ব্য স্ত শহরের পার্কে ইস্টারের রবিবারে মানববোমার আত্মঘাতী বিস্ফোরণে শিশু সহ বহু নাগরিকের হতাহত হওয়ার ঘটনাটিকে সন্ত্রাসবাদীদের ‘উন্মাদ’ আক্রমণ বলিয়া চিহ্নিত করিলে খুব বড় ভুল হইবে। এই ধরনের আরও বহু সন্ত্রাসের মতোই লাহৌরের আক্রমণও উন্মত্ত নহে, পরিকল্পিত। পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রদেশের প্রশাসন বলিতেছে, ইহা খ্রিস্টধর্মাবলম্বী সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ নহে। ইহাও সত্য যে, হতাহতদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা খ্রিস্টানের তুলনায় বেশি। কিন্তু জঙ্গি হানার স্থান-কাল এবং প্রেক্ষাপট বিচার করিলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের চিহ্নিত করিবার ষড়যন্ত্রটি চিনিতে অসুবিধা হয় না। পাকিস্তানের ধর্মদ্রোহ আইনে মৃত্যুদণ্ডিত এক নারীর পক্ষে দাঁড়াইবার ‘অপরাধ’-এ পঞ্জাবের উদারপন্থী মনোভাবাপন্ন গভর্নর সলমন তাসীর পাঁচ বছর আগে আপন দেহরক্ষী মুমতাজ কাদরি-র আক্রমণে নিহত হইয়াছিলেন। সেই ঘাতককে বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, সম্প্রতি সেই দণ্ড কার্যকরও হইয়াছে। ধর্মদ্রোহ আইন তথা জঙ্গি মৌলবাদের সমর্থকরা ইহাতে ভয়ানক ক্ষুব্ধ। কাদরির শেষযাত্রায় রাওয়ালপিন্ডিতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগমে ক্ষোভের এক ধরনের প্রকাশ ঘটিয়াছিল। ইস্টারের রবিবারে আত্মঘাতী হানা আর এক ধরনের ক্ষোভপ্রকাশ। এই সন্ত্রাসী বর্বরতার দায়িত্ব লইয়া পাক তালিবানদের একটি গোষ্ঠী ঘোষণা করিয়াছে: ‘পাকিস্তানে আমরা আসিয়া গিয়াছি।’ ভিন্ন ধর্ম তথা যে কোনও ভিন্ন মতের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতার কারবারিদের আত্মনির্ঘোষের পরিচিত ভাষা। পরিচিত পৈশাচিকতা।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ আপসহীন ও নিরপেক্ষ সংগ্রাম না চালাইলে, তদুপরি সন্ত্রাসকে রাষ্ট্রনীতির অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করিলে পরিণাম আত্মঘাতী হইতে পারে, ইসলামাবাদ-রাওয়ালপিন্ডির নায়করা তাহা অনেক দিন ধরিয়া টের পাইতেছেন। ২০১৪ ডিসেম্বরে পেশোয়ারের সেনা অফিসারদের সন্তানদের স্কুলে মর্মান্তিক আক্রমণের পরে আপাতদৃষ্টিতে তাঁহারা স্বদেশি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কিছুটা সক্রিয়ও হইয়াছেন। কিন্তু লাহৌরের তাণ্ডব দেখাইয়া দিল, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রকে আরও অনেক দূর যাইতে হইবে। এবং কেবল সন্ত্রাসবাদীদের ষড়যন্ত্র ও অস্ত্রশস্ত্রের বিরুদ্ধে নয়, সেই অভিযান চালানো দরকার সন্ত্রাসের মানসিক উৎসের বিরুদ্ধেও। যে উৎকট অসহিষ্ণু ধর্মান্ধতা পাকিস্তানের সমাজে দীর্ঘ দিন ধরিয়া গভীর এবং ব্যাপক, তাহা এই ধরনের জঙ্গিয়ানাকে লালন করে, তাহাকে পুষ্টি জোগায়। লক্ষ করিবার বিষয়, সলমন তাসীরের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হত্যাকারীকে যাহারা ‘জাতীয় শহিদ’-এর মর্যাদা প্রদানের দাবি জানাইতেছে, সেই সংগঠনটি দেশে শরিয়তি আইন প্রবর্তনেরও দাবিদার।
অন্ধ, যুক্তিবিরোধী এই মৌলবাদের সহিত লড়াই সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত অভিযান অপেক্ষা কোনও অংশে সহজতর নহে, বস্তুত কঠিনতর। কারণ প্রতিপক্ষ এ ক্ষেত্রে মানুষের মনে। অল্প মানুষ নহে, বিস্তর মানুষ। সুন্নী তেহরীক-এর ডাকে যে লক্ষাধিক মানুষ সমাবেশে আসিয়াছেন, তাহার সমমতাবলম্বীর সংখ্যা স্পষ্টতই তাহার বহুগুণ। এই বহু লক্ষ মানুষ নিশ্চয়ই সন্ত্রাসকে সমর্থন করেন না, পৃথিবীর কোনও দেশে কোনও দিনই তাহা হয় না। কিন্তু তাঁহাদের সমর্থন ধর্মান্ধতাকে শক্তি দেয়, যে অন্ধতা সন্ত্রাসের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক। পাকিস্তানের রাষ্ট্র এবং সমাজের নায়করা যদি দেশের প্রকৃত কল্যাণ চাহেন, তবে এই যুক্তিবিরোধী অন্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁহাদের কঠোর অবস্থান লইতে হইবে। তাহার জন্য যে সাহস আবশ্যক, নওয়াজ ও রাহীল শরিফদের তাহা আছে কি না, সে বিষয়ে সংশয় ঘোরতর।