ছাত্রছাত্রীরা যে খাতায় পরীক্ষা দিয়েছে তা স্ক্যান করে নম্বর দেবে কম্পিউটার— এই ছিল অন-স্ক্রিন মার্কিং সিস্টেম বা ওএসএম পদ্ধতির লক্ষ্য। কিন্তু নানা অভিযোগ, সমস্যা, বিতর্কের পরে দেখা গেল কম্পিউটার যে খাতা পরীক্ষা করে নম্বর দেবে, তার স্ক্যানড কপিতেই রয়েছে গোলমাল। খাতাই যদি ঝাপসা হয়, তবে কম্পিউটার কী লেখা হয়েছে তা পড়বে কী করে? নম্বরই বা দেবে কী করে? এই থেকেই সমস্যার শুরু। যা বাড়তে বাড়তে এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এ বার সিবিএসই ওই খাতা দেখার ভারপ্রাপ্ত সংস্থাকে জরিমানা করার কথা ভাবতে শুরু করেছে। এমনই খবর এক জাতীয় স্তরের সংবাদমাধ্যম সূত্রে। তা যদি হয়, তবে বুঝতে হবে ওএসএম নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা এবং বিরোধীরা যে সমস্ত অভিযোগ তুলছিল, তা অস্বীকার করতে পারছে না সিবিএসই-ও।
সিবিএসই সূত্রের খবর, বোর্ড এ পর্যন্ত ৫০০০ ঝাপসা উত্তরপত্রের স্ক্যান কপি চিহ্নিত করতে পেরেছে। এ ছাড়া এক জনের উত্তরপত্র অন্য জনের নামে নথিভুক্ত হওয়ার অভিযোগ এসেছে ২৩টি। এই সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে সিবিএসই। যারা এই সমস্ত ভুলের মাত্রা বিচার করে দেখবে খাতা দেখার ভারপ্রাপ্ত সংস্থা কোএম্পট এডুটেক-কে কত টাকা জরিমানা করা হবে?
এই প্রথম ওএসএম পদ্ধতিতে পরীক্ষার খাতা দেখার নিয়ম চালু করল সিবিএসই। এ বছর ১৮ লক্ষ ছাত্র ছাত্রীর ৯৮ লক্ষ খাতা দেখা হয়েছে ওই পদ্ধতিতে। গত ১৩ মে সিবিএসই দ্বাদশের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। আর তার পর থেকেই শুরু বিতর্কের। সিবিএসই দ্বাদশের পাশের হার অনেকটাই কমে ৮৫ শতাংশ হয়ে যাওয়ায় পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকেরা খাতা দেখার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সহযোগিতা করতে থাকে সিবিএসই-ও। ছাত্রছাত্রীদের হাতে খাতার স্ক্যানড কপি তুলে দিতেই একের পর এক সমস্যা প্রকাশ্যে আসতে থাকে। যার জন্য পরোক্ষে দায়ী করা হয় সিবিএসইকেই।
আরও পড়ুন:
পরীক্ষার্থীদের সমর্থনে বিরোধীরাও সরব হন। কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী বলেন, ‘‘যে সংস্থাকে সিবিএসই দায়িত্ব দিয়েছিল, তারা এর আগেও এই একই কাজ করে বিতর্কে জড়িয়েছিল তেলেঙ্গানায়। ইন্টারমিডিয়েটের খাতা দেখার পরে ওই সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্তও হয়। তখন ওদের নাম ছিল গ্লোবেরানা। আর এখন নাম বদলে তারা একই কাজ করেছে।’’ রাহুল প্রশ্ন তোলেন, ‘‘সিবিএসই কি তা হলে খবর না নিয়েই ১৮ লক্ষ পরীক্ষার্থীর খাতা একটি সংস্থাকে দিয়ে দিয়েছে?’’ তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে লেখেন, ‘‘এটি কেবল সাধারণ কোনও অব্যবস্থা নয়। বরং পরিকল্পিত ভাবে মেধার গলা টিপে হত্যা করা।’’ পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকদেরও ক্ষোভও এই সমস্ত তথ্যে আরও বাড়তে থাকে। শেষে বৃহস্পতিবার দুপুরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান আশ্বস্ত করে জানান, তিনি সবকিছু ঠিক করবেন, আর সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ দায়িত্বও তাঁরই।
বৃহস্পতিবার ধর্মেন্দ্রের ওই ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সিবিএসই-র তরফে যে তৎপরতা শুরু হয়েছে, তা স্পষ্ট। সে ক্ষেত্রে যদিও পাস না করতে পারা এবং কম নম্বর পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই প্রশ্নের জবাব মেলেনি এখনও।
খাতা দেখার ভারপ্রাপ্ত সংস্থার বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ?
কোএম্পট এডুটেক এর আগেও পরীক্ষার খাতা দেখা নিয়ে এমনই বিতর্কে জড়িয়েছিল বলে অভিযোগ করেছিলেন রাহুল। তাঁর বক্তব্য, এই কোএম্পট এডুটেক সংস্থার নাম আগে ছিল গ্লোবারেনা টেকনোলজিস। ২০১৯ সালে তেলঙ্গানায় ইন্টারমিডিয়েট বোর্ডের ইন্টারমিডিয়েট (প্লাস টু) পরীক্ষায় খাতা দেখার দায়িত্বে ছিল তারা। আর সেখানেও খাতা দেখার ক্ষেত্রে কিছু অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে, যা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। মোট ৯.৭৪ লক্ষ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩ লক্ষ পরীক্ষার্থী পাশ করতে পারেনি। ফল প্রকাশের পরের সপ্তাহে ১৮ জন পরীক্ষার্থী আত্মঘাতী হয়েছেন বলেও অভিযোগ ওঠে। ভাল ছাত্রীদের পরীক্ষার খাতায় ৫-১০ নম্বর দেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন অভিভাবকেরা। পরীক্ষা দেওয়া সত্ত্বেও কিছু পরীক্ষার্থীকে ‘অনুপস্থিত’ দেখানোর অভিযোগ ওঠে। তৎকালীন গ্লোবারেনা টেকনোলজিসের বিরুদ্ধে শংসাপত্রহীন সফটওয়্যার ব্যবহারেরও অভিযোগ ওঠে।
বিরোধীদের অভিযোগ, ওই সংস্থার সিইও ভিএসএন রাজুর সঙ্গে উপর মহলের বিশেষ যোগাযোগ থাকার কারণেই তারা ওই বরাত পেয়েছে। যদিও কোএম্পট-এর সিইও এবং সিবিএসই সেই অভিযোগ খারিজ করেছিল।