচ্ছন্নতা বোধ অনেক সমৃদ্ধ নাগরিকের জীবনকে লজ্জা দিতে পারে। লোকাচার আর বিশ্বাস সম্পৃক্ত মানুষের এই বিজ্ঞানচেতনাকে আমরা একটু খাটো করে দেখি। আমরা, মানে যারা বিজ্ঞানের ডিগ্রিধারী, পুরোহিত প্রজাতির। আমাদের আত্মশুদ্ধি জরুরি।

এটা ঠিক, শিক্ষা-রিক্ত জনজীবনে সংস্কার বিজ্ঞানভাবনাকে প্রভাবিত করে বড় বেশি। কিন্তু লোকস্বাস্থ্যের পথ চলায় বিজ্ঞান আর সংস্কৃতিকে মিলেমিশে চলতে হয়। বিজ্ঞান দেয় আলো, তীক্ষ্ণতা। সংস্কৃতি অঙ্গন দেয়। বিশ্বাস, বিজ্ঞান সংস্কৃতির যোগফলে লব্ধ ধারণা মানুষের মনে গেঁথে যায় দৃঢ় ভাবে। ভাবনার ভিত্তিভূমি তৈরি হয়। বিজ্ঞান প্রমাণ আর বিশ্লেষণের পথ ধরে এগোয়। তার গতি মন্থর, কিন্তু প্রত্যয়ী। অন্য দিকে সংস্কার এগোয় দ্রুত, বিশ্বাসের জুড়িগাড়িতে। বিহ্বল করে দেওয়া সমস্যায় পড়লে মানুষ প্রথমেই হাত বাড়ায় সংস্কার, লোকাচার আর বিশ্বাসের আলমারিতে। গ্রহণযোগ্য একটা ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়ার জন্য ‘হুজুগ’ হচ্ছে বিশ্বাসের বিভূতি। বিজ্ঞানের সঙ্গে হুজুগের জিনগত সাদৃশ্য নেই, আছে মৌলিক বৈরিতা।

সমস্যা তখনই হয়, যখন বিজ্ঞানের তত্ত্ব ‘হুজুগ’ হয়ে উড়ে বেড়ায়, লোকাচার আর বিশ্বাসের কুঠুরিতে ঢোকার চেষ্টা করে জোর করে। ধীরস্থির প্রামাণ্য তথ্যের অপেক্ষা না করে বিজ্ঞানী যদি তাৎক্ষণিক জিগির তোলায় মনোযোগী হন, তা হলে বিজ্ঞান আর সংস্কার মিলে যা তৈরি করে, তার চিন্তাবিধ্বংসী ক্ষমতা ওঝার তুকতাকের থেকে অনেক বেশি। এই ‘বৈজ্ঞানিক কুসংস্কার’ লোকস্বাস্থ্যের এগিয়ে চলার পথে অন্যতম বড় বাধা। বিজ্ঞানের ডিগ্রিধারী হওয়া আর বিজ্ঞানমনস্কতা ও বিশ্লেষণাত্মক চিন্তার অনুশীলন যে এক নয় লিচু-তত্ত্বের আবিষ্কারকরা আর এক বার তা মনে করালেন, ঝাঁকুনি দিয়ে।

লিচু-তত্ত্ব অতিসরলীকৃত সমীকরণ, না কি দায়িত্ব খালাসের সুকৌশলী পদক্ষেপ, সে জল্পনা থাকুক। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে, আমাদের দেশে বার বার এমনটাই ঘটে। মারণব্যাধির প্রাদুর্ভাব হলেই মঞ্চ সামলানোর জন্য ডাক পড়ে উঁচু আসনে বসা কিছু বিজ্ঞানীর। এঁরা উচ্চ ডিগ্রিধারী, এঁদের আনাগোনা ব্রহ্মলোকে। জীবনে কোনও এক সময়ে প্রত্যেকেই কৃতবিদ্য। পরিকাঠামোর অভাব, জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার নিরলস অভিপ্রায়ের অনুপস্থিতি, অথচ আমার ক্ষমতা আছে তা দেখাতে হবে এই ত্রিভঙ্গে সমৃদ্ধ এই বিজ্ঞানীকুল এমন তত্ত্ব ও সমাধান খুঁজে বার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যা ব্যবস্থাপকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে এটা হয় সব থেকে ভাল। কারণ, চিকিৎসাবিজ্ঞান একমুখী, আর মানুষের দেহ নিয়ে সমাজে কৌতূহলও সব থেকে বেশি। ফলে ‘চিচিং ফাঁক’ বলে বিজ্ঞানী যখন দরজা খোলেন, মানুষ চায় প্রাথমিক মুগ্ধ বিস্ময়ে। এই পরিস্থিতি পাল্টাতে গেলে বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধিৎসু মন আর ক্ষুরধার মস্তিষ্ককে বিসর্জন দিয়ে, বাকি জীবন চেয়ারে বসে ঢেকুর তোলার মোহময় নেশাটা ছাড়া দরকার।

শিশু সুরক্ষায় তো সরকার প্রচুর অর্থ ব্যয় করছেন, নানান পরিকল্পনা, পদ্ধতি-প্রকরণ হচ্ছে, কিন্তু সরকারের সদিচ্ছা কেন ভাষা পাচ্ছে না শিশুমৃত্যুর সারণিতে? বাংলাদেশ, নেপাল যা করতে পারল ভারত পারবে না কেন? তামিলনাড়ু, কর্নাটকের থেকে পিছিয়ে কেন ‘সোনার’ গুজরাত কিংবা বাংলা? বাংলাদেশ এত টাকা ঢালেনি তো, করেনি তো এত যন্ত্রের আয়োজন। যা করেছে, তা আমরাও পারি, যদি ঠিক করি তা করব। শিশুসুরক্ষার প্রকল্পগুলিকে আরও অর্থবহ করতে হলে তাকে লৌকিক জীবনের সঙ্গে নিবিড়তর সম্পর্ক তৈরি করে এগোতে হবে।

এখানে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে স্বনির্ভর মহিলা গোষ্ঠীগুলি। মায়ের থেকে শিশুর ভাষা ভাল আর কেউ বোঝে না। তাঁদের স্নেহবোধকে বিজ্ঞানচেতনায় পরিশীলিত করতে পারলে, আর পাশের বাড়ির শিশুর যত্ন নেওয়ার সামাজিক উদ্যোগে তাঁদের অংশ নেওয়াতে পারলে নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে সঙ্গে শিশুসুরক্ষায় অনেক সুফল মিলবে। বাংলাদেশ সেটা করে দেখিয়েছে।

এরই পাশাপাশি দরকার প্রতিটি শিশুর জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাবান হওয়া। ‘জিরো-টলারেন্স’-এর ‘সামাজিক পাগলামি’ তৈরি করতে না পারলে সব শিশু থাকবে না এ দেশে। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ আমাদের ব্যবস্থা আগে চলুক আরও। কিন্তু শুধু কারিগরি উন্নতি দিয়ে শিশুস্বাস্থ্যের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন হবে না। শিশু সুরক্ষার আয়োজনকে জনজীবনের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা দরকার। মানুষ কী চাইছেন, কী ভাবে চাইছেন, ধৈর্য ধরে তা বোঝা ও শোনা দরকার। তাতে ফল পাওয়া যেতে পারে।

চিকিৎসক, লিভার ফাউন্ডেশন-এর সচিব

abhijit chowdhuri lichi incident
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy