ল ন্ডনের বিমানে উঠিবার আগে মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়া গিয়াছেন, পশ্চিমবঙ্গে তেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হইলে তিনি সফর সংক্ষেপ করিয়া ফিরিয়া আসিবেন। এই ভরসা-বাণীর পিছনে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পত্রাঘাতের অবদান কতখানি, তাহা মুখ্যমন্ত্রীই জানেন। তবে অধীর চৌধুরী যদি এ কথা মনে করিয়া আহ্লাদিত বোধ করেন যে তিনি বঙ্গেশ্বরীকে লন্ডন যাইবার আগে সম্ভাব্য দুর্যোগের মোকাবিলার বন্দোবস্ত করিতে বঙ্কিম আবেদনটি জানাইয়াছিলেন বলিয়াই শ্রীমুখে এই আশ্বাস ঘোষিত হইয়াছে, তাঁহাকে দোষ দেওয়া চলে না। অধীরবাবুর দলটির এখন যে হাল হইয়াছে এবং দলের ভিতরে তাঁহার যে দশা দাঁড়াইয়াছে, তাহাতে এই সব খুচরো আহ্লাদই তাঁহাকে খুঁজিয়া লইতে হইবে। কিন্তু কারণ যাহাই হউক, মুখ্যমন্ত্রীর উচ্চারণটি শুনিয়া মনে হয়, তাঁহার সতত আত্মবিশ্বাসী বীরাঙ্গনা প্রতিমাটির অভ্যন্তরে কি অন্য একটি মানসিকতা নিহিত? সংশয়ের দোলায় দোদুল্যমান এক মানসিকতা? তিনি হয়তো বলিবেন, দুর্যোগের ছায়ায় কবলিত আপন রাজ্যের জন্য তাঁহার শান্তি হইবে না। এই আবেগ মর্মস্পর্শী, কিন্তু ইহাই কি একমাত্র আবেগ? না কি, তাঁহার মনটি কেবলই ভাবে, ‘আমি না থাকিলে যদি অস্বাভাবিক কিছু ঘটিয়া যায়, কী হইবে তবে?’
গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে শ্রাবণ মাসে অতিবর্ষণ হইতে পারে, ইহা অপেক্ষা ‘স্বাভাবিক আশঙ্কা’ দ্বিতীয়টি খুঁজিয়া পাওয়া কঠিন। অতিবর্ষণে বহু এলাকা জলমগ্ন হইবে, ইহাকেও ঠিক অস্বাভাবিক বলা কঠিন। দুর্যোগের মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকা অবশ্যই সরকার তথা পুরসভার একটি নিতান্ত আবশ্যিক কর্তব্য। সেই কর্তব্য সম্পাদনের জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে লন্ডন হইতে দৌড়াইয়া আসিতে হইবে কেন? তাহার কথাই বা উঠিবে কেন? মুখ্যমন্ত্রী একটি হৃষ্টপুষ্ট দলবল সঙ্গে করিয়া বিলাত গিয়াছেন, সেখানে কয়খানি মউ স্বাক্ষর হইবে, কতগুলি রথ দেখিবেন, কয় কাঁদি কলা কিনিবেন, সে সব বৃত্তান্ত অন্যত্র, কিন্তু এমন একটি সফর শুরুর লগ্নেও তাঁহার এমন বিপত্তারিণী মূর্তি প্রদর্শনের বাসনা কেন? ইহার পিছনে হয়তো বা ভয় কাজ করিতেছে। একটি নহে, অন্তত দুইটি ভয়। প্রথম ভয়, তাঁহার প্রশাসন দুর্যোগ সামাল দিতে পারিবে না। দ্বিতীয় ভয়, বিপদের সময় তিনি নিজে হাজির না থাকিলে তাঁহার অপরিহার্যতায় টোল পড়িবে, সবাই বুঝিয়া ফেলিবে যে তিনি না থাকিলেও চলে। এই দুই ভয় স্বতন্ত্র, কিন্তু বিচ্ছিন্ন নহে। সচরাচর যাঁহারা অন্যের উপর ভরসা রাখিতে পারেন না, তাঁহারাই সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকেন: ‘এই বুঝি আমার গুরুত্ব কমিয়া গেল!’
রোগটি প্রশাসনের পক্ষে ক্ষতিকর। প্রকৃষ্ট শাসনের প্রথম শর্ত, তাহা ব্যক্তিনির্ভর হইবে না, নিয়মনির্ভর হইবে। যে নেতা তেমন একটি ব্যবস্থা তৈয়ারি করিতে এবং প্রতিনিয়ত তাহাকে স্বাস্থ্যবান ও সচল রাখিতে পারিবেন, তাঁহার নেতৃত্ব সার্থক। সেই নেতাকে সর্বক্ষণ সমস্ত বিষয়ে হাঁকডাক করিতে হয় না, সর্বত্র আপন ছবি টাঙাইতে হয় না, জলসার মঞ্চে দাঁড়াইয়া সভা-সঞ্চালকের কাজ করিতে হয় না, আগুন লাগিলে দমকল বাহিনীর সেনাপতিত্ব করিতে হয় না, কলিকাতায় বন্যা হইলে কাজ ফেলিয়া হিথরোয় ছুটিতে হয় না। তবে এই রোগটি ভারতবাসীর সুপরিচিত। দেশের মুখ উজ্জ্বল এবং দেশবাসীর স্বাস্থ্য উদ্ধার করিবার জন্য প্রধানমন্ত্রী নিজেই রাজধানীর রাজপথে যোগাভ্যাস করিতে বসিয়া পড়িতেছেন, নেতৃত্বের এমন নমুনা বাস্তবিক চমকপ্রদ। আমি-সর্বস্বতায় কেন্দ্রে রাজ্যে বিবাদ নাস্তি।