ফিলিপিনসের রাষ্ট্রপতি রদরিগো দুতের্তে বলিলেন, তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকদের হেলিকপ্টারে করিয়া মধ্য-আকাশে লইয়া যাইবেন ও ধাক্কা মারিয়া ফেলিয়া দিবেন। তিনি নাকি এমন কাণ্ড পূর্বেও করিয়াছেন, তাই পুনর্বার করিতে দ্বিধা বোধ করিবেন না। পরে অবশ্য তিনি এই কথা বলিবার ঘটনাটিই অস্বীকার করিয়াছেন, কিন্তু এই প্রকারের আশ্চর্য নিষ্ঠুর বাক্য বলিবার যদি পুরস্কার থাকে, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারাইয়া তিনিই উহা লইয়া বিজয়োল্লাস শুরু করিতে পারেন। তাঁহার দেশে মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামিয়া তিনি মাদক-জোগানকারীদের প্রবল অশ্লীল গালি দিয়াছেন ও সাধারণ মানুষকে বলিয়াছেন, মাদকাসক্ত দেখিলেই হত্যা করিতে। সন্দেহ নাই, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ রাষ্ট্রপ্রধানের কর্তব্য, কিন্তু আইনের ধার না ধারিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে আদিম প্রতিহিংসা-মানসিকতার বশে হিংস্র বাহিনী লেলাইয়া দেওয়া প্রকৃষ্ট পদ্ধতি নহে। তিনি ক্ষমতায় আসীন হইবার পর হইতে প্রতি মাসে প্রায় এক সহস্র মানুষকে অপরাধী সন্দেহে পুলিশ ও অন্য অাইনরক্ষাকারীরা হত্যা করিতেছে, এমন অভিযোগ রহিয়াছে।
তাঁহার দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হইতেছে, অভিযোগ তুলিলেই দুতের্তে রাষ্ট্রপুঞ্জ ছাড়িয়া যাইবার হুমকি দেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বলেন ‘ভণ্ড’, কারণ ইউরোপ তাহার উপনিবেশের দিনগুলিতে নিজ স্বার্থে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করিয়াছে। তাঁহাদের আসন্ন সাক্ষাতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ওবামা মানবাধিকারের অপমান লইয়া প্রশ্ন করিতে পারেন, এক সাংবাদিক এমত সম্ভাবনার কথা বলায়, তিনি উত্তর দিতে গিয়া ওবামাকে এমন ইতর গালি দেন, সেই সাক্ষাতের সম্ভাবনা মূহূর্তে বিনষ্ট হইয়া যায়। গত বৎসর অগস্টে দুতের্তে টেলিভিশনে একটি তালিকা পড়িয়া দেন, তাহাতে ছিল কয়েক জন পুলিশ অফিসার, রাজনীতিক ও বিচারকের নাম— দুুতের্তের মতে, যাঁহারা ড্রাগ-ব্যবসায়ের সহিত জড়িত। ফিলিপিনসের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারক বলেন, এই ভাবে, কোনও বিচারপদ্ধতি ব্যতীত, কয়েক জনের নামে এমন কালিমা দাগিয়া দিবার প্রক্রিয়া আপত্তিকর ও অপরিণত। সঙ্গে সঙ্গে দুতের্তে বলেন, আমাকে আদেশ করিবেন না। অর্থাৎ, যুক্তির পরিবর্তে স্পর্ধিত মন্তব্য ও উদ্ধত আস্ফালন দিয়া তিনি নিজের কাজগুলির অব্যাখ্যাকে সঙ্গতি দিতে অভ্যস্ত।
কেবল দুতের্তে নহেন, ইতিহাসে বেশ কিছু জননায়ক বলিয়াছেন, অন্যায়কে শায়েস্তা করিতে গেলে প্রতি-অন্যায় এক চমৎকার উপায়, এবং তাঁহারা প্রবল জনসমর্থনও পাইয়াছেন। জনতা রবিনহুড বা রঘু ডাকাতকে বড় ভালবাসে, এবং মনে করে, পূর্বে যে অন্যায় করিয়াছে, তাহার প্রতি অন্যায় করিলে তাহা মোক্ষম ন্যায়ই হয়। চক্ষের পরিবর্তে চক্ষু উৎপাটনের প্রবণতা একটি বা দশটি ব্যক্তির থাকিতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্র ইহাকে নীতি হিসাবে গ্রহণ করিতে পারে না। কারণ, রাষ্ট্রকে ক্ষুদ্র ব্যক্তি-ধারণার ঊর্ধ্বে অবস্থান করিতেই হইবে। রাষ্ট্র যদি অন্যায় পদ্ধতি গ্রহণ করে, তাহা হইলে সে অপরাধীর তুলনায় উন্নত হইল না, কারণ সেই ক্ষেত্রে সে অপরাধীদের সমান অসভ্যতারই উপাসনা করিতেছে। বহু জার্মান নাগরিক হিটলারের ইহুদি-হত্যা সমর্থন করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহা সেই কুকর্মকে বৈধতা দেয় না। দুতের্তে নিজেকে হিটলারের সহিত তুলনা করিয়াছেন। রতনে রতন চিনিয়াছে। কিন্তু বিশ্ব জুড়িয়া এমন রত্নের সমাদর হইতে লাগিলে, বিচারের বাণী মধ্যাকাশে নিরালম্ব হইয়া কাঁদিতে থাকিবে।