E-Paper

শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডেই হার, বিপাকে নন্দ

নবদ্বীপের ব্লক তৃণমূল সভাপতি কল্লোল করের মতে, স্পষ্টতই মেরুকরণের ভোট হয়েছে। এসআইআর নিয়ে তৃণমূলের বক্তব্যও মানুষ গ্রহণ করেনি।

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় 

শেষ আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ ০৯:১৩
পুণ্ডরীকাক্ষ সাহা।

পুণ্ডরীকাক্ষ সাহা। নিজস্ব চিত্র ।

শুরু থেকেই নবদ্বীপ শহরের তুলনায় গ্রামের উপর তাঁর নির্ভরতা তুলনায় বেশি ছিল। বিশেষ করে রাজ্যে বিজেপির উত্থানের পর গ্রামের ভোটই তাঁকে বার বার ভোট বৈতরণী পার করিয়েছে। নবদ্বীপের পাঁচ বারের তৃণমূল বিধায়ক পুণ্ডরীকাক্ষ ওরফে নন্দ সাহার ভরসার সেই গ্রামাঞ্চলেও ভোটের বড় অংশ গিয়েছে পদ্মে।

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে তৃণমূল ১৮,৫৭১ ভোটে জিতলেও শহরের ২৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১২টিতে বিজেপির কাছে পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। শহরে সেবার নন্দ সাহার ‘লিড’ ছিল মাত্র ২,৭৬৫ ভোটের। নবদ্বীপ ব্লকের ১০টি পঞ্চায়েতের মধ্যে সাতটিতে জিতে মুখরক্ষা হয়েছিল তৃণমূলের। এ বারে ছ’টি পঞ্চায়েতে এগিয়ে গিয়েছে বিজেপি। তৃণমূল সংখ্যালঘু প্রধান চারটি পঞ্চায়েতে এগিয়ে থাকলেও তার মধ্যে একটিতে মাত্র ১৯৫ ভোটের ‘লিড’ পেয়েছে।

অন্য দিকে, আরও বেশি করে তৃণমূলের থেকে মুখ ফিরিয়েছে শহর। ২৪টি ওয়ার্ডের একটিতেও তারা জিততে পারেনি। পুর এলাকার ১১৮টি বুথের মধ্যে মাত্র দু’টিতে ‘লিড’ পেয়েছে তারা— ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ৮৬ নম্বর বুথে ৫৭ ভোটে এবং ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ৯১ নম্বর বুথে ৭৬ ভোটে। ১০ নম্বর ওয়ার্ডে সবচেয়ে কম, ২৬ ভোটে পিছিয়ে তৃণমূল। অন্য দিকে, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ ১,৫৩৮ ভোটে পিছিয়ে থেকেছে তারা। যদিও গত পুরভোটে নবদ্বীপে বিরোধীশূন্য বোর্ড গড়েছিল তৃণমূল!

নবদ্বীপের ব্লক তৃণমূল সভাপতি কল্লোল করের মতে, স্পষ্টতই মেরুকরণের ভোট হয়েছে। এসআইআর নিয়ে তৃণমূলের বক্তব্যও মানুষ গ্রহণ করেনি। তাঁর দাবি, “আরএসএস দীর্ঘদিন ধরে মেরুকরণের যে বীজ গ্রামের মানুষের মনে বপন করেছে, তাকে রোখা যায়নি। তৃণমূলের মহিলা ভোটারদের একাংশ বিজেপির মাসে তিন হাজার টাকা দেওয়ার কথায় প্রভাবিত হয়েছেন। নবীন প্রজন্মের ভোটও কম পেয়েছি আমরা।”

যদিও গ্রামীণ নবদ্বীপ ভাসছে আরও কিছু কথা। এ বার ব্লক থেকে তৃণমূলের প্রার্থিপদের একাধিক দাবিদার ছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, প্রতি বার ব্লকের ভোটেই যখন বৈতরণী পার হতে হয় তখন প্রার্থী কেন ব্লক থেকে হবে না? অসুস্থতা সত্ত্বেও নন্দকে দল প্রার্থী করায় অনেকের চোরাগোপ্তা অসন্তোষ ছিল। তা ছাড়া কিছু নেতার বেপরোয়া জীবনযাপন, দুর্নীতির পাশাপাশি তোষণের রাজনীতি ক্রমশ এককাট্টা হয়েছে গ্রামীণ নবদ্বীপের ভোট। নবীন প্রজন্মের ভোট গ্রাম-শহর কোথাও পায়নি তৃণমূল। কর্মসংস্থানের পরিবর্তে ভাতা পছন্দ করেননি তাঁরা।

সবচেয়ে বড় কথা, নবদ্বীপ শহরের মানুষ তৃণমূলকে নিয়ে যতটা বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন তার বিস্ফোরণ ঘটেছে। তৃণমূল নেতাদের একাংশই বলছেন, অসুস্থতার কারণে নন্দ বেশ কয়েক বছর ধরে দল পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারছিলেন না। যাঁদের হাতে দলের রাশ ছিল, তাঁদের প্রশ্রয়ে শহর জুড়ে হু-হু করে বেড়েছে প্রোমোটারি, জলা-জমি-বাড়ি দখলের অবৈধ কারবার, মাটি এবং বালি মাফিয়াদের রমরমা। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বদলে সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছিল এক দল ঠিকাদার। এ বারের ভোটে তারইপ্রতিফলন ঘটেছে।

যদিও নবদ্বীপ শহর তৃণমূলের সভাপতি সুজিত সাহা বলেন, “ফলাফলের এই প্রবণতা গোটা রাজ্যেরই। নবদ্বীপ তার থেকে বিছিন্ন নয়। স্থানীয় স্তরে যদি কিছু থাকে সেটা আমরা পর্যালোচনা করছি।”

ভোট গণনার আগে তাঁকে নিয়ে সমাজমাধ্যমে ‘মরা হাতি লাখ টাকা’ মন্তব্য শুনে খোশমেজাজে নন্দ বলেছিলেন, হাতি তো এখনও মরেওনি! ফল বেরনোর পরে আর তাঁর সঙ্গে আর কথা বলা যায়নি। তবে সদ্য়জয়ী বিজেপির নেতারা ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবেই বলছেন, “সময় থাকতে ওঁকে হয়তো মনে করিয়ে দেওয়া উচিত ছিল আর একটি প্রবাদ— হাতি যখন কাদায় পড়ে, ব্যাঙেও লাথি মারে!”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Nabadwip TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy