পৃথিবীর মাটিতে দাঁড়িয়ে ঊর্ধ্বমুখে তাকালে যে আকাশ, তারও বাইরে রয়েছে এক বিরাট জগৎ— মহাবিশ্ব। কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীর জন্ম, তারও আগে হয়তো জন্ম হয়েছে কোনও গ্রহের, তারও আগে কোনও নক্ষত্রের। কোথায়, কবে প্রথম সূচনা হয়েছিল এ ব্রহ্মাণ্ডের। তার হদিশ আজও পায়নি বিজ্ঞানমতী মানুষ। তবে নিরন্তর চলছে খোঁজ। সৌরমণ্ডল ছাড়িয়ে অন্য নক্ষত্রপুঞ্জ, ছায়াপথ এবং কৃষ্ণ গহ্বর। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে এই কৃষ্ণ গহ্বরেই হারিয়ে যাবে সব আলোকপুঞ্জ নক্ষত্র। আবার অনেকে মনে করেন, কৃষ্ণ গহ্বর থেকেই সৃষ্টি গ্রহ-নক্ষত্রের। তত্ত্ব আর সত্য উন্মোচনে চলছে গবেষণা। ছোটবেলা থেকে মহাকাশে আকর্ষণ থাকলে দ্বাদশের পর উচ্চশিক্ষার জন্য বেছে নেওয়া যেতে পারে কসমোলজি বা মহাবিশ্ববিজ্ঞান।
কসমোলজি আসলে কী?
এ ব্রহ্মাণ্ডে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে কোনও না কোনও ঘটনা। কোনও নক্ষত্রে ঘটছে বিস্ফোরণ। কোনও নক্ষত্র থেকে ছিটকে যাচ্ছে গ্যাসীয় পিণ্ড। নিয়ত ঘূর্ণনের ফলে তা ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধছে, তৈরি হচ্ছে পৃথিবী বা মঙ্গলের মতো গ্রহ। অথবা গ্যাসীয় অবস্থায় সেই গ্রহের রূপ হচ্ছে বৃহস্পতির মতো।
বিজ্ঞানের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ বলছে, কোটি কোটি বছর আগে মহাবিস্ফোরণের প্রভাবে এখনও প্রচণ্ড গতিতে প্রসারিত হয়ে চলেছে ব্রহ্মাণ্ড। অতিশক্তিশালী টেলিস্কোপ বা মহাকাশে ভ্রাম্যমাণ যন্ত্রের সাহায্যে জটিল অঙ্কের সমাধান করে বিজ্ঞানের নতুন নতুন তত্ত্ব ও তথ্য আবিষ্কার করছে প্রায় প্রতিদিন। এই তথ্য সন্ধানের পদ্ধতিই আসলে কসমোলজি। যা মূলত জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞান অর্থাৎ অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্স-এর একটি শাখা।
কসমোলজিস্টের কাজ
মহাকাশের এমন অজানা রহস্যের সন্ধানে যাঁরা নিরলস ভাবে গবেষণা করছেন, তাঁরাই কসমোলজিস্ট। সারা পৃথিবীতে এমন বিশেষজ্ঞের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার।
স্নাতক স্তরে কি পড়া যায় কসমোলজি?
আধুনিক পঠনপাঠনে মহাকাশের জন্ম ও গঠনশৈলী কী ভাবে সৌরজগতকে প্রাভাবিত করে চলেছে, তা শেখার সুযোগ রয়েছে। তবে, তার জন্য পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং গণিতে গভীর জ্ঞান অর্জন করা বেশি প্রয়োজন বলেই মনে করেন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সেস পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক বাণীব্রত মুখোপাধ্যায়।
ছবি: সংগৃহীত।
কসমোলজি বিষয়টিতে কোয়ান্টাম মেকানিক্স, জেনারেল রিলেটিভিটি, কম্পিউটেশনাল টেকনিক নিয়েও চর্চা করতে হয়। বাণীব্রতের কথায়, “তত্ত্বমূলক পড়াশোনার সঙ্গে কম্পিউটারের সাহায্যে গণনা, প্রোগ্রামিং করা এবং তথ্য বিশ্লেষণ কৌশলও রপ্ত করা সমান ভাবে প্রয়োজন। স্নাতক স্তরের শুরুতেই একসঙ্গে এত বিষয় শেখা কঠিন।” বরং পদার্থবিদ্যা, রসায়ন বা গণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর স্নাতকোত্তর স্তরে কসমোলজি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করা যেতে পারে।
আইআইএসসি ব্যাঙ্গালোরের পদার্থবিদ্যার শিক্ষক নিরুপম রায়ও এ বিষয়ে একমত। তিনি মনে করেন, কসমোলজি নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করতে পারেন আগ্রহীরা। সে ক্ষেত্রে স্নাতকোত্তর স্তরে যাঁরা এই বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা করতে চান, তাঁরা পিএইচডি-র জন্য বিশেষ পত্র হিসাবে হাই এনার্জি ফিজ়িক্স, আর্লি ইউনিভার্স কসমোলজি, অবজ়ারভেশনাল কসমোলজি বেছে নিতে পারেন সহজেই। তার ফলে গবেষণার সময় পদার্থবিদ্যার তত্ত্ব নিয়ে চর্চা কিংবা গাণিতিক সমস্যার সমাধানের কৌশল শেখার জন্য আলাদা করে সময় ব্যয় করার প্রয়োজন হয় না।
কোথায় পড়ানো হয়?
মেধার ভিত্তিতে এ দেশে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সেস, আইআইটি বোম্বে, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্স-এ সংশ্লিষ্ট বিষয়টি নিয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়া যায়। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন কিংবা গণিত নিয়ে স্নাতক স্তরে ভর্তি হওয়ার জন্য জয়েন্ট এন্ট্রানস্ মেন এবং অ্যাডভান্সে উত্তীর্ণ হওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়াও স্নাতকোত্তর স্তরে কসমোলজি নিয়ে পড়তে আগ্রহীদের জয়েন্ট এন্ট্রানস্ স্ক্রিনিং টেস্ট (জেস্ট) কিংবা জয়েন্ট অ্যাডমিশন টেস্ট (জ্যাম) পাশ করা প্রয়োজন।
কাজের সুযোগ
মহাকাশ গবেষণার কাজে কসমোলজি বিশেষজ্ঞদের চাহিদা রয়েছে প্রচুর। এ ছাড়াও শিক্ষকতা কিংবা অধ্যাপনার সুযোগও মেলে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। গণনা, তথ্য বিশ্লেষণের কাজ জানলে সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থায় কাজের সুযোগ পেতে পারেন।