ক দিন আগে অমর্ত্য সেন শান্তিনিকেতনে প্রাথমিক শিক্ষক এবং অঙ্গনওয়াড়ি ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মীদের এক সম্মেলনে ভাষণ দিয়েছিলেন। সভাশেষে অন্তত বিশ জন সাংবাদিক তাঁকে ঘিরে ধরলেন। পর দিন দেখলাম, অর্ধেক সংবাদপত্রে অনুষ্ঠানের কোনও উল্লেখ নেই। যেখানে আছে (দু-একটিতে ফলাও করেই আছে), পাঠক পড়ে ভাববেন ভাষণের মূল বিষয় ছিল বামফ্রন্ট আমলে এ রাজ্যে শিল্পের আকাল ও তার ফলে কলকাতা বিমানবন্দরের জনহীন দশা।
আসলে এই প্রসঙ্গ ছিল দু-এক মিনিটের ভূমিকাস্বরূপ। আধ ঘন্টার বক্তৃতায় অমর্ত্যবাবু মূলত ভারতের প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন, বিশেষত এই দুই অপরিহার্য খাতে অর্থবরাদ্দের শোচনীয় হ্রাস ও প্রকারান্তে বেসরকারি উদ্যোগের প্রবেশ নিয়ে। সার্বিক বেসরকারিকরণের যে প্রবল হাওয়া দেশে বইছে, তাঁর কাছে এর যুক্তি দুর্বোধ্য। ইতিহাসে যে দেশ যখনই মৌলিক স্তরে সর্বজনীন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালু করেছে, তা করেছে সরকারি উদ্যোগে ও অর্থবলে। ভারত যদি উলটো পথে ওই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে, তা হবে ‘তাজ্জব ব্যাপার’। আর না পারলে ভারত হবে পৃথিবীর প্রথম দেশ যেখানে উচ্চহারে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ঘটবে জনসংখ্যার একটা বড় অংশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যগত বিপুল বঞ্চনার পাশাপাশি। বক্তার মতে তেমনটা হওয়া অসম্ভব, উপযুক্ত মানবসম্পদের অভাবে বৃদ্ধির হার ব্যাহত হতে বাধ্য।
অমর্ত্যবাবুর এমন মতামত বহুবিদিত। তবু এই মুহূর্তে, ভারতের বর্তমান সরকারের নীতির প্রেক্ষিতে সেই চিন্তার এমন তীক্ষ্ণ দ্ব্যর্থহীন প্রকাশ আমাদের জানা জরুরি ছিল। তার বদলে আমরা পেলাম বিত্তশালী পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিলিয়ে বিভ্রান্তিকর বিবৃতি। এটা সমাজের উচ্চবর্গীয় প্রভাবশালী অংশের মনোভাগ ও চাহিদার প্রতিফলন।
এর পর যা লিখছি তা আমার নিবেদন, অমর্ত্যবাবুর নয়, তবে তাঁর চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। ক’টা পরিসংখ্যান দেখা যাক। এনডিএ সরকার আসার পর এক বছরে সংহত শিশু বিকাশ বা চলতি নামে অঙ্গনওয়াড়ি প্রকল্পের বরাদ্দ টাকার অঙ্কে ১৬,৬৬৭ কোটি থেকে কমে হয়েছে ৮,৭৫৪ কোটি অর্থাৎ প্রায় ৪৭ শতাংশ হ্রাস; মিডডে মিল প্রকল্পে ১৩,২১৫ কোটি থেকে ৯,২৩৬ কোটি অর্থাৎ ৩০ শতাংশ হ্রাস; সর্বশিক্ষা অভিযানে ২৪,৩৮০ কোটি থেকে ২২,০০০ কোটি অর্থাৎ প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস (২০১২-১৩’র তুলনায় ২২ শতাংশ হ্রাস)। মূল্যস্ফীতি হিসাবে ধরলে প্রকৃত হ্রাসের মাত্রা অবশ্যই আরও বেশি। মাথাপিছু একটি বাচ্চা পায় দিনে ৬ টাকার খাবার, অপুষ্টির বিশেষ শিকার হলে ৯ টাকার, প্রসূতিরা ৭ টাকার। তাতে সবজির বরাদ্দ দাঁড়ায় দিনে কমবেশি ২০ পয়সা। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা কবুল করেন, প্রসূতিদের প্রাপ্য আস্ত ডিমের আধখানা ভেঙে শিশুদের দিতে হয়। মধ্যপ্রদেশ সরকার অবশ্য কচিকাঁচাদের আত্মিক উন্নতির খাতিরে ডিম নিষিদ্ধ করে বালাই চুকিয়েছে।
আর একটি ছোট্ট বিষয় প্রণিধানযোগ্য। কেন্দ্রীয় সরকার এ মাস থেকে উচ্চবিত্তদের রান্নার গ্যাসের ভর্তুকি বন্ধ করে দিয়েছে। তা বেশ করেছে, বহু মানুষ তো আগেই স্বেচ্ছায় তা পরিহার করেছিলেন। মনে আছে হোর্ডিংয়ে গরিবের ঘরে উনুন জ্বালাবার আহ্বান, টিভির পর্দায় সচ্ছল শহরবাসীর মুখে কাঠকুড়ানি মায়ের চোখ-ছলছল স্মৃতি? দরিদ্রতম ভারতসন্তানদের এক বেলা খিচুড়ি রান্নার গ্যাসের ভর্তুকি কিন্তু অনেক দিন বন্ধ। নতুন ব্যবস্থায় উপকৃত শ্রেণি তবে কারা? ব্যয়বহুল প্রচারের বরাত-পাওয়া বিজ্ঞাপন সংস্থা?
বৃহৎ পুঁজি-তাড়িত প্রশাসনের কাছে নৈতিকতার দাবি তোলা মূর্খতা, তবু বহু লক্ষ গরিব শিশুর স্বার্থ জড়িত থাকলে হয়ত অসঙ্গত নয়। সুতরাং বলতেই হয় আরও মস্ত দুটি প্রশাসনিক তঞ্চকতার কথা। একটি হল, কেন্দ্রের আপাত বদান্যতার আড়ালে রাজ্যের উপর অবাস্তব দায়িত্বের বোঝা চাপানো। কেন্দ্রের প্রাপ্ত কর থেকে রাজ্যের ভাগ ৩২ থেকে ৪২ শতাংশে বাড়ানো হয়েছে, অর্থাৎ রাজ্যের প্রাপ্তি বেড়েছে ৩১ শতাংশ। সত্যিই কত বেড়েছে তা নিয়ে বিতর্ক আছে, সে প্রশ্ন থাক। আরও মনে রাখবেন, শিক্ষা বাবদ ‘সেস’ রাজ্যের সঙ্গে ভাগ হয় না, এবং জিএসটি চালু হলে রাজ্যের নিজস্ব কর আদায়ের সীমিত সুযোগ আরও সীমিত হবে। (পশ্চিমবঙ্গ অবশ্য সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সবচেয়ে কম।) পরিবর্তে রাজ্যের উপর দায় চাপানো হচ্ছে অনেক বেশি হারে: সরাসরি কেন্দ্রীয় বরাদ্দ কমিয়ে, প্রত্যেক প্রকল্পে রাজ্যের দেয় অর্থের অনুপাত বাড়িয়ে, আর অবশ্যই মূল্যস্ফীতির তোয়াক্কা না করে। অর্থাৎ আগে যদি রাজ্য ১০০ টাকার দায় মেটাতে কেন্দ্র থেকে ৫০ টাকা পেত, এখন হয়তো ২০০ টাকার জন্য ৬৫ টাকা পাবে, অতএব ঘাটতি বাড়বে কিংবা পরিষেবা কমবে। হিসাবটা সরলীকৃত, কিন্তু অবস্থা মোটামুটি এই। সবার উপর আছে নতুন উপদ্রব, মঞ্জুর-করা অর্থ যথাসময় বা আদৌ হাতে না আসা। কেন্দ্রে-রাজ্যে নিরন্তর তরজা চলে: টাকাটা অতিবিলম্বে অর্থবর্ষের শেষ সপ্তাহে এসেছে কি না, খরচের হিসাব যথাসময় দাখিল হয়েছে কি না, ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজ্য ‘ম্যাচিং’ বরাদ্দের সংস্থান না করায় কেন্দ্রের টাকা ফেরত যায়, উপরোক্ত বৈষম্যের ফলে এমন ঘটনা বাড়তেই থাকবে।
অন্য তঞ্চকতার মানবিক দিক বড় প্রকট। গরিব শিশু আর মায়েদের দেখভালের সার্বিক দায়িত্ব যে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের, কেন্দ্র তাঁদের বেতন জোগায় মাসে কমবেশি ৩,০০০, সহায়কদের ১,৫০০ টাকা। রাজ্য সরকার তা অল্পবিস্তর বাড়াতে পারে, পশ্চিমবঙ্গ যেমন উভয় ক্ষেত্রেই দেয় আরও ১,৩৫০ টাকা। ‘আশা’ স্বাস্থ্যকর্মীরা কেন্দ্র থেকে নিশ্চিত ভাবে এক পয়সাও পান না, পান কেস প্রতি সামান্য পারিশ্রমিক। এ ক্ষেত্রেও অনেক রাজ্য এক-আধটু ভাতার ব্যবস্থা করে, এ রাজ্যে যেমন ১,৫০০ টাকা। এই রাজসিক ব্যবস্থার পিছনে আসল গল্প: এ-সব কর্মী খাতাকলমে কর্মীই নন, স্বেচ্ছাসেবক, তাঁদের নিঃস্বার্থ শ্রমদানের স্বীকৃতি হিসাবে সরকার কিঞ্চিৎ সাম্মানিক দিচ্ছে কেবল। আরও গল্প, এঁদের কাজের সময় দিনে চার ঘন্টা মাত্র। (‘আশাদিদি’দের যদিও কোনও মহিলার প্রসববেদনা উঠলে দিনে-রাতে যে কোনও সময়ে তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটার কথা।)
এমন উর্বর কল্পনাকে বিধির মান্যতা দিয়ে যে বিচক্ষণ প্রশাসকেরা সহস্রকোটি টাকার খরচ বাঁচিয়ে দিচ্ছেন, কৃতজ্ঞ সরকার তাঁদের বেতন লাফে-লাফে বাড়িয়ে চলবে, আশ্চর্য কী? আর আশ্চর্য কী, যদি এই মৌলিক পরিষেবাগুলিতে অবশ্যম্ভাবী ঘাটতি থেকে যায়, দুর্নীতি বাসা বাঁধে? কিছু রাজ্যে অঙ্গনওয়াড়ির সামান্য চাকরি নিলাম হয় (পশ্চিমবঙ্গে এখনও শুনিনি), এর চেয়ে চিন্তার কথা কী হতে পারে? পরমাশ্চর্য এই, দেশ জুড়ে পরিষেবাগুলি মোটের উপর চালু আছে, শিশুরা ক্ষমাঘেন্নার খিচুড়ি পায়, রোগের প্রতিষেধক পায়, প্রসূতিরা পান আগের চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশি যত্ন। কিছু অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীকে চিনি যাঁরা নগণ্য ও বিলম্বিত ‘সাম্মানিক’ থেকে ধারে খাদ্য কিনে পুষ্টিপ্রকল্প চালু রাখেন, উৎসবে পকেট থেকে বাচ্চাদের মিষ্টি খাওয়ান। এ সব কথা লেখা বিপদ, প্রশাসন অসাম্য ও অবহেলা আরও কায়েম করতে উৎসাহ পায়— টাকা না দিয়েও যদি দিব্যি চলে যায়, মিছিমিছি বরাদ্দ বাড়াবার দরকার কী? শুনলাম এক অঙ্গনওয়াড়ি অধিকর্তা কর্মীদের বলেছেন, ‘আরও মাইনে চাইছেন যে বড়, আপনাদের বাড়িতে যাঁরা বাসন মাজেন তাঁদের ক-টাকা মাইনে বাড়ে?’ অকাট্য যুক্তি, বঞ্চনার সাফাই ততোধিক (বা তজ্জনিত) বঞ্চনার নজির দিয়ে।
রাজ্য সরকারের কি কিছুই দায়িত্ব নেই? অবশ্যই আছে, নইলে রাজ্যে রাজ্যে অঙ্গনওয়াড়ি, প্রাথমিক স্কুল, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় চোখে-পড়ার মতো তফাত হয় কী করে? ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে আমাদের রাজ্যে অঙ্গনওয়াড়ির পুষ্টিপ্রকল্পে ঘাটতি ছিল ৭৪ শতাংশ, অন্য সব রাজ্যের চেয়ে অনেক বেশি। সর্বশিক্ষা অভিযানের ভবন নির্মাণে কয়েক বছরের ঘাটতির কথা সম্প্রতি জানা গেল। (রাজ্যের পাল্টা দাবি, টাকার বৃহত্তম অংশ অনেক চেয়েও পাওয়া যায়নি।) অনুগত বাহিনী পোষণে খয়রাতির টাকা শিশুকল্যাণে খরচ করা যেত কি না, সে প্রশ্ন নিশ্চয় ওঠে, যেমন ওঠে দুর্নীতি ও অবহেলার প্রসঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গ ও অন্য রাজ্যে শিক্ষকদের বহু দিনের নালিশ, মিডডে মিলের চালের সরবরাহ আসে ওজনে কম। তথ্যপ্রমাণ পাওয়া দুষ্কর, অতএব নির্দিষ্ট অভিযোগের অবকাশ নেই, তবু নানা জেলার এত শিক্ষক যা বলছেন তা ভাবিয়ে তোলে বইকী।
সব দিক বিচার করলে প্রাথমিক শিক্ষা-স্বাস্থ্য পরিষেবায় পশ্চিমবঙ্গের স্থান মাঝের সারিতে। জঁ দ্রেজ ও ঋতিকা খেরা প্রণীত ২০১৪-র শিশুবিকাশ সারণিতে কেরলের সূচক ০.৯৫৮, অষ্টম স্থানে বাংলার ০.৭২২ (২০০৬-এ ছিল ০.৬৯৩)। গুজরাতের সূচক এই আট বছরে ০.৫৬১ থেকে নেমে হয়েছে ০.৪৮৪, নীচের দিক থেকে ষষ্ঠ। ২০১৩-১৪’য় অঙ্গনওয়াড়ির পুষ্টিপ্রকল্পে গুজরাতের ঘাটতি ছিল তৃতীয় বৃহত্তম, ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ রাজ্যের বিত্ত, শাসনদক্ষতা, ঢক্কানিনাদ কিছুই নয়, যদি জনকল্যাণের সদিচ্ছা না থাকে।
শেষ অবধি বলতেই হয়, শিশুবিকাশের ক্ষেত্রে রাজ্যের অবদানে উনিশ-বিশ বা বড়জোর পনেরো আর বিশের ফারাক হতে পারে; পাঁচ আর পঞ্চাশের ফারাক কেন্দ্রের হাতে, তার প্রভাব পড়ে গোটা দেশে। ভারত সরকার বহু কাল স্থির করেছেন এবং বর্তমান সরকার প্রবল ভাবে প্রত্যয়িত করছেন, গরিবগুর্বোদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যের আবদার যেহেতু ভোটের তাগিদে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা যায় না, না-হয় রাজ্যের হাতে দুটো বাড়তি পয়সা গুঁজে উৎপাতটা সেখানে আউটসোর্স করা যাক। বাকি চোদ্দো আনার সিংহভাগ খরচ করা যাবে সুদৃশ্য পরিকাঠামো বানিয়ে: ফল যাই হোক, তার নির্মাণেই বৃহৎ পুঁজি লাভবান হবে, সরব মহানগরবাসীদের ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাস না করার দুঃখ ঘুচবে। আগে এ ব্যাপারে একটা রাজনৈতিক চক্ষুলজ্জা ছিল, তার বালাই ইদানীং ঘুচেছে।
পরিকাঠামো বলতে আমরা বুঝি ইট-লোহা-সিমেন্টের সমারোহ। মানবসম্পদ বলে যে একটা ব্যাপার আছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের গালভরা নামের বাইরে তার স্বীকৃতি নেই। সেই সম্পদ আমাদের অফুরন্ত, চিনকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম করছি। কিন্তু তার একটা বড় অংশ উপযুক্ত শিক্ষা না পেলে, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী না হলে, না ঘটবে যথাযোগ্য আর্থিক বিকাশ, না মিলবে সামাজিক স্থিতি ও শান্তি। সাধারণ মানুষ এটা বিলক্ষণ বোঝেন, কারণ তাঁরা নিজেরা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন: ফলে সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যতের জন্য তাঁরা উদ্গ্রীব, কখনও এমনকী মরিয়া বা মারমুখী। মার্ক্স সাহেব বলে গেছেন শ্রেণিসংগ্রাম অবধারিত, কিন্তু আজকাল রাজা-প্রজা কারওই তাতে রুচি নেই। তা হয়তো স্বস্তির কথা, কিন্ত সে ক্ষেত্রে সংগ্রাম পরিহার করে যুক্তিবিচার বা নিছক স্বার্থসিদ্ধির খাতিরেই সংবদ্ধ সর্বজনীন মঙ্গলের তাগিদটা আমরা কবে স্বীকার করব?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে এমেরিটাস অধ্যাপক