E-Paper

স্বার্থরক্ষা

কলকাতা হাই কোর্ট এই কাজ শেষ করার জন্য ১৫ ফেব্রুয়ারি অবধি সময় বেঁধে দিয়েছিল। তার থেকে বাঁচতে রাজ্য সরকার যুক্তি দেয় যে, উৎসবের কারণে ২০ ফেব্রুয়ারির আগে চিংড়িঘাটায় রাস্তা বন্ধ করা করা সম্ভব নয়। হাই কোর্ট সে যুক্তি মানতে অসম্মত হওয়ায় সরকার সুপ্রিম কোর্টে যায়।

শেষ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ ০৬:১৬

দায়িত্ব পালনে গাফিলতি বা ব্যর্থতা ঢাকতে শীর্ষ আদালতে মামলা ঠোকার কু-অভ্যাসটি সম্ভবত রাজ্য সরকারের মজ্জায় প্রবেশ করেছে— ফলে, আদালত যতই তিরস্কার করুক, সরকার সেই বেলতলাতে যাবেই। মেট্রোর অরেঞ্জ লাইন বিষয়ে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ এড়াতেও সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিল রাজ্য সরকার। আদালত সে মামলা খারিজ করে দিয়েছে তো বটেই, মামলার কারণটি নিয়ে তীব্র ভর্ৎসনাও করেছে। বলেছে যে, কোনও নির্বাচিত সরকারের কাছে পরিবহণ পরিকাঠামো নির্মাণের চেয়ে উৎসবের গুরুত্ব বেশি হতে পারে, এ কথা আদালত আশাও করতে পারে না। এই তিরস্কারেও রাজ্য সরকারের হুঁশ ফিরবে, রাজ্যবাসীর ততখানি আশা করার সাহস হবে কি? কিন্তু, আরও গুরুতর প্রশ্ন, চিংড়িঘাটায় ৩৬৬ মিটার উড়ালপথ নির্মাণের কাজটিতে এই বিপুল গাফিলতির কারণ কী? এ প্রশ্নের একটি সম্ভাব্য উত্তর, নির্বাচনের আগে আরও একটি মেট্রোপথ চালু করে কেন্দ্রীয় সরকার সে কৃতিত্ব দাবি করবে, তাতে রাজ্যের শাসক দলের আপত্তি রয়েছে। ভিন্নতর উত্তর হল, এই পথে মেট্রো চালু হয়ে গেলে অটোচালকদের রমরমায় টান পড়বে, এবং দলের সমর্থক-ভিত্তির কথা ভেবেই সে কাজটি যত দিন সম্ভব পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

দু’টি কারণের মধ্যে একটিও প্রকাশ্যে বলার মতো নয়— আদালতের সামনে তো নয়ই। ফলে, রাজ্য সরকার একের পর এক কুযুক্তি খাড়া করে চলেছে। কলকাতা হাই কোর্ট এই কাজ শেষ করার জন্য ১৫ ফেব্রুয়ারি অবধি সময় বেঁধে দিয়েছিল। তার থেকে বাঁচতে রাজ্য সরকার যুক্তি দেয় যে, উৎসবের কারণে ২০ ফেব্রুয়ারির আগে চিংড়িঘাটায় রাস্তা বন্ধ করা করা সম্ভব নয়। হাই কোর্ট সে যুক্তি মানতে অসম্মত হওয়ায় সরকার সুপ্রিম কোর্টে যায়। সেখানে রাজ্যের আইনজীবী জানান, যে রাস্তাটি বন্ধ করার কথা হচ্ছে, সে রাস্তায় বহু অ্যাম্বুল্যান্স চলে, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের গাড়িও যায়। অতএব, সে রাস্তা বন্ধ করার জন্য রাজ্য সরকারের আরও সময় চাই। ২০ ফেব্রুয়ারি অবধি রাজ্যে ঠিক কোন উৎসব চলছিল, এখনও সে প্রশ্নের জবাব মেলেনি— কিন্তু, সাময়িক ভাবে বাইপাস বন্ধ হলে রোগীদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে, এ যুক্তিটি মারাত্মকতর। বিকল্প পথ তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্ব রাজ্য প্রশাসনের— সে পথে অ্যাম্বুল্যান্স বা অন্যান্য জরুরি পরিষেবার গাড়ি যাতে নির্বিঘ্নে চলতে পারে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও। রাজ্য প্রশাসন সে দায়িত্ব পালন করুক। ইতিমধ্যেই যত দিন সময় পাওয়া গিয়েছে, তার কোনও রকম সদ্ব্যবহার করতে প্রশাসন ব্যর্থ হল কেন, সে প্রশ্নের উত্তরও একই সঙ্গে দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু রোগীদের ঢাল বানানোর এই অপচেষ্টাটির কোনও পুনরাবৃত্তি যেন রাজ্যবাসীকে দেখতে না-হয়।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক শাসকরা একটি কথা স্পষ্ট ভাবে বুঝে নিতে পারেন— রাজনীতি তাঁদের মাথাব্যথা, রাজ্যবাসীর নয়। ফলে, নিজেদের ভোটের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে রাজ্যের সাধারণ মানুষের স্বার্থকে এ ভাবে বারংবার লঙ্ঘন করা যায় না। মেট্রো রেলের নতুন পথ চালু হলে কেন্দ্রীয় সরকার যদি সে কৃতিত্ব দাবি করে, এবং তৃণমূল কংগ্রেস যদি তা দিতে নারাজ হয়, তবে সে লড়াই তাদের লড়তে হবে রাজনীতির ময়দানে। অথবা, কোনও রুটের অটোচালকদের রুজি বিঘ্নিত হলে যদি তার ক্ষতিপূরণ রাজনৈতিক ভাবে প্রয়োজন হয়, তবে সেই বিকল্পের কথা ভাবতে হবে। কিন্তু, রাজনীতির স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে শহরবাসীকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা চলতে পারে না কোনও মতেই। রাজ্যের অর্থব্যবস্থার ক্ষেত্রে মেট্রো রেলের মতো পরিকাঠামোর গুরুত্ব যদি কোনও রাজ্য সরকার না বোঝে, অথবা এই জ্বালানি-সঙ্কটের মধ্যে দাঁড়িয়েও যদি বিদ্যুৎ-চালিত আরামদায়ক গণপরিবহণের গুরুত্ব স্বীকার না-করতে চায়, তবে সেই সরকারের বিচক্ষণতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। সে প্রশ্নটি রাজ্যের পক্ষেও সুসংবাদ নয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Kolkata Metro Kolkata metro services Chingrighata Supreme Court of India Calcutta High Court

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy