ক্ষুদ্রস্বার্থের কুমন্ত্রণা অস্বীকার করা কঠিন। ভারতীয় রাজনীতিকরা সচরাচর সেই কাজটি করিতে পারেন না। সুতরাং নরেন্দ্র মোদী প্রশংসার্হ। তিনি আপন দলের একটি অংশের ক্ষুদ্রস্বার্থপ্রসূত সওয়াল নাকচ করিয়া বাংলাদেশের সহিত স্থলসীমান্ত চুক্তিতে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের সহিত অসমকেও শরিক করিয়াছেন এবং তাহার ফলে এই চুক্তির পক্ষে সংসদে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সমর্থন আদায় করিয়া চুক্তি রূপায়ণের পথ পরিষ্কার করিয়াছেন। বাংলাদেশের জন্মের তিন বছর পরে ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা গাঁধী ও শেখ মুজিবর রহমানের মধ্যে সম্পন্ন বোঝাপড়ার দিশা অনুসরণ করিয়া দুই দেশের মোট দেড়শোর বেশি ছিটমহল বিনিময়ের এই চুক্তি চার বছর আগে দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের আমলে সম্পন্ন হয়। অতঃপর দুই দেশের সংসদে তাহার অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশের আইনসভা ইতিমধ্যেই চুক্তি অনুমোদন করিয়াছে। নূতন এনডিএ সরকার ভারতের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করিতে প্রবৃত্ত হয়।
কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি করে অসমের রাজ্য বিজেপি। লোকসভা নির্বাচনে দল সে রাজ্যে লক্ষণীয় সাফল্য পাইয়াছে, স্বভাবতই আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তাহার আশা অনেক। বাংলাদেশের সহিত ছিটমহল বিনিময়ে অসমের ক্ষতি হইবে— এই ধারণা অসমের নাগরিকদের মোদী তথা বিজেপি’র প্রতি বিরূপ করিয়া তুলিতে পারে, এমন আশঙ্কার বশে দলের রাজ্য নেতারা চাপ দিয়াছিলেন, অসমকে যাহাতে এই চুক্তির বাহিরে রাখা হয়। কিছু টালবাহানার পরে প্রধানমন্ত্রী সেই চাপ অস্বীকার করিয়াছেন। তাহার ফলে চুক্তির পক্ষে রাজ্যসভার অনুমোদন মিলিয়াছে, সুতরাং অনুমোদন নিশ্চিত হইয়াছে। অসমের মুখ্যমন্ত্রী তথা শাসক কংগ্রেস রাজ্যকে চুক্তির অন্তর্ভুক্ত রাখিবার পক্ষপাতী। এই বাস্তবটিই নরেন্দ্র মোদীকে আপন অবস্থান নির্ধারণে সাহায্য করিয়াছে। অর্থাৎ এই প্রশ্নে তিনি কংগ্রেসের পক্ষে এবং আপন দলের (রাজ্য শাখার) বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছেন।
এই অবস্থান কেবল ক্ষুদ্রস্বার্থ অতিক্রম করিবার পরিচয় দেয় না, একই সঙ্গে বৃহত্তর স্বার্থের গুরুত্ব অনুধাবনের বুদ্ধিও প্রমাণ করে। বুদ্ধিমান ব্যক্তি জানেন, বৃহত্তর স্বার্থও স্বার্থ। নিজের তাগিদেই সেই স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশের সহিত চুক্তির ফলে অসমে বিজেপির ভোট সত্যই কতটুকু কমিবে, তাহা আদৌ স্পষ্ট নহে, কিন্তু যদি কমেও, তাহা সামান্য ক্ষতি। এই চুক্তি সম্পাদনের ফলে কেবল ছিটমহলের বাসিন্দাদের জীবনযন্ত্রণা লাঘব হইবে না, দীর্ঘদিনের বকেয়া একটি সমস্যা সমাধানের পথ পরিষ্কার হইবে, বাংলাদেশের সহিত সম্পর্কে উন্নতির পথও। একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এই অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ তাঁহার দলের ভাবমূর্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতার পক্ষেও। দলের প্রাদেশিক নেতারা তাহা না বুঝিতে পারেন, কিন্তু জাতীয় নেতৃত্বকে বুঝিতে হয়। মনে রাখিতে হয়, দলীয় নেতা আর রাষ্ট্রনেতা এক নহে। ভারতীয় রাজনীতিকরা প্রায়শই এই তফাতটি মনে রাখেন না। সুখের কথা, সংসদে সওয়াল করিতে গিয়া কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রী সুষমা স্বরাজও দলের ঊর্ধ্বে উঠিয়া ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে এই চুক্তির রূপকার হিসাবে অকুণ্ঠ স্বীকৃতি দিয়াছেন। দিল্লির দরবারে নিরন্তর ক্ষুদ্রতার উৎকট প্রদর্শনীর মধ্যে এমন একটি বৃহত্ত্বের দৃশ্য তৈয়ারি হইয়া থাকিল, ইহা শ্লাঘার বিষয়। এই দৃশ্য ব্যতিক্রমী নজির হইয়া না থাকিলেই ভাল।