রবিবার সংসদে পেশ হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট। শিক্ষাখাতে বৃদ্ধি পেয়েছে বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ। প্রান্তিক পড়ুয়াদের জন্য এ বার একাধিক প্রকল্প চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আবার একই সঙ্গে যে প্রকল্পগুলি ইতিপূর্বে চালু ছিল, সেগুলির জন্য বরাদ্দ খরচ ব্যাপক ভাবে কমানো হয়েছে। আর তাতেই পড়ুয়া থেকে শিক্ষকদের মধ্যেই ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ঘোষণা করেছেন, ঐতিহাসিক ভাবে পিছিয়ে পড়া জনজাতির জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে ১০০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে। তফশিলি জাতি, উপজাতি, অনগ্রসর শ্রেণি এবং অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়াদের জন্য চালু করা হবে একাধিক প্রকল্প। তবে এর পাশাপাশি, তফশিলি উপজাতি এবং অন্যান্য প্রান্তিক পড়ুয়াদের জন্য কার্যকরী বিভিন্ন প্রকল্পে কেন্দ্রের ব্যয় কমেছে অনেকটা।
বাজেটের হিসাব অনুযায়ী, আগের অর্থবর্ষের মতোই তফশিলি জাতির পোস্ট ম্যাট্রিক স্কলারশিপে বরাদ্দ ৬,৩৬০ কোটি টাকা, তফশিলি জাতি এবং অন্যান্যদের জন্য প্রি ম্যাট্রিক স্কলারশিপে বরাদ্দ ৫৭৭.৯৬ কোটি টাকা অপরিবর্তিত রয়েছে। গত অর্থবর্ষের তুলনায় এ বার ওবিসি, ইবিসি, ডিএনটি-দের জন্য পোস্ট ম্যাট্রিক স্কলারশিপে ১,২৫০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১,৩০০ কোটি টাকা, ওবিসি, ইবিসি, ডিএনটি-দের জন্য প্রি ম্যাট্রিক স্কলারশিপে ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা, তফশিলি জাতির ন্যাশনাল ফেলোশিপ ২১২ থেকে ২৩০ কোটি টাকা হয়েছে। অন্য দিকে, অনগ্রসর শ্রেণির জন্য ফেলোশিপ ১৯০.১৩ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১৮১.১৫ কোটি এবং তফশিলি জাতির ন্যাশনাল ওভারসিজ় ফেলোশিপ ১৩০ কোটি থেকে ১২৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
বাজেটে পেশ করা তথ্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র ধরা পড়েছে প্রান্তিক পড়ুয়াদের জন্য বরাদ্দ অন্য চারটি স্কলারশিপের ক্ষেত্রে। সংখ্যালঘুদের জন্য দু’টি স্কলারশিপে বেড়েছে সামান্য বরাদ্দ। এর মধ্যে প্রি ম্যাট্রিক স্কলারশিপে আগের বছরের ১৯৫.৭০ কোটি থেকে ১৯৮ কোটি টাকা এবং পোস্ট ম্যাট্রিক স্কলারশিপে ৪১৩.৯৯ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৫৮১ কোটি টাকা করা হয়েছে। প্রথম দু’টিতে অর্থ বরাদ্দ সামান্য বাড়লেও বাকি দু’টি স্কলারশিপে খরচ বিপুল পরিমাণে কমানো হয়েছে। আগের অর্থবর্ষের চেয়ে এ বার মেরিট কাম মিনস স্কলারশিপ ফর টেকনিক্যাল অ্যান্ড প্রফেশনাল কোর্সে ৭.৩৪ কোটি থেকে ০.০৬ কোটি টাকা এবং মৌলনা আজাদ ন্যাশনাল ফেলোশিপে ৪২.৮৪ কোটি টাকা থেকে ৩৬.১৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া, মাদ্রাসা এবং প্রান্তিকদের ফেলোশিপেও বরাদ্দ খরচ কমানোর উল্লেখ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির ডিন পার্থপ্রতিম বিশ্বাস বলেন, “স্কলারশিপ দেওয়ার অর্থ হল পারিবারিক আয় এবং শিক্ষাখাতে ব্যয়ের মধ্যে ফারাক পূরণ করা। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্রান্তিক পড়ুয়াদের এ সমস্ত স্কলারশিপ এবং ফেলোশিপের যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে।” পেশাদারি এবং প্রযুক্তি ভিত্তিক কোর্সে যে হেতু খরচ অনেকটাই বেশি, সে ক্ষেত্রে বৃত্তির প্রয়োজনীতা অনেকটাই। তাঁর মতে, প্রান্তিক পড়ুয়ারা এর ফলে এই সমস্ত কোর্স করার আর সুযোগ পাবেন না। এমনকি, উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ অর্থ কমায়, আরও কম সংখ্যক প্রান্তিক পড়ুয়া এমফিল, পিএইচডি-র মতো কোর্স করতে পারবেন। অর্থাৎ এর পর গবেষণা, শিক্ষকতা এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রের এই অংশের পড়ুয়ারা আরও কম সংখ্যায় যোগদান করতে পারবেন। প্রশ্ন তোলেন, কেন্দ্রের উদ্দেশ্য নিয়ে। এমনকি যে ক্ষেত্রে বরাদ্দ অর্থ বাড়ানো হয়েছে, তা নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, “আগের অর্থবর্ষের মতোই ছ’মাস পরে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ আবার কমিয়ে দেওয়া হতে পারে।”
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পার্থপ্রতিম রায় বলেন, “প্রতি বছরই কমানো হচ্ছে বরাদ্দ অর্থ। এমনকি মৌলনা আজাদ ফেলোশিপে ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্তই আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছিল। এখন আর কেউ আবেদন করতে পারবেন না।” অর্থাৎ যাঁরা আগে থেকেই ফেলোশিপ পাচ্ছেন, তাঁদের জন্যই বরাদ্দ অর্থ কমেছে। তাঁর কথায়, “সরকারের দাবি, তারা দলিত এবং প্রান্তিকদের জন্য ভাবছে। কিন্তু বাজেটে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষাক্ষেত্রেও ধর্মীয় ভিত্তিতে ভেদাভেদ করার চেষ্টা করছে কেন্দ্র।”
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ওমপ্রকাশ মিশ্রের মতে, অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়বে আশা করা হয়, কিন্তু তা হচ্ছে না। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষকও। তিনি বলেন “কেন্দ্র বিভিন্ন ফেলোশিপের বরাদ্দই আস্তে আস্তে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।”