Advertisement
E-Paper

প্রাণের মূল্য

মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের অগ্নিকাণ্ডে তিন ব্যক্তি প্রাণ হারাইলেন। অন্য রোগীরা নেহাত কপালজোরে বাঁচিয়াছেন। এমন ঘটনার সম্মুখে নিন্দাবাক্যও স্তব্ধ হইয়া যায়। এই দুর্ঘটনার পশ্চাতে কত স্তরের কত আধিকারিকের ব্যর্থতা রহিয়াছে, ভাবিলে মস্তিষ্ক অবশ হয়।

শেষ আপডেট: ৩১ অগস্ট ২০১৬ ০০:০০

মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের অগ্নিকাণ্ডে তিন ব্যক্তি প্রাণ হারাইলেন। অন্য রোগীরা নেহাত কপালজোরে বাঁচিয়াছেন। এমন ঘটনার সম্মুখে নিন্দাবাক্যও স্তব্ধ হইয়া যায়। এই দুর্ঘটনার পশ্চাতে কত স্তরের কত আধিকারিকের ব্যর্থতা রহিয়াছে, ভাবিলে মস্তিষ্ক অবশ হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা রাখেন নাই। দমকলের কর্তারা তাহা জানিয়াও কিছু করেন নাই। জেলা স্বাস্থ্য দফতর উদাসীন। রাজ্য স্বাস্থ্য কর্তারা মেডিক্যাল কলেজে সিট বাড়াইতে তৎপর, রোগীর প্রাণ বাঁচাইতে নহে। রোগী কল্যাণ সমিতি অর্থবল, লোকবল লইয়াও ঠুঁটো। এ সকল বিষয়ে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালটি ব্যতিক্রম নহে। কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে বিশ্বের সর্বাধিক ভয়ানক অগ্নিকাণ্ড ঘটিবার পরেও রাজ্যের হাসপাতালগুলিতে অগ্নিসুরক্ষার ব্যবস্থা হয় নাই, সংবাদে তাহা বার বার প্রকাশিত হইয়াছে। কর্তারা কর্ণপাত করেন নাই, করিলেও তাহার কোনও প্রমাণ রাখেন নাই। আজ ভয়ানক কাণ্ড ঘটিবার পর যে ‘তদন্ত’ শুরু হইয়াছে, তাহা বিরোধীদের উপর দায় চাপাইবার রাজনৈতিক কসরত বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। অভিযোগের সত্যতা তর্ক ও তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু রাজ্যের প্রায় যে কোনও ছোট-বড় সরকারি হাসপাতালে ‘তদন্ত’ করিলে চোখে পড়িবে, অগ্নিনির্বাপণ-সহ সুরক্ষার নানাবিধ আবশ্যক ব্যবস্থার কোনওটি নাই। তাহা কি বিরোধীর ষড়যন্ত্র, না কি অর্থের অভাব? কোনওটিই নহে। ইহার কারণ, এ দেশে মানুষের প্রাণের মূল্য বড়ই কম। সামান্য দুই-চারিটি প্রাণ গেলে দুই-এক দিন হইচই হইয়া থাকে। দোষ কাহার, তা লইয়া চাপান-উতোর চলিতে থাকে। অতঃপর নূতন সংকট আবির্ভূত হয়, মৃতদের কথা সকলে ভুলিয়া যায়। দুই-তিন লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিলেই ‘যথেষ্ট হইল’ বলিয়া মনে করা হয়। তাহাতে সরকারের মহানুভবতার প্রচারও হইয়া থাকে। ইহার তুলনায় সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা আর কী হইতে পারে?

এমন মানসিকতার জন্য দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং বিপর্যয় মোকাবিলা, উভয়কেই ‘অনাবশ্যক’ বলিয়া মনে হইয়া থাকে। আগুন নিভাইবার স্বয়ংক্রিয় উপায়, অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে বাহির হইবার বিকল্প রাস্তা নির্মাণ প্রভৃতির জন্য ব্যয় করিবার প্রয়োজন নাই। বিপর্যস্তদের উদ্ধারেরও কোনও ব্যবস্থা নাই। এ বিষয়ে সরকার ও বেসরকারি সংস্থা এক। ঢাকুরিয়ার বেসরকারি হাসপাতালে আগুন লাগিলে আশেপাশের মানুষ নিজেদের প্রাণ বিপন্ন করিয়া রোগীদের বাহির করিয়াছিলেন। মুর্শিদাবাদেও রোগী ও তাহাদের আত্মীয়রা সাধ্যমত নিজেদের ও অপরকে বাঁচাইয়াছেন। নবজাতক শিশুদের উদ্ধার করিবার কাজটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েক জন করিয়াছেন। অন্যান্য দেশ উদ্ধারকার্যের জন্য নানা প্রশিক্ষণ দিয়া থাকে। আগুন লাগিলে কী করিতে হয়, তাহার নিয়মিত মহড়া দিয়া থাকে। এ দেশে, তথা এ রাজ্যে সে সকলই বাহুল্য। এত পরিশ্রম করিয়া হইবে কী? দুই-একটি মানুষ মরিবে বই তো নয়।

প্রাণ অমূল্য। দেশের মানুষের প্রতি তাহার নির্বাচিত সরকারের দায়বদ্ধতাও মূল্যবান। সরকারি হাসপাতালে এমন ঘটনা ঘটিলে সেই দায়বদ্ধতার ঘাটতি বড় প্রকট হইয়া পড়ে। স্পষ্ট হয়, কলেজ হইতে হাসপাতাল, সর্বত্র মন্ত্রী ও নেতারা প্রশাসনের মাথায় বসিয়া আছেন আধিপত্যের ইচ্ছা লইয়া। মানুষকে পরিষেবা দিবার যথেষ্ট আগ্রহ তাঁহাদের নাই। কাহারও কাহারও হয়তো আছে, কিন্তু তাঁহারা ব্যতিক্রম। দায়িত্ব যাঁহাদের, ন্যূনতম দায়িত্বও তাঁহারা পালন করেন না। অর্থ পড়িয়া থাকে, কাজ হয় না। নিজেদের অপদার্থতা ও অমানবিকতায় লজ্জিত হইতেও তাঁহারা ভুলিয়াছেন। এই ক্ষতি অর্থ দ্বারা পূরণ হইবার নহে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy