Advertisement
E-Paper

না, আমি কিছুতেই ঘৃণা করব না

গাজা স্ট্রিপে লড়াই চলছে। শান্তি অসম্ভব, বলেছেন ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। কিন্তু এক প্যালেস্টিনীয় ডাক্তার, আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন শান্তি স্থাপন করার। তাঁর জীবন দিয়ে, তাঁর মেয়েদের প্রাণের বিনিময়ে। সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়তখন বিকেল পাঁচটা। আবদুল্লা, মানে আমার ছোট ছেলেকে কাঁধে নিয়ে বাড়ির ভেতরেই ঘুরে বেড়াচ্ছি। সবার ঘরের সামনে দাঁড়াচ্ছি, একটু কথা বলছি, খুনসুটি করছি। স্বাভাবিক জীবনের এক-আধ টুকরো ওরও প্রাপ্য।

শেষ আপডেট: ২০ মার্চ ২০১৪ ০৪:০০
পরাক্রমের মাসুল। (বাঁ দিক থেকে) বেসান, আইয়া (ওপরে), মায়ার (নীচে), নুর।

পরাক্রমের মাসুল। (বাঁ দিক থেকে) বেসান, আইয়া (ওপরে), মায়ার (নীচে), নুর।

তখন বিকেল পাঁচটা। আবদুল্লা, মানে আমার ছোট ছেলেকে কাঁধে নিয়ে বাড়ির ভেতরেই ঘুরে বেড়াচ্ছি। সবার ঘরের সামনে দাঁড়াচ্ছি, একটু কথা বলছি, খুনসুটি করছি। স্বাভাবিক জীবনের এক-আধ টুকরো ওরও প্রাপ্য। দিনের পর দিন ঘরে বন্দি থাকা, মিসাইল ছোড়াছুড়ি, ট্যাঙ্কারের যাতায়াত, মিলিটারি বুটের খটখট, ধোঁয়া, অন্ধকার ছ’বছরের একরত্তি ছেলেটা কি এত কিছু বুঝে উঠতে পারে? ছোট মেয়ে রাফা বায়না করছিল স্যান্ডউইচ বানাবে, আর তাই রান্নাঘরে বেসান, আমার বড় মেয়ে, ওকে সাহায্য করছিল। আমার আর তিন মেয়ে আইয়া, মায়ার আর শাথা ওদের খুড়তুতো বোন নুরের সঙ্গে গল্প করছিল। আমাদের চার তলা বাড়িতে আমরা সবাই বন্দি। মেয়েদের ঘর থেকে বেরিয়েছি, হঠাৎ একটা ভয়ঙ্কর আওয়াজ। যেন আমার ভেতর ফুঁড়ে পৃথিবী বেরিয়ে এল হাড়-মাস-গলা মাংসপিণ্ড নিয়ে। ধোঁয়ায় ধোঁয়া, বাড়ির টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে। বুঝতে পারলাম, শেলিং হয়েছে বাড়িতে। স্তব্ধ কিছু সেকেন্ড। ধুলোর ঘূর্ণি একটু থিতিয়ে যেতেই দেখলাম, শাথা সামনে দাঁড়িয়ে, একটা চোখ বেরিয়ে চলে এসেছে ওর গালে, ওর আঙুল ঝুলছে চামড়ার এক সুতোয়, আমার ফুটফুটে মেয়েটা রক্ত ভেসে যাচ্ছে। আর বেসান, মায়ার, আইয়া, নুর? তাদের সোয়েটার পরা হাত, ডেনিম পরা পা ছড়িয়ে রয়েছে পুতুলের হাত-পা’র মতো। ঘরের দেওয়াল আর বুকের পাঁজর একই ভাবে ভেঙেছে বোধ হয়। ধুকপুকে হৃদয়গুলো, স্বপ্নের আখড়া ছিল যেখানে, সেগুলো মাছের পিত্তির মতো পুটপুট করে গলে গিয়েছে। ওই যে ব্রেন ম্যাটার আইয়ার, ওখানেই তো ম্যাথমেটিশিয়ান হওয়ার সব রসদ ছিল, এখন সর্দির ফোঁটার মতো ছাদে লেগে আছে। মায়ারের খুব লিপগ্লসের শখ হয়েছিল, কবর দেওয়ার সময় ওর ঠোঁট খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সে দিন ১৬ জানুয়ারি ২০০৯। ২০০৮-এর ২৭ ডিসেম্বর গাজা স্ট্রিপে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। প্যালেস্তিনিয়ান জঙ্গি সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে ইজরায়েলি বাহিনীর প্রবল অভিযান আর তার জবাবে হামাসের ইজরায়েলি ভূখণ্ডে রকেট ছোড়া। গাজায় ইজরায়েলি আক্রমণ চলছিল দিনের পর দিন। কিন্তু আমার বাড়িতে ওরা কেন শেলিং করল? সেখানে তো কোনও উগ্রপন্থীকে আশ্রয় দেওয়া হয়নি! সেনা অফিসাররা বলল, গাজা স্ট্রিপ-এ জঙ্গি হামাসকে দমন করার জন্য অভিযান চলছে, আমার মেয়েরা মারা গেছে ঠিকই, কিন্তু তারা আক্রমণের লক্ষ্য ছিল না। তার মানে, কোল্যাটারাল ড্যামেজ? আমার ফুটফুটে পরির মতো মেয়েরা?

আমি ইজেলদিন আবুয়েলাইশ। ১৯৪৮-এ ইজরায়েল তৈরির সময়, বহু প্যালেস্তিনিয়ান পরিবার বাসভূমি থেকে বিতাড়িত হয়। আমাদের পরিবার পালিয়ে আসে গাজা স্ট্রিপে, ঠাঁই নেয় জাবালিয়া ক্যাম্পে। আমার জন্ম সেখানেই, সাত বছর পরে। ক্যাম্পে আলো ছিল না, জল আসত অল্পক্ষণের জন্য, বাথরুম ছিল না, নোংরায় বিজবিজ চার দিক, গাড়ি করে সপ্তাহে এক দিন কেরোসিন তেল আর কাঠ আসত। আমি বাড়ির বড়, তাই হাত-পা চলতে যেই শুরু করেছে, তখন থেকে বাড়ির গরিবি হটাও কর্মযজ্ঞে যোগ দিয়েছি। আমি রাত তিনটেয় উঠে দুধের লাইন থেকে এক্সট্রা দুধ জোগাড় করে বেচেছি, কুলিগিরি করেছি, ইট বয়েছি, মুরগির খাঁচা বানিয়েছি। আর একটাই জিনিস প্রাণ দিয়ে করেছি। পড়াশোনা। ওই ছোট বয়সেই বুঝেছিলাম, পড়াশোনা একটা মুক্তির চাবি। কায়রোয় ডাক্তারি পড়েছি। স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে গিয়েছি। ফিরে এসে ইজরায়েলের হাসপাতালে সহকর্মী হয়ে কাজের অধিকার অর্জন করেছি।

আর তখন থেকে একটাই চেষ্টা করেছি, শান্তি স্থাপনের চেষ্টা। আমি ইজরায়েলিদের ভুল ভাঙাতে এসেছি। আমি গাজার লোক বলে ইজরায়েলের ওপর প্রতিশোধ নিতে আসিনি। বলেছি, গাজা স্ট্রিপের মানুষগুলোর দিকে তাকাও, বোঝার চেষ্টা করো তাদের জীবনটাকে। ভাবার চেষ্টা করো, তারা কী ভাবে এক ফালি দমবন্ধ-করা ভূখণ্ডে গাদাগাদি করে ইজরায়েলের দয়ায় বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়। তুমি কতটা খাবার পাবে, তুমি চাকরি পাবে কি না, তুমি বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারবে কি না, কঠিন অসুখ হলে গাজার অনুন্নত হাসপাতাল ছেড়ে অন্য জায়গায় গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারবে কি না, এক বার বেরিয়ে গেলে আর ফিরতে পারবে কি না, সবই নির্ভর করে ইজরায়েলের মর্জির ওপর। এক জন শিক্ষিত যুবক যখন কোনও চাকরি পায় না, এক জন মানুষ যখন খাবার পায় না, এক জন বৃদ্ধ যখন চিকিৎসা পায় না, এক জন বাচ্চা যখন বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, তখন মাথার ঠিক রাখা সম্ভব? যখন তাদের কোনও আর্তি পৃথিবীর কাছে পৌঁছতে দেওয়া হয় না, তখন ‘আমাদের কথা শুনুন’, এটা বোঝাবার জন্যও তারা কসম রকেট হাতে তুলে নেয়। কিন্তু নিজেকে এই প্রতিশোধের খেলায় যেতে দিইনি কিছুতেই। ধৈর্য ধরে চেষ্টা করে গিয়েছি শান্তি প্রতিষ্ঠার।

উপায়ই বা কী? ধৈর্য যদি না বাড়াই, তা হলে আমাকেও তো কসম রকেট হাতে তুলে নিতে হয়। সেটা কি কোনও সমাধান? একটু জ্ঞানবুদ্ধি হওয়ার পর থেকে আমি চেষ্টা করেছি রাগ আর ঘৃণা, এই দুটো জিনিসকে মনে স্থান না দিতে। নিজের ক্ষুদ্রতাকে পেরিয়ে যেতে। ইজরায়েলি মানুষের কাছে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি গাজার লোক মানেই খারাপ নয়, টেররিস্ট নয়। অনেকে বিশ্বাস করেছে, তারা আমার সঙ্গে কাজ করেছে বা আমায় চেনে। অনেকে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু আমি কোনও ইজরায়েলিকে কোনও দিন ঘৃণা করিনি। যখন আমার তিন মেয়ে মারা গেল, তখনও নিজেকে বলেছি, আমি ঘৃণা করব না। ঘৃণা করা খুব সহজ, কিন্তু ওতে কোনও লাভ হয় না। আমার আরও পাঁচ ছেলেমেয়ে রয়েছে। আমার বেসান, মায়ার আর আয়া কোনও দিন ফিরে আসবে না। কিন্তু আমার ঘৃণা ফিরে এসে বাকিদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিতে পারে।

আমি এখন কানাডার টরন্টোয় এক হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। আমার অ-ঘৃণার মিশন নিয়ে যেতে চেয়েছি সারা বিশ্বে। সে-মিশনের কথা বলে চলেছি সেই ২০০৯ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। ডটারস ফর লাইফ www.daughtersforlife.com সংস্থা তৈরি করেছি, যে সংস্থা মধ্য এশিয়ার মেয়েদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেবে। তাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমার মেয়েরা এ ভাবেই তাদের বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়ের শোধ নেবে।

ইজেলদিন, আপনাকে কুর্নিশ। আপনার মতো হতে পারা প্রায় অসম্ভব। ঘৃণা অনুভূতিটাই এত জোরাল যে তার কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করা বড় কঠিন। আর ঘৃণা তো খানিকটা মাদকের মতোও, নিজের ভেতর সে যত জারিয়ে ওঠে, ততই তার দাঁত-নখ বেরিয়ে এসে নিজের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়। হয়তো খানিক আত্ম-করুণাও উথলে ওঠে। তার একটা মোহ আছে। সেটা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নিজেকে আয়নায় দেখতে হয়। যা ভয়ঙ্কর কঠিন। আপনি পেরেছেন।

কিন্তু এটা ছাড়া আপনার কি আর কোনও উপায় ছিল? আপনি নিজেই বলেছেন, ঘৃণা এসে মনে বসতি করলে পাঁচ ছেলেমেয়েকে ঠিক ভাবে মানুষ করতে পারতেন না। সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠার উদাহরণ তাদের সামনে রাখতে পারতেন না। এই অ-ঘৃণা হয়তো আপনার রক্ষাকবচ। আপনার ঘৃণাকে, প্রতিশোধের স্পৃহাকে স্বীকার করলে আপনি ক্ষয়ে যেতেন। মনুষ্যত্বের আধার ক্ষয়ে যেত আপনার। আপনি আপনার চেয়ে উন্নততর ইজেলদিন হয়ে উঠতে পারতেন না। এই প্রয়াস, ‘আমাকে আরও মহান হয়ে উঠতে হবে’, এটা হয়তো আসলে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিতে না পারার একটা হাতিয়ার। তা না হলে আপনিও টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যেতেন, আর আপনার লাশ বহন করত আপনার বাকি জীবন। আপনি এই ঘৃণা না করার অনুভূতিকে দত্তক নিয়েছেন। তাকে যত্নে, সজাগ মনে লালন-পালন করেছেন। নতুবা, ইজেলদিন আবুয়েলাইশ-এর জীবনচর্চা, ইজরায়েলি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা, গোটা বিশ্বে শান্তির বাণী ধ্বনিত করার আকুল ইচ্ছে ধ্বংস হয়ে যেত। নিতান্ত এক সাধারণ পিতা হয়ে আপনাকে বাঁচতে হত।

যে পিতার শোক জড়িয়ে নিত তাঁর অন্য সন্তানদের।

কিন্তু আপনি ঘৃণা না করে বাঁচতে পেরেছেন। এই জন্যই আপনি ২০১০ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের তালিকায় ছিলেন। এই জন্যই ২০১৩ সালের করাচি লিটারেচার ফেস্টিভ্যালে আপনার অভিজ্ঞতা শুনে শ্রোতারা কান্না সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। আপনাকে সাধুবাদ জানানো ধৃষ্টতা। যে রক্ষাকবচ আপনি আবিষ্কার করেছেন তা প্রবলপরাক্রমী ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও অনেক শক্তিধর। একে বাঁচিয়ে রাখুন, এই অস্ত্রই আমাদের মতো সাধারণদের না হোক, আপনাকে অন্তত বাঁচিয়ে রাখবে এক বিরাট গিলতে-আসা ঘৃণার কবল থেকে।

আই শ্যাল নট হেট, ইজেলদিন আবুয়েলাইশ। ব্লুমসবেরি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy