Advertisement
E-Paper

ছোট বাম বড় বাম

তি নি যে অনেক বড় মাঠের খেলোয়াড়, আগেই বোঝা গিয়াছিল। যে রাজনৈতিক দলের ছাত্র-শাখার অংশ তিনি, সেই দলও উত্তম রূপে বুঝিয়াছিল। সম্ভবত সেই কারণেই মার্চ মাসে জ্বালাময়ী বক্তৃতায় গোটা দেশে শিহরন-স্রোত বহাইয়া দিবার পরও মে মাসের নির্বাচনে সেই দলের হইয়া তাঁহাকে নির্বাচনী প্রচারে নামানো হইল না।

শেষ আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০০:০০

তি নি যে অনেক বড় মাঠের খেলোয়াড়, আগেই বোঝা গিয়াছিল। যে রাজনৈতিক দলের ছাত্র-শাখার অংশ তিনি, সেই দলও উত্তম রূপে বুঝিয়াছিল। সম্ভবত সেই কারণেই মার্চ মাসে জ্বালাময়ী বক্তৃতায় গোটা দেশে শিহরন-স্রোত বহাইয়া দিবার পরও মে মাসের নির্বাচনে সেই দলের হইয়া তাঁহাকে নির্বাচনী প্রচারে নামানো হইল না। কানহাইয়া কুমারকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি কী ভাবে ‘ব্যবহার’ করিবে, তাহা এখনও অস্পষ্ট, অনিশ্চিত। তাঁহার মধ্যে যে বিরাট রাজনৈতিক সম্ভাবনা, যে নেতৃত্বগুণে বাগ্প্রতিভায় তিনি ঋদ্ধ, তাহাতে সিপিআই বা সিপিআই(এম)-এর বর্তমান নেতাদের তিনি অনায়াসে ছাড়াইয়া যাইতে পারেন। কিন্তু তবু তিনি এখনও মূল দলের বাহিরেই। ইহা সৌভাগ্যজনক বটে। দলভুক্ত হন নাই বলিয়াই কানহাইয়া কুমার তাঁহার রাজনৈতিক দর্শন এখনও সদর্পে প্রচার করিতে পারিতেছেন: বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিরোধী ঐক্য সংসাধন। দলের সদস্য হইলে তাঁহাকে অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া ‘লাইন’ বাছিতে হইত। তিহাড় জেল হইতে নিষ্ক্রান্ত যুবনেতা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দাঁড়াইয়া বলিয়াছিলেন ‘রাজনৈতিক ক্রান্তির আগে সামাজিক ক্রান্তি চাই’। সেপ্টেম্বরের কলিকাতার বাম ছাত্রসমাবেশে দাঁড়াইয়া নিজেদেরই দলনেতার উদ্দেশ্যে তাঁহার নির্ঘোষ: ‘লড়াই না চাহিলে কাকা আপনি নিউ ইয়র্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াইতে যান, আমরা এখানে লড়াই চালাইয়া লইব’। দলস্থ হইলে এহেন বাক্- ও চিন্তা-স্বাধীনতা কানহাইয়া কুমারের থাকিত কি?

ভারতীয় জনতা পার্টির রাজনীতি ও আদর্শের মধ্যে নিহিত বিপদটি যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় পল্লবিত হইয়া ভয়ঙ্কর উল্লাসে ভারতীয় গণতন্ত্রের মূলগত স্বাধীনতা হরণ করিতে চলিয়াছে, কানহাইয়া কুমারের মতো জোর গলায় সে কথা আর কয় জন বিরোধী নেতা বলিয়াছেন? কমিউনিস্ট পার্টির যে নেতারা এমন ভাবিয়া বড় জোটের চেষ্টা করিয়াছেন, দলের ভিতর হইতেই তাঁহারা বাধাপ্রাপ্ত। প্রাক্তন সিপিআই(এম) জেনারেল সেক্রেটারি প্রকাশ কারাট উত্তরসূরি সীতারাম ইয়েচুরিকে পরোক্ষ সমালোচনায় বিদ্ধ করিয়া এমনও বলিয়াছেন যে, মোদীর শাসনকে সত্যই ‘ফ্যাসিবাদী’ বলা যায় না, বড়জোর ‘কর্তৃত্ববাদী’ বলা চলে! সম্ভবত এই প্রেক্ষিতেই কানহাইয়া কুমারের দুর্দান্ত ‘কাকা’-ভর্ৎসনা। কুমার সোজা পাখির চোখটিই দেখিয়াছেন। মোদীরাজত্বকে ফ্যাসিবাদী বলা না গেলে বৃহত্তর প্রতিরোধী ঐক্যের প্রশ্নও ওঠে না, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস-সিপিআই(এম) জোটও বেবাক ভুল প্রমাণিত হয়। অথচ তাঁহার স্পষ্ট বিশ্বাস, হিন্দুত্ববাদের তুফান ঠেকাইতে হইলে বৃহৎ প্রতিরোধ গড়িতেই হইবে, সব রকম স্বাধীনতাকামীকে এক ছাতার তলায় আনিতেই হইবে। ‘আজাদি’ বলিতে কত গোত্রের ভাবনা তাঁহার মাথায়, মার্চের বক্তৃতাতেই সেই পরিচয় ছিল।

সমস্যা এইখানেই। বড় করিয়া ভাবা আর ছোট করিয়া ভাবিবার তফাতের মধ্যে। কারাট ও তাঁহার সহকর্মীরা ছোট করিয়া ভাবিবার প্রতিযোগিতায় রত। বিপদ এ দিকে বৃহৎ হইতে বৃহত্তর হইতেছে। কর্তৃত্ববাদ ও ফ্যাসিবাদের মধ্যে যে চুলচেরা দূরত্ব, তাহার সতর্ক, সমাহিত বিশ্লেষণের অবকাশে দেশময় দলিত-সংখ্যালঘু-স্বাধীনচেতা নাগরিক বিনাশের জিগির উঠিতেছে। এই বিপন্ন সীমায়িত চিন্তাগণ্ডির বাহিরে কানহাইয়া কুমার সম্পূর্ণ নূতন রাজনীতির ঝলক। বর্ষীয়ানরা যাহা ভাবিতেও অপারগ, এই রাজনীতি হয়তো পারিবে। স্বাধীনতা ও অধিকারের দাবি প্রথাগত বাম পরিমণ্ডলের বাহিরে বহিয়া লইয়া যাইবে। এ দেশের বাম রাজনীতি মৃত্যুর দোরগোড়ায়। যদি এখনও প্রাণে বাঁচিতে হয়, নিজেকে বড় করিয়া লওয়া ছাড়া পথান্তর নাই।

Advertisement
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy