মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন পুরুষ বিভাগেই। কিন্তু একাদশে লিঙ্গ পরিচয়ে লিখলেন ‘অন্যান্য’। কোন স্কুলে ভর্তি হবেন, আদৌ সেই স্কুল পাশে দাঁড়াবে কি না এই দুশ্চিন্তাও গ্রাস করেছিল ঝা়ড়গ্রামের অনুভব পালকে। সমস্যা হয়নি শেষ পর্যন্ত। এ বছর উচ্চ মাধ্যমিকের একমাত্র পরীক্ষার্থী, যিনি নিজের পরিচয় হিসাবে তৃতীয় লিঙ্গের উল্লেখ করেছেন।
ছোটবেলায় ছিলেন আর পাঁচ জন শিশুর মতো। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করলেন, ছেলেবন্ধুদের দামালপনা, ক্রিকেট, ফুটবলে তাঁর মন নেই। বরং ভাল লাগছে মেয়েবন্ধুদের রান্নাবাটির খুঁটিনাটি। ভাল লাগছে, মেয়েদের মতো করে সাজতে। বয়স তখন সবে ১০। সেখান থেকেই যাত্রা শুরু। শরণ্য-র শরণ্যা হওয়ার পথচলায় যুক্ত হলেন অনুভব।
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক সমাজে রূপান্তরকামীদের স্বীকৃতি এবং অধিকারের লড়াই চলছে ঘরে বাইরে। ২০২৩ উচ্চ মাধ্যমিকের মেধাতালিকায় নাম তুলেছিলেন শরণ্যের। জন্মগত ভাবে পুরুষ হলেও অন্তরের নারীসত্তায় বিশ্বাস ছিল তাঁর। তাই একাদশ শ্রেণিতে তিনি রূপান্তরকামী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন শরণ্যা।
এ বার ঝাড়গ্রাম ননীবালা বিদ্যালয় থেকে ৩৩৫ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন অনুভব। তাঁর স্বপ্ন দৃশ্যকলা (ভিসুয়্যাল আর্টস) বিষয়ে উচ্চশিক্ষা। এ জন্য তিনি রবীন্দ্রভারতী অথবা বিশ্বভারতী থেকেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা ভাবেন। অনুভব অবশ্য নিজেকে আলিয়া বলে পরিচয় দিতেই বেশি পছন্দ করেন। মাত্র ১০ বছর বয়সেই সেই অনুভূতি নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল তাঁকে। বুঝেছিলেন, তিনি আর পাঁচ জনের থেকে আলাদা। আশপাশের মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সখ্য। এমনকি ঘরের মধ্যে লুকিয়ে মেয়েদের মতো জামা পরে সাজতেন তিনি। কিন্তু বাইরে কাউকেই সে কথা মুখ ফুটে বলার প্রশ্নই ছিল না।
২০২১-এর পর সব বাঁধ গেল ভেঙে। মায়ের মৃত্যু, বাবা অন্যত্র বিবাহ তাঁকে যেন শক্তি জোগায়। অনুভব বলেন, “কে, কী ভাববে— এই ভাবনাতেই নিজের মনের কথা বলে উঠতে পারনি অনেক বছর। সাহস করে এগিয়েও যেতে পারিনি। তবে, মা-কে হারিয়ে ফেলার পর আর কিছু ভাবিনি। এগিয়ে গিয়েছি নিজের মনের ইচ্ছেকেই পূর্ণতা দেওয়ার তাগিদে।” এখন অনুভব থাকেন তাঁর মাসির কাছে, এ পৃথিবীর একমাত্র আশ্রয়।
মানসিক ভাবে প্রস্তুত হলেও শারীরিক ভাবে নিজেকে বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় অনুভব। সে জন্য প্রথমে পরামর্শ নিয়েছিলেন মনোবিদের। তারপর শুরু হয় হরমোন চিকিৎসার মাধ্যমে শারীরিক পরিবর্তনের যাত্রা। যদিও হরমোন পরিবর্তনের পদ্ধতি শুরু হওয়ার তিন বছরের মধ্যে অস্ত্রোপচার করা যায় না। তা ছাড়া অস্ত্রোপচারের সময় বয়স ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে হওয়াও বাধ্যতামূলক। তাই আপাতত অপেক্ষা।
প্রতিবেশী, বন্ধু, পরিবারের অনেককেই পথচলায় পাশে পেয়েছেন দ্বাদশোত্তীর্ণ এই ছাত্র। আবার, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপও কম সহ্য করতে হয়নি। একাদশে তৃতীয় লিঙ্গ হিসাবে ঘোষণা করে পড়াশোনা শুরু করতে চেয়েছিলেন। পাশে দাঁড়িয়েছে ননীবালা বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক মুক্তিপদ বিষুই সে সময় আশ্বাস দিয়েছিলেন, “কোনও রকম সমস্যা হবে না।”
একাদশে স্কুলের মহিলাদের পোশাক পরে তাঁদের সঙ্গেই ক্লাস করতেন তিনি। স্কুলে কেউ কু-কথা শোনালে প্রধান শিক্ষক তাঁর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করবেন বলেও জানিয়ে দিয়েছিলেন। সদ্য ১৮-এ পড়েছেন অনুভব। আর এক বছর কাটলেই ‘আলিয়া’ হওয়ার অস্ত্রোপচার। সমাজের খারাপ দিকটাও যেমন অনুভব করেছেন তেমনই পাশে পেয়েছেন বহু বান্ধবী এবং শিক্ষককে। ভবিষ্যতে আলিয়া পাল নামে নিজেকে একজন ভাল অঙ্কন শিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদে এগিয়ে চলেছেন অনুভব।