Advertisement
E-Paper

‘পায়ে জোর না থাকলেও মা-বাবার পাশে দাঁড়াবই’, মাধ্যমিক পাশ করে বলল স্নায়ুরোগে ধস্ত কল্যাণীর রুদ্র

কল্যাণীর পান্নালাল ইনস্টিটিউশনের ছাত্র রুদ্রের পা থেকে কোমর অসাড়। হাতের জোরও তেমন নয়। তবু মনের জোরে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে সে।

সুপ্রিয় তরফদার

শেষ আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ ১৯:০০
বাবা ও মায়ের সঙ্গে রুদ্র

বাবা ও মায়ের সঙ্গে রুদ্র ছবি: সংগৃহীত।

বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান রুদ্র বাড়ৈ। এ বার মাধ্যমিকে প্রায় ৬০ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাশ করেছে। টিনের ঘর আলো করে বছর ১৫-এর রুদ্র বলে, ‘বাবা মায়ের পাশে দাঁড়াতে চাই।’ বাবা-মায়ের হাসিমুখে ছায়া ফেলে যায় হতাশা। তবু, তাকে দূরে ঠেলে স্বপ্ন দেখেন রবীন বাড়ৈ ও তাঁর স্ত্রী রিঙ্কু।

কল্যাণীর পান্নালাল ইনস্টিটিউশনের ছাত্র রুদ্রের পা থেকে কোমর অসাড়। হাতের জোরও তেমন নয়। তবু মনের জোরে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে সে। মনের জেদ, ‘‘পায়ের জোর না থাকলেও আমাকে বাবা মায়ের পাশে দাঁড়াতেই হবে। আমি একমাত্র সম্তান। আমি বড় হয়ে উপার্জন করে বাবা-মায়ের পাশে থাকতে চাই।’’

বাংলা, ইংরেজি, জীবনবিজ্ঞান ও ইতিহাস— সেরা চারে রুদ্র পেয়েছে ৬০ শতাংশের উপরে নম্বর। এ লড়াই বড় সহজ ছিল না। স্নায়বিক অসুস্থতা, তার উপর বাবার সামান্য রোজগার। লড়াই যতই দুরূহ হোক, অসম্ভব নয় প্রমাণ করছে রুদ্র। তার বাবা রবীন জানালেন, জন্ম থেকে অসুস্থতা ধরা পড়েনি। তবে স্বাভাবিকের থেকে বেশি সময় নিয়েছিল সে। বছর তিনেক বয়সে হাঁটা শুরু রুদ্রের। তার পর খেলাধুলো, দৌড়দৌড়ি— সবই চলছিল ঠিক। সাত বছর বয়সে দেখা দিল নতুন সমস্যা। সামান্য ধাক্কা লাগলেই পড়ে যেত রুদ্র। উঠে দাঁড়াতে সময় নিত অনেকখানি। একটু একটু করে কমলে শুরু করল রুদ্র পা-কোমরের জোর। ধীরে ধীরে সেই শিথিলতা গ্রাস করছে রুদ্র হাত, শরীরের অন্য অংশও।

রবীন বলেন, “আমি ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ করি। আর্থিক সামর্থ নেই তেমন। তবু কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে বেঙ্গালুরু— সর্বত্র ছুটেছি ছেলেকে নিয়ে। লাভ হয়নি। এখন ফিজ়িয়োথেরাপি করতে হয়। তাতে খানিকটা ভাল থাকে। চিকিৎসকও তা-ই বলেছেন।”

নিজে থেকে চলাফেরা করার ক্ষমতা নেই রুদ্রর। কোথায় যেতে হলে বাবা-মায়ের কোলে চড়েই যেতে হয়। স্কুলে, পরীক্ষা দিতেও সে যায় বাবার কোলে। একটানা বেশি ক্ষণ লিখতে কষ্ট হয় রুদ্রর। তবু পড়াশোনা ছাড়ার প্রশ্ন নেই।

তবে ছোট থেকেই এ রকম ছিল না রুদ্র। আর পাঁচ জন স্বাভাবিক বাচ্চার মতোই ছিল সে। বাবা মায়ের সঙ্গে খেলা থেকে শুরু করে ঘুরতে যাওয়া সবই চলত নিয়ম মতোই। কিন্তু হাঁটতে একটু দেরি করেছিল। স্বাভাবিক বয়সের থেকে একটু পরেই। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন রুদ্রর বাবা মা। কিন্তু তিন বছর বয়সে যখন প্রথম হাঁটতে শুরু করে তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান রুদ্রের বাবা পেশায় ইলেকট্রিক মিস্ত্রী রবীন। গৃহবধু রিংকু হালদারও যেন শান্তি পায়। তারপরে খেলাধুলার পাশাপাশি স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে গোটা পরিবার। দারিদ্রের সংসারে এক সন্তানকে নিয়ে কাটতে থাকে তাঁদের পরিবার।

কিন্তু ফের দুশ্চিন্তার মেঘ জমতে থাকে যখন রুদ্রর সাত বছর বয়স। বাবা লক্ষ্য করেন একটু ধাক্কা লাগলেই পড়ে যাচ্ছে রুদ্র। উঠে দাঁড়াতেও মাঝে মধ্যে কষ্ট হচ্ছে। তারপর তাঁরা বুঝতে পারেন গোটা শরীরেই কিছু এখটা সমস্যা হচ্ছে। এররপরে স্থানীয় ভাহে চিকিৎসা করান। এরপরে কলকাতা নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু করে বেঙ্গালুরু। কোনও ভাবে অর্থ সংস্থান করে ছেলেকে ভাল করতে কার্যত প্রাণপাত করেন রবীন। কিন্তু অবস্থার আর উন্নতি হয়নি। পা কার্যত অসাড় হয়ে পড়ে। এরপরে দেখা যায় হাত ও শরীরের বিভিন্ন অংশে। এক ভাবে বেশিক্ষণ লিখতেও পারে না সে। তাই ছোট বেলায় যে বাবা মায়ের কোলে খেলে বেড়াত রুদ্র। এখন স্কুল হোক বা বাড়ির বাইরে যেতে গেলে তার একমাত্র মাধ্যম বাবা মায়ের কোল। মাধ্যমিক পরীক্ষাও দিতে গিয়েছে বাবা মায়ের কোলে।

রবীন জানান, ছেলের স্কুলের প্রধানশিক্ষক রমেনচন্দ্র ভাওয়াল তাঁদের সব রকম সাহায্য করছেন। তিনি বলেন, ‘‘যে কোনও সাহায্যের জন্য তিনি আমাকে বলতে বলেছেন। অনেক কম বেতনে আমাদের পাড়ার দু’জন ছেলেকে পড়ান। সকলের সাহায্যে আমাদের চলছে। আমার ছেলেই আমার ভরসা।’’

পান্নালাল ইনস্টিটিউটের প্রধানশিক্ষক বলেন, ‘‘রুদ্র যে ভাবে লড়াই করছে, তা দৃষ্টান্ত। ও শুধু ছাত্রছাত্রীদের কাছে নয়, আমাদের কাছেও অনুপ্রেরণা।’

result
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy