Advertisement
E-Paper

বামপন্থার নামে লোক ঠকানো শেষ

আশা করা যায় এই সংশোধনবাদী নেতাদের মানুষ এ বার চরম শাস্তি দেবেন। যত আগে তা হয় ততই জনগণের মঙ্গল, বামপন্থার সুসময়। লিখছেন প্রীতিময় চক্রবর্তীলোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরে পুরনো এক বন্ধু এস এম এস করেছিল, ‘সিপিএম দেখতে রায়গঞ্জ আর মুর্শিদাবাদ আসুন, দু’রাত তিন দিন, মাথাপিছু ৫২৫ টাকা মাত্র।’ বুঝলাম, সরকারি বামেদের এই দুর্দশায় সে কষ্ট পেয়েছে, পুলকিত হয়েছে বেশি, তাই এই রসিকতা। আমি বামপন্থী, এ কথা স্বীকার করতে কোনও কুণ্ঠা নেই, এবং এক নিশ্বাসে এটাও বলা দরকার যে, আমি নির্বাচনের এই বিপর্যয় দেখে এতটুকুও বিচলিত নই, বরং একটা সুখ প্রাপ্তির উল্লাস আমায় নাড়া দিচ্ছে।

শেষ আপডেট: ১৫ জুন ২০১৪ ০০:১৫

লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরে পুরনো এক বন্ধু এস এম এস করেছিল, ‘সিপিএম দেখতে রায়গঞ্জ আর মুর্শিদাবাদ আসুন, দু’রাত তিন দিন, মাথাপিছু ৫২৫ টাকা মাত্র।’ বুঝলাম, সরকারি বামেদের এই দুর্দশায় সে কষ্ট পেয়েছে, পুলকিত হয়েছে বেশি, তাই এই রসিকতা। আমি বামপন্থী, এ কথা স্বীকার করতে কোনও কুণ্ঠা নেই, এবং এক নিশ্বাসে এটাও বলা দরকার যে, আমি নির্বাচনের এই বিপর্যয় দেখে এতটুকুও বিচলিত নই, বরং একটা সুখ প্রাপ্তির উল্লাস আমায় নাড়া দিচ্ছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বামপন্থার পরাজয় হয় না, বরং বলা যায়, সংশোধনবাদ ধ্বংস হল।

আমাদের সরকারি বামপন্থী নেতারা সরকার থেকে উৎখাত হওয়ার পরেও এই ধ্বংসের সত্যটা বোঝেননি। লোকসভা নির্বাচনের আগেও ভাবছিলেন, মিডিয়ার কাঁধে বন্দুক রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কুপোকাত করবেন। নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে, এক বিখ্যাত বাম নেতাকে দেখলাম টিভিতে মমতার আত্মীয়স্বজনের কত সম্পত্তি আছে তার হিসেব দিচ্ছেন। এখন যে সেই সব দলিল দস্তাবেজ তিনি কোন মহাফেজখানায় তুলে রেখেছেন, কে জানে! ওঁরা এটুকুও জানেন না যে, বাম শাসনের শেষ দশ বছরের কুশাসন পশ্চিমবঙ্গের যে-কোনও সচেতন মানুষের পক্ষে মৃত্যুর পরেও ভোলা কষ্টকর। আর তাই, ওঁরা যখন প্রতিপক্ষকে চোর সাজান, তখন পশ্চিমবঙ্গবাসী ভাবেন, ‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ...’ বাস্তবে এই জাতীয় কুৎসা দিদিমণির ভোটব্যাঙ্ককেই সমৃদ্ধ করল, আর সেই বামপন্থী নেতারা বহুচর্চিত ‘দলের মধ্যে পর্যালোচনা’র আশ্রয় নিলেন, চাকরি খোয়ানোর ভয়ে।

এখন ওঁরা ভয় পাচ্ছেন, সাধারণ মানুষ বলে উঠবেন, ‘সদর দফতরে কামান দাগো’। অতএব তড়িঘড়ি দিল্লি থেকে ফতোয়া প্রকাশ হল: পশ্চিমবঙ্গে নেতাদের পদত্যাগ নিষ্প্রয়োজন। দিল্লির বা কেরলের নেতাদেরও চালিয়ে যাওয়ার রাস্তা পরিষ্কার থাকল। জনগণের স্বাভাবিক অভিব্যক্তির গোড়ায় জল ঢেলে দেওয়ার সেই পুরনো কৌশল। বামপন্থার নামে লোক ঠকানোর প্রক্রিয়া চলছে চলবে।

Advertisement

এ প্রক্রিয়ার শুরু প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে, বলা চলে ১৯৬৭ সালে। এ দেশে বামপন্থীদের সংশোধনবাদের লজ্জাহীন আত্মপ্রকাশ ঘটে নকশালবাড়িতে জমি আন্দোলনের সংগ্রামী কৃষক হত্যা দিয়ে। শুধুমাত্র সরকারে টিকে থাকার আকাঙ্ক্ষায় সেই হত্যাকাণ্ড। এবং সেই থেকেই ওঁরা নিয়ন্ত্রণ করে গেলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিক প্রেক্ষাপট, এক সুদীর্ঘ সময় ধরে। আর সেই অবকাশে মানুষের মনে ক্রমে ক্রমে বামপন্থা সম্পর্কে তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি হল। মানুষ দেখলেন, বামপন্থী মানে শহরে ও গ্রামে দাপিয়ে বেড়ানো গুন্ডার দল। মানুষ জানলেন, যাঁরা একের পর এক নির্বাচনের প্রাক্কালে নেতাদের সঙ্গে একই মিছিলে হাঁটেন, ভোট চান, তাঁরাই হলেন আগমার্কা সরকারি বামপন্থী। এই ছবিটাই মানুষের মনে গেঁথে গেল। আর বামপন্থী নেতৃত্ব বলতে মানুষ দেখলেন জনাকয়েক ব্যর্থ, পক্বকেশ, উন্নাসিক মানুষকে। পরিকল্পনা করে রটিয়ে দেওয়া হল, আর কেউ নেই তো, কী করা? অথচ ভোটের সময় দেখা গেল অন্তত হাফ ডজন সপ্রতিভ পুরুষ-মহিলা বুক চিতিয়ে লড়াই করে গেলেন বীরের মতো, বামপন্থার পক্ষে। এঁরা শুধু লড়াই করবেন, নেতা হবেন না, কারণ এঁদের চুল ধবধবে হয়নি। বামপন্থা কুক্ষিগত থাকবে শুধু তাঁদের মধ্যে, যাঁরা অবলীলায় বামপন্থার নামে শোধনবাদের সেবা করে যেতে পারবেন। যে দলগুলো শুধুমাত্র সরকারে টিকে থাকার নিষ্ঠুর লোভে বছরের পর বছর মানুষকে বিভ্রান্ত করে এসেছে, বিপ্লবী দেখলেই হত্যা করেছে, বামপন্থার নামে যত রকম বেসাতি সম্ভব, তা দ্বিধাহীন ভাবে চালিয়ে গেছে, তারা এ বার উপযুক্ত শাস্তি পেয়েছে। যে নেতারা সাধু সাজতে গিয়ে নেতাইয়ের দোষ কবুল করে, নেতাইয়ের অসহায় পড়ে-থাকা কর্মীদের ব্যাপক ধোলাই খাওয়ার রাস্তা মসৃণ করেন, তাঁদের বাম মনোভাবাপন্ন মানুষ বিশ্বাসহন্তা ছাড়া আর কিছুই ভাবেন না। সত্যটা হল, মানুষ আর মেকি বামপন্থী নেতৃত্বকে বিশ্বাস করছে না। মানুষ যখন প্রত্যাখ্যান করে, তখন আর বিশ্বাস করে না।

এঁদের দুর্বলতাকে ধরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পৌঁছে গেছেন সাধারণ মানুষের কাছে। রবীন্দ্রসংগীত গায়ক থেকে শুরু করে অটোর চালক পর্যন্ত সবাই দলে দলে হাজির হয়েছেন দিদির দরবারে। দিদি তাঁদের গ্রহণ করেছেন, লালন করেছেন, ব্যবহার করেছেন, ঠিক বা ভুল যে কোনও ভাবেই হোক এঁদের ব্যাপক ভাবে নানা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছেন এবং ভোটে জিতেছেন। তাঁর বাম লাইন, আন্তরিক হোক বা না হোক, মানুষের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। দিদি শুধু যে ওঁদের ভোট কেড়েছেন তা-ই নয়, ওঁদের পদ্ধতিও কেড়েছেন। পার্ক স্ট্রিট, ত্রিফলা, টেট, সারদা— কোনও টোটকাই আর কাজে লাগেনি।

বামপন্থীদের থেকে মানুষ আরও বেশি কিছু আশা করেন, মিডিয়ার চর্বিতচর্বণ বামপন্থীদের একমাত্র সহায় হলে মানুষ সেই বামপন্থার উপর আস্থা হারান। জনগণের সংগ্রাম ছাড়া বামপন্থার আর কোনও বিকল্প হয় না। আশা করা যায় এই সংশোধনবাদী নেতাদের মানুষ এ বার চরম শাস্তি দেবেন। যত আগে তা হয় ততই জনগণের মঙ্গল, বামপন্থার সুসময়। ধ্বংসের মধ্যে দিয়েই সৃষ্টি হবে নতুন বামপন্থা, ঠিক বামপন্থা। সেই সুদিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সুদিন আসছে।

pritimoy chakraborty
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy