দ্বাদশের পর প্রবেশিকা পাশ করে কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়া যায় চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্যে। গত কয়েক বছরে মেডিক্যাল শিক্ষার ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। তবে সে ক্ষেত্রে খরচ, আসন সংখ্যার পাশাপাশি সঠিক কলেজ বেছে নেওয়াও কোনও শিক্ষার্থীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়ামক সংস্থার স্বীকৃতি বাধ্যতামূলক
চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার জন্য সরকারি কলেজের পাশাপাশি বেশ কিছু বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও ডিমড বিশ্ববিদ্যালয় (স্বতন্ত্র বা স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কাজ করে যে প্রতিষ্ঠানগুলি) রয়েছে। তবে যে কোনও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের ক্ষেত্রে জাতীয় স্তরের নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বীকৃতি বাধ্যতামূলক।
পশ্চিমবঙ্গের বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলি সাধারণত ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি অফ হেলথ সায়েন্সেস-এর অধিভুক্ত। তবে মেডিক্যাল শিক্ষা পরিচালনা ও ডিগ্রি প্রদানের জন্য জাতীয় স্তরে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন-এর স্বীকৃতিও বাধ্যতামূলক।
ভর্তি প্রক্রিয়া ও আসন পাওয়ার উপায়
ভারতে সরকারি হোক বা বেসরকারি— যে কোনও মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস-এ ভর্তি হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি হল নিট ইউজি। এই প্রবেশিকা না দিয়ে ভারতে কোনও ধরনের মেডিক্যাল কলেজেই ভর্তি হওয়া যায় না। প্রবেশিকার পর কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে ভর্তি হওয়া যায়।
কাউন্সেলিং-এর তিনটি মূল মাধ্যম
১) অল ইন্ডিয়া কাউন্সেলিং (এমসিসি): দেশের সব ডিমড ইউনিভার্সিটির ১০০ শতাংশ আসনের ভর্তি প্রক্রিয়া পরিচালনা করে এমসিসি। এর জন্য mcc.nic.in ওয়েবসাইটে নাম নথিভুক্ত করতে হয়। তার পর সেখানে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নিট পাশ করে কাউন্সেলিং-এ যোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
২) স্টেট কোটা কাউন্সেলিং: প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব ডিরেক্টরেট অফ মেডিক্যাল এডুকেশন (যেমন পশ্চিমবঙ্গের জন্য ডব্লুবিএমসিসি), সেই রাজ্যের বেসরকারি কলেজগুলির ‘স্টেট কোটা’ এবং ‘ম্যানেজমেন্ট কোটা’ আসনের কাউন্সেলিং করায়।
৩) এনআরআই কোটা: অনেক বেসরকারি ও ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়ে এনআরআই কোটা থাকে। আসনের সংখ্যা প্রতিষ্ঠান ভেদে ভিন্ন হতে পারে।
নিট-এর ফলপ্রকাশের পর কাউন্সেলিং-এর জন্য নতুন করে আবেদনপত্র পূরণ ও রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। কোনও প্রার্থী যদি অল ইন্ডিয়া ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান, তবে এমসিসি-র ওয়েবসাইটে গিয়ে আলাদা ফর্ম পূরণ করতে হয়। আর যদি নিজের রাজ্যে বা অন্য কোনও রাজ্যের বেসরকারি কলেজে পড়তে হয়, তা হলে সেই রাজ্যের সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে গিয়ে আলাদা ফর্ম পূরণ করতে হয়।
কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ার খরচ
কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নির্দিষ্ট মূল্য জমা দিতে হয়। ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সাধারণত ৫,০০০ টাকা, রাজ্যের বেসরকারি কলেজের জন্য ২,০০০-৩,০০০ টাকা খরচ হয়। এই মূল্য ফেরতযোগ্য নয়।
এ ছাড়াও কাউন্সেলিংয়ে যাতে কেউ অকারণে আসন ধরে রাখতে না পারেন, সে জন্য ‘সিকিউরিটি মানি’ অনলাইনে জমা নেওয়া হয়। ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খরচ প্রায় ২ লক্ষ টাকা এবং রাজ্যের বেসরকারি কলেজের জন্য প্রায় ১-২ লক্ষ টাকা (এই মূল্য পরিবর্তনও হতে পারে বছরের নিরিখে)।
তবে প্রার্থী যদি কাউন্সেলিং-এর পর ভর্তি না হতে পারেন, তা হলে এই টাকা ফেরত দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কোনও কলেজ নির্দিষ্ট হয়ে যাওয়ার পর প্রার্থী যদি স্বেচ্ছায় সেখানে ভর্তি না হন, তা হলে ওই মূল্য ফেরত দেওয়া হয় না।
‘চয়েস ফিলিং’
কাউন্সেলিং-এর ফর্ম পূরণ করার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, ‘চয়েস ফিলিং’। অনলাইন পোর্টালে ভারতের বা রাজ্যের সমস্ত মেডিক্যাল কলেজের একটি তালিকা থাকে। সেখান থেকে কোন কোন কলেজে প্রার্থী পড়তে ইচ্ছুক এবং কোন কলেজটিকে কত নম্বরে রাখতে চান, তা ক্রমানুসারে সাজিয়ে জমা দিতে হবে। এর পর র্যাঙ্ক অনুযায়ী প্রার্থী তার পছন্দ মতো কলেজে কাউন্সেলিং-এর সুযোগ পান।
কাউন্সেলিং কবে শুরু হয় এবং কী ভাবে জানা যায়?
সাধারণত এনটিএ-র তরফে নিট ইউজি-র চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করার ঠিক এক থেকে দু’সপ্তাহের মধ্যে কাউন্সেলিংয়ের পোর্টালগুলি চালু করা হয়। এই সময়ে অনেক ভুয়ো ওয়েবসাইট চালু হয়। তাই সেই ওয়েবসাইটগুলির উপরে আস্থা না রেখে সরকারি ওয়েবসাইটেই নজর রাখা ভাল। ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্য (সারা দেশের মধ্যে) mcc.nic.in এবং রাজ্যের বেসরকারি কলেজের জন্য wbmcc.nic.in এই ওয়েবসাইটে নজর রাখা ভাল।
পড়ার খরচ কেমন হয়?
বেসরকারি কলেজে এমবিবিএস পড়ার খরচ সরকারি কলেজের তুলনায় অনেকটাই বেশি এবং এটি কলেজ ও কোটার ভিত্তিতে ভিন্ন হয়:
১) স্টেট কোটায় কোনও কোনও রাজ্যে বেসরকারি কলেজেও তুলনামূলক কম খরচে আসন পাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বার্ষিক খরচ প্রায় ৪ লক্ষ থেকে ৮ লক্ষ টাকার আশপাশে হতে পারে।
২) ম্যানেজমেন্ট কোটায় (বেসরকারি কলেজের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে থাকা আসন) সাধারণ বেসরকারি আসনের ক্ষেত্রে বার্ষিক খরচ ১১ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ, পুরো পাঁচ বছরের কোর্স ফি (হস্টেল খরচ বাদে) প্রায় ৫০ লক্ষ থেকে ১.২ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছয়।
৩) এনআরআই কোটা: এখানে খরচ সবচেয়ে বেশি। বছরে প্রায় ২৫,০০০-৫০,০০০ মার্কিন ডলার খরচ হতে পারে।
এ ছাড়াও হোস্টেল খরচ, গবেষণাগার, বইপত্র-সহ আনুষাঙ্গিক খরচ বহন করতে হয়।
ভারতের শীর্ষ কয়েকটি বেসরকারি ও ডিমড মেডিক্যাল কলেজের তালিকা
১) খ্রিস্টান মেডিক্যাল কলেজ, ভেলোর।
২) কস্তুরবা মেডিক্যাল কলেজ, মণিপাল।
৩) সেন্ট জনস্ মেডিক্যাল কলেজ, বেঙ্গালুরু।
৪) কস্তুরবা মেডিক্যাল কলেজ, ম্যাঙ্গালুরু।
৫) শ্রী রামচন্দ্র ইনস্টিটিউট অফ হায়ার এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ, চেন্নাই।
৬) জেএসএস মেডিক্যাল কলেজ, মহীশূর।
৭) এম এস রামাইয়া মেডিক্যাল কলেজ, বেঙ্গালুরু।
৮) অমৃতা স্কুল অফ মেডিসিন, কোচি।
৯) কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস, ভুবনেশ্বর।
১০) ডক্টর ডি ওয়াই পাতিল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, পুণে।
রাজ্যের কয়েকটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের নাম
১) কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, যাদবপুর (এটি রাজ্যের প্রথম বেসরকারি কলেজ)।
২) আইকিউ সিটি মেডিক্যাল কলেজ, দুর্গাপুর।
৩) আইকেয়ার ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস, হলদিয়া।
৪) জগন্নাথ গুপ্ত ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস, বজবজ।
৫) শ্রী রামকৃষ্ণ ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস, দুর্গাপুর।
৬) গৌরী দেবী ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস, দুর্গাপুর।
গবেষণার নিরিখে এই সব ক’টি বেসরকারি কলেজের নাম উঠে এসেছে। বেসরকারি কলেজে এমবিবিএস পড়া ব্যয়বহুল হলেও সঠিক পরিকল্পনা এবং নিট-এ ভাল নম্বর থাকলে দেশের সেরা শিক্ষা পাওয়া সম্ভব। তবে লক্ষ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করার আগে কলেজের পরিকাঠামো-সহ নানা বিষয়ে ভাল করে যাচাই করে নেওয়া উচিত। কারণ, চিকিৎসা বিজ্ঞান একটি ব্যয়বহুল পাঠ্যক্রম, তাই যে কোনও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেই ভর্তি হওয়ার আগে যাচাই করে নেওয়া ভাল।