ফুচকার শেষ পাতে ফাউ তেঁতুলজলের স্বাদ যাঁহারা জানেন, তাঁহারা বিলক্ষণ বুঝিবেন, প্রশ্নপত্রের শেষে বাড়তি নম্বর পাইবার সুযোগ থাকিলে কতখানি আনন্দ হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের সোশ্যাল সাইকোলজির অধ্যাপক ডিলান সেল্টারম্যান ২০০৮ সাল হইতে তাঁহার ছাত্রছাত্রীদের এই সুযোগ দিতেছেন। ছাত্রছাত্রীদের শুধু বাছিয়া লইতে হয়, তাঁহারা কত নম্বর ফাউ পাইতে ইচ্ছুক— দুই, না কি ছয়? তবে, জীবনের কোনও আনন্দই যেমন অবিমিশ্র নহে, এই পড়িয়া পাওয়া নম্বরের ক্ষেত্রেও একটি প্যাঁচ আছে। অধ্যাপক জানাইয়া দিয়াছেন, দশ শতাংশের বেশি ছাত্রছাত্রী যদি ছয় নম্বর বাড়তি পাইতে চাহেন, তবে কাহারও ভাগ্যেই কিছু জুটিবে না। বস্তুত, গত আট বৎসরে মাত্র এক বারই ছাত্রছাত্রীরা বাড়তি নম্বর অর্জনে সফল হইয়াছিলেন।
সেল্টারম্যানের পরীক্ষাটি মানব চরিত্রের একটি বিশেষ দিকের পরিচায়ক। সকলে স্বল্প পরিমাণ লইলে যাহা প্রত্যেকের ভাগে জোটে, শুধু লোভের বশে মানুষ তাহার এমনই অপব্যবহার করে যে শেষ অবধি কাহারও জন্য কিছুই আর পড়িয়া থাকে না। মানুষ লোভের বশে অরণ্যসম্পদ বা জলের ন্যায় বহু প্রাকৃতিক সম্পদই এই পথে ধ্বংস করিতেছে। বস্তুত, যেখানে সহযোগিতার গুরুত্ব অপরিসীম এবং সেই গুরুত্বের কথা প্রত্যেকেই জানেন, সেখানেও অসহযোগিতা মানুষের স্বভাব। এই পরীক্ষাটির ক্ষেত্রেই যেমন। ছাত্রছাত্রীরা জানেন, তাঁহারা এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হইবেন— আট বৎসরের অভিজ্ঞতা ফেলনা নহে। অতএব, তাঁহারা পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করিবার পূর্বেই নিজেদের মধ্যে স্থির করিতে পারিতেন, প্রত্যেকেই দুই নম্বর চাহিবেন, যাহাতে প্রত্যেকের ভাগেই তাহা জোটে। কিন্তু, আট বারের মধ্যে সাত বারই অন্তত দশ শতাংশ ছাত্রছাত্রী ছয় নম্বর চাহিয়াছিলেন। সেই বৎসরগুলির ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের মধ্যে জোট করিয়াছিলেন কি না, জানা নাই। কিন্তু, তাঁহারা অন্যের কথা ভাবেন নাই, এইটুকু স্পষ্ট। এবং, অন্যের কথা না ভাবিলে যে নিজেরও ক্ষতি, এই ঘটনা হইতে সেই শিক্ষাটি গ্রহণীয়।
সহযোগিতা করিবার কথা দেওয়ার পরেও তাহার খেলাপ করিবার ঘটনা আকছার ঘটিয়া থাকে। বিশেষত যে চুক্তি শুধু এক বারের জন্য, সেই ক্ষেত্রে। অন্যান্যরা যদি চুক্তিমাফিক চলে, তবে এক জনের পক্ষে চুক্তি ভাঙাই লাভজনক। এই ক্ষেত্রে যেমন প্রত্যেকে চুক্তিমাফিক দুই নম্বর চাহিলে এক জনের পক্ষে সেই চুক্তি ভাঙিয়া ছয় দাবি করা লাভজনক। কিন্তু তত ক্ষণই, যত ক্ষণ না দশ শতাংশ ছাত্রছাত্রী চুক্তি ভাঙিবার কথা ভাবে। চুক্তি ভাঙিলে যে লাভ, এই কথাটি প্রত্যেকেই সমান ভাবে জানেন। কিন্তু, প্রত্যেকে আবার এই কথাটিও জানেন যে অন্যরাও একই লাভ করিতে চাহিলে কাহারও ভাগ্যে কিছু জুটিবে না। তবুও, আট বারের মধ্যে সাত বারই অন্তত দশ শতাংশের বেশি ছাত্রছাত্রী অন্যান্যদের তুলনায় অধিক লাভ করিতে চাহিয়াছিলেন। অনুমান করা চলিতে পারে, তাঁহারা অন্যান্যদের তুলনায় নিজেদের অধিক বুদ্ধিমান ভাবিয়াছিলেন। কিন্তু, সকলেই তাহা ভাবায় প্রত্যেকেই বোকা বনিলেন। ইহাও একটি শিক্ষা— অকারণে নিজেকে অন্যদের তুলনায় চালাক ভাবিতে নাই। অপরকে বঞ্চিত করিয়া নিজের আখের গুছাইবার চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত বিশেষ লাভ হয় না। কথাটি সেল্টারম্যানের ছাত্রছাত্রীরা শিখিলেন কি না, তাহার তুলনায় ব়ড় প্রশ্ন, কথাটি মানবসভ্যতা আর কবে শিখিবে?