পাটোলা থেকে বালুচরি, বেনারসি থেকে মাইসোর সিল্ক— ভারতীয় রেশমের বর্ণে-বিভঙ্গে মাতোয়ারা সারা বিশ্ব। দেশীয় অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ রেশম। রফতানি বাণিজ্যের দীর্ঘ ইতিহাসে এই রেশম সুতো এবং বস্ত্রের উজ্জ্বল উপস্থিতি। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮ শতকে কুষাণ বংশের শাসনামল থেকে খ্রিস্টিয় তৃতীয় শতাব্দীর গুপ্তযুগ— সর্বত্রই রেশমের হদিস পেয়েছেন ঐতিহাসিকেরা। বাংলার ঐতিহ্যেও রেশমের বাহার কম নয়। দেশের রেশম উৎপাদক রাজ্যগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ চতুর্থ। মোট উৎপাদনের ৯ শতাংশ রেশম বাংলার।
সেই ঐতিহ্যে বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি ঘটেনি একবিংশ শতকেও। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের গণ্ডি ছাড়িয়ে রেশম শিল্প এখন বিরাট আকার ধারণ করেছে। আধুনিক পঠনপাঠনে যোগ হয়েছে ‘সিল্ক টেকনোলজি’। উচ্চ মাধ্যমিক বা সমতুল পরীক্ষা পরই বিটেক করার সুযোগ মিলতে পারে রেশম প্রযুক্তি বিষয়ে। রয়েছে বিস্তৃত কাজের সুযোগ। জেনে নেওয়া যাক হাল হকিকত।
রেশমের বর্তমান বাজার
এই মুহূর্তে রেশম উৎপাদনে সারা বিশ্বে দ্বিতীয় ভারত। ২০২৫ অর্থবর্ষে রেশম সুতো ও বস্ত্র রফতানি করে প্রায় ২৪.৬ কোটি ডলার রোজগার করেছে দেশ। এ ক্ষেত্রে ভারতের সব থেকে বড় ক্রেতা হল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। তার পরেই রয়েছে চিন এবং আমেরিকা।
রেশম আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের উপর থেকে যাবতীয় শুল্ক মুকুব করেছে আমেরিকা। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের সঙ্গে বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যে দিয়েই রেশম ব্যবসার নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
সিল্ক টেকনোলজি
ছোট একটি পোকা, বাসা বাঁধে গাছে। নিজের শরীরের চারপাশে গুটি পাকিয়ে নিজেকে তৈরি করে প্রকৃতিতে ডানা মেলার জন্য। কিন্তু তার আগেই তাকে ধরে ফেলে মানুষ। গরম জলে ডুবিয়ে কেড়ে নেওয়া হয় গুটির সুতো। রেশমের শরীরে পাকানো গুটি থেকে মেলে ফাইব্রোইন এবং সেরিসিন— সিল্কের উপাদান।
বহু বছর ধরে গ্রামীণ কুটির শিল্পে সিল্ক তৈরি হয়। কাজ করেন হাজার হাজার মানুষ। সেই শিল্পকে বৃহৎ রূপ দিতে বিজ্ঞানসম্মত ও বাণিজ্যিক করে তুলতেই উদ্যোগী সরকার। সে জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে সিল্ক টেকনোলজি-তে পড়ানো হয় রেশম চাষ, গুটি থেকে সুতো তৈরি, রেশম বস্ত্র বয়ন— সবই।
আধুনিক দাবি মেনে এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রেশম সুতোকে আরও মজবুত করার পদ্ধতি, নানা ভাবে তাকে গড়ে নেওয়ার কৌশল। সেখানেই প্রয়োগ হচ্ছে নানা রাসায়নিকের। ফলে এক দিকে যেমন কৃষিবিদ্যার চর্চা প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন রসায়নের জ্ঞান। আবার বস্ত্রবয়নের কারিগরিও এরই অন্তর্গত।
সিল্ক টেকনোলজিস্টের কাজ
রেশম প্রযুক্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার পর বিশেষজ্ঞ হিসাবে নানা ক্ষেত্রে কাজ করা যেতে পারে।
সিল্ক টেকনোলজিস্ট, কোয়ালিটি কন্ট্রোল সুপারভাইজ়ার বা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে কাজ করা যায়। সিল্ক টেকনোলজিস্ট রেশমকীট থেকে উৎপাদিত সুতোর গুণমান যাচাই করে তা বুননের জন্য পাঠিয়ে থাকেন। একই সঙ্গে ওই সুতো থেকে তৈরি বস্ত্র বয়নের পর আদতে ব্যবহারযোগ্য কি না, তাও পরীক্ষা করে দেখেন তাঁরা।
উৎপাদিত বস্ত্রের মান যাচাই করা কাজ কোয়ালিটি কন্ট্রোল সুপারভাইজ়ারের। আবার নিরন্তর গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন ও উদ্ভাবনের দিকটি দেখেন রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট।
কোন যোগ্যতা থাকলে পড়া যায় সিল্ক টেকনোলজি
আধুনিক পঠনপাঠনে এসেছে আমূল পরিবর্তন। ছোটবেলা থেকেই যার সাজগোজের প্রতি আকর্ষণ, মায়ের শাড়ির প্রতি অমোঘ টান, তার কপালে এখন আর প্রহার জোটে না। বরং, ওই আকর্ষণই হয়ে উঠতে পারে তার পাঠ্যবিষয়। গড়ে উঠতে পারে সুপ্রতিষ্ঠিত কর্মজীবন।
এ ক্ষেত্রে বাবা-মায়েরও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। সন্তানকে চালিত করতে হবে সে পথে। সিল্ক টেকনোলজি নিয়ে পড়তে গেলে, দশম শ্রেণির পর অবশ্যই বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করতে হবে। গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন-সহ দ্বাদশ উত্তীর্ণ হলেই এ বিষয়ে বিটেক পড়ার সুযোগ মিলতে পারে।
দিতেই হবে জয়েন্ট এন্ট্রান্স
সিল্ক টেকনোলজি বিষয়ে বিটেক করতে গেলে দ্বাদশের পর সর্বভারতীয় কিংবা রাজ্য জয়েন্ট এন্ট্রান্সে উত্তীর্ণ হতেই হবে। মেধার ভিত্তিতে দেশের বাছাই করা প্রতিষ্ঠানে টেকনোলজি শাখার অধীনে সিল্ক টেকনোলজি বিষয়ে চার বছরের স্নাতক পড়ার সুযোগ মিলতে পারে। এর পর দু’বছরের এমটেক-ও করা যেতে পারে।
কোথায় কোথায় পড়ানো হয়
- গর্ভনমেন্ট কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেক্সটাইল টেকনোলজি, হুগলি
- সেন্ট্রাল সেরিকালচারাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট
- সেন্ট্রাল সিল্ক টেকনোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট
এ ছাড়াও কোনও কোনও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও এই বিষয়টি পড়ানো হয়।
কাজের সুযোগ
সারা বিশ্বে ভারতই একমাত্র দেশ, যেখানে মালবেরি, এরি, তসর এবং মুগা— চার ধরনের রেশমই উৎপাদিত হয়। ফলে সারা বিশ্বে এই রেশমের চাহিদা তুঙ্গে। সারা দেশে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটক, গুজরাতের রেশমবস্ত্রে রয়েছে জিআই ট্যাগ। ফলে বিভিন্ন পদে নিয়োগ করা হয় কেন্দ্র কিংবা রাজ্য সরকারি বস্ত্রবয়ন বিভাগে।
একই ভাবে কাজ পাওয়া যেতে পারে বেসরকারি বস্ত্রবয়ন সংস্থাগুলিতেও।
আবার স্বাধীন ভাবে পোশাক উৎপাদন করতে চাইলে নিজস্ব ব্যবসা করার সুযোগও মিলতে পারে। কারণ, সারা বিশ্বে ভারত যে পরিমাণ রেশম রফতানি করে তার প্রায় ৩৬ শতাংশ বস্ত্র। এ ছাড়া রয়েছে কার্পেটও।