একটি সুর শোনা গিয়াছে। সুরটি ক্ষীণ। তাহা বিরাট সংখ্যক মানুষের কর্ণে বিস্ফোরণ ঘটাইতে পারে নাই, রাতারাতি পারিবেও না। কিন্তু তাহা পরিবর্তনের সুর। মানসিকতার পরিবর্তন। এবং ইহার কান্ডারি সেই মানুষরা, যাঁহারা নিজেরাই দীর্ঘ দিন যাবৎ গ্রামবাংলার সংস্কৃতিতে ঝাড়ফুঁক, মন্ত্রতন্ত্রের বুজরুকিকে সযত্নে লালন করিয়া আসিতেছেন। ফল, সর্পাঘাত হইলে আজও গ্রামের মানুষ হাসপাতাল, অ্যান্টি-ভেনম সিরাম (এভিএস) নহে, এই ওঝা, গুণিনদের মন্ত্রের উপরেই অধিক নির্ভর করেন। কিন্তু সম্প্রতি এই অতি-পরিচিত ধারাটি খানিক ধাক্কা খাইয়াছে সুন্দরবনের কিছু অংশে। সেখানে ওঝারা নিজেরাই উদ্যোগী হইয়া গ্রামের মানুষকে হাসপাতালে যাইবার সুপরামর্শ দিতেছেন। এবং প্রকাশ্যে স্বীকার করিতেছেন যে, তাঁহাদের ‘মন্তর’ আদতে একটি বিরাট ধাপ্পা। ঢের বেশি ক্ষমতা এভিএস-এর হাতে।
ঘটনাটি ব্যতিক্রম, সন্দেহ নাই। এবং ব্যতিক্রম বিপ্লব নহে। আকাশচুম্বী অন্ধকারের মধ্যে এ হেন উদাহরণগুলি দু-একটি স্ফুলিঙ্গমাত্র। বস্তুত, কুসংস্কারের হাত হইতে মানুষকে উদ্ধার করিবার কাজটি সহজ নহে। বিশেষত, ভারতের মতো দেশে যুক্তির হাত বিশ্বাস অবধি প্রসারিত করিতে হইলে কয়েক আলোকবর্ষ অপেক্ষা করিতে হইবে। ইহার জন্য শুধুমাত্র অশিক্ষা এবং দারিদ্রকে অপরাধী ভাবিলে ভুল হইবে। অসংখ্য উদাহরণ আছে, যেখানে অন্ধবিশ্বাসের মাপকাঠিতে অশিক্ষিত-শিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, শহর-গ্রাম— কোনও পার্থক্যই নাই। সর্পাঘাতের পর রোগীকে লইয়া ওঝার কাছে ছুটিবার প্রবণতাটিকে নেহাতই অশিক্ষার প্রমাণ এবং গণ্ডগ্রামীণ মানসিকতা বলিয়া অজুহাত দেওয়া হইলে প্রস্তরমূর্তিকে দুধ খাওয়াইবার আকুল প্রচেষ্টার সপক্ষে কোন অজুহাত খাটিবে? সেই দেশজোড়া হিড়িকের সূচনা কিন্তু হইয়াছিল কোনও প্রত্যন্ত গ্রামে নহে, খাস রাজধানীর বুকে। আর তাহার অংশীরাও সকলে দরিদ্র, নিরক্ষর ছিলেন না। তাহার পর নালা দিয়া অনেক দুধই বহিয়াছে। কিন্তু ‘মির্যাক্ল’-এর পক্ষে ‘বিশ্বাসী’ মানুষের সংখ্যা কমিয়াছে, তাহার প্রমাণ নাই।
সুতরাং, আরও বহু ব্যতিক্রমের প্রয়োজন। ব্যতিক্রমের সংখ্যা বাড়িলে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সরকারি-বেসরকারি প্রচারও জোর পাইবে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন যুক্তিবাদী সংগঠন সেই চেষ্টাই করিতেছে। সুন্দরবনে ওঝাদের শুভবুদ্ধির জন্য যেমন ক্যানিং-এর একটি যুক্তিবাদী সংগঠনের অবদান অনস্বীকার্য। কিছু দিন পূর্বে হুগলির গোঘাটে ‘ডাইন’ অপবাদ দিয়া নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন স্থানীয় চার আদিবাসী যুবক। ‘ডাইন’ অপবাদে অকথ্য অত্যাচার, মৃত্যুর ঘটনা আদিবাসী-প্রধান এলাকায় নূতন নহে। নূতন, এই অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মুক্ত স্বরটি একেবারে স্থানীয় স্তর হইতে উঠিয়া আসা। তাহাদের প্রতিবাদ আশপাশের গ্রামগুলিকেও যথেষ্ট প্রভাবিত করিয়াছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন ভাবে দু-একটি অঞ্চলের প্রতিবাদ যথেষ্ট নহে। সংগঠিত আন্দোলনের প্রয়োজন। এবং সেই উদ্যোগটি প্রশাসনের লওয়া উচিত। এ যাবৎ তাহাদের ছকে-বাঁধা প্রচারে যে কাজ বিশেষ হয় নাই, তাহা স্পষ্ট। স্কুল-কলেজে বিজ্ঞান মঞ্চের প্রচারের জোয়ারও আজ অস্তমিতপ্রায়। বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্যায় দেখিলেও গা বাঁচাইয়া চলিবার মহান প্রবণতাটি প্রশাসন কাটাইয়া উঠিতে পারে নাই। সে প্রবণতা এখনই দূর না হইলে ঘোর অমঙ্গল। ক্ষীণ সুর মিলাইতে সময় লাগে না।