Advertisement
E-Paper

বাবা-ঠাকুরদার থেকে শিখে প্রথম বার যা রাঁধি, কেউ খেতে পারেনি: পান্তাভাতপ্রেমী রন্ধনশিল্পী কুণাল

শনিবার শহরে এলেন তারকা রন্ধনশিল্পী, ‘মাস্টারশেফ ইন্ডিয়া’ রিয়্যালিটি শোয়ের অন্যতম জনপ্রিয় বিচারক কুণাল কপূর। কথা বললেন নিদের প্রথম রান্না থেকে রান্নার জগতের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কলকাতা ও বাংলার খাবার নিয়ে আড্ডা দিলেন প্রাণ খুলে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬ ০৮:৫৯
তারকা রন্ধনশিল্পী কুণাল কপূর।

তারকা রন্ধনশিল্পী কুণাল কপূর। ছবি: সংগৃহীত।

শনিবাসরীয় সন্ধ্যায় এক অনুষ্ঠানে সকলের সামনে রান্নার পারফর্ম্যান্স হল শহরে। ভিড়ে ঠাসা প্রেক্ষাগৃহে ফেটে পড়ল হাততালিতে। মধ্যমণি, তারকা রন্ধনশিল্পী, ‘মাস্টারশেফ ইন্ডিয়া’ রিয়্যালিটি শোয়ের অন্যতম জনপ্রিয় বিচারক কুণাল কপূর। কলকাতায় পা রেখে বাংলা তথা ভারতীয় রন্ধনশৈলী নিয়ে আড্ডা দিলেন আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে।

প্রশ্ন: জীবনে প্রথম কোন রান্নাটি করেছিলেন?

কুণাল: দুধ চা। কেউ খেতে পারেনি। অনেক বেশি ক্ষণ ফুটিয়ে ফেলেছিলাম বলে ভীষণ কড়া হয়ে গিয়েছিল। আমার বয়স তখন ১৪। এই কথাটা কিন্তু আমার মনেই ছিল না। কেউ কখনও জিজ্ঞাসা করেছিল বলে মাকে প্রশ্ন করি। তখনই জানতে পারি এই কীর্তির কথা।

প্রশ্ন: মায়ের কাছেই রান্নার হাতেখড়ি তা হলে?

কুণাল: না, আমার ঠাকুরদা আর বাবা-ই ছিলেন বাড়ির রাঁধুনী। ফলে ওঁদের থেকেই শিখেছি।

কলকাতায় কুণাল কপূর।

কলকাতায় কুণাল কপূর। — নিজস্ব চিত্র

প্রশ্ন: সেই শিক্ষার কোন বিষয়টি এখন সবচেয়ে বেশি মূল্যবান বলে মনে হয়?

কুণাল: আর পাঁচটা পঞ্জাবি পরিবারের মতোই রবিবার করে জমিয়ে রান্না হত আমাদের। সে এক উৎসবের মতো ব্যাপার। আর এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা, রান্না করাটা উদ্‌যাপন করা উচিত। রোজ একই রান্না করলেও গোটা প্রক্রিয়াটা বড়ই আনন্দের। রান্না খাইয়ে পরিবার, বন্ধুবান্ধবের প্রশংসা কুড়োনো, রান্নাঘর মাতিয়ে রাখা, এই সবই আমায় আজ রাঁধুনী বানিয়েছে। আর তা বাবা ও ঠাকুর্দার হাত ধরেই মূলত হয়েছে।

প্রশ্ন: তার মানে, আপনার বাড়ির হেঁশেল লিঙ্গের ভেদাভেদ দেখেনি?

কুণাল: একেবারেই না। কিন্তু এই চিত্রটা আজ সর্বত্র বদলে গিয়েছে। রান্নার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ তো আর নেই। সবাই সব কাজ করতে পারেন।

প্রশ্ন: কিন্তু অধিকাংশ বাড়িতে মহিলাদেরই তো রোজের রান্না করতে হয়, তা সে ইচ্ছা করুক বা না করুক।

কুণাল: কেউ তো জোর করছে না! ইচ্ছে না করলে অবশ্যই করবেন না। আবার এর উল্টো দিকটাও আছে, রান্নাঘরে গিন্নিরা আবার পুরুষদের অনেক সময়ে বলেন— "তুমি রান্নাঘরে ঝড় তুলে দাও, বরং খাওয়ার টেবিলে গিয়ে বসো, আমি খাবার এনে দিচ্ছি।" তবে যাঁরা ভালবেসে রান্না করছেন, তাঁদের জন্য এই বদলের তো দরকার নেই।

প্রশ্ন: কখনও তো দায়ভারও মনে হতে পারে, ক্লান্তিও আসতে পারে?

কুণাল: সে তো রেস্তরাঁয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা রান্না করাটাও দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

প্রশ্ন: এখানেও জানতে চাইব, অনেকটা সময় পর্যন্ত 'শেফ' তকমা পেতেন পুরুষেরা, মহিলাদের রান্নার শৈলী আটকে থাকত বাড়ির হেঁশেলেই, তাই নয় কি?

কুণাল: আমার কাছে রান্না লিঙ্গের ভেদাভেদের একেবারে ঊর্ধ্বে। এমন একটা সময় ছিল ঠিকই, কিন্তু এখন মহিলারাও পেশাদার রাঁধুনী হচ্ছেন। নিজের পছন্দ অনুযায়ী পেশা বেছে নিচ্ছেন। শহরগুলিতে তো পেশা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতায় কোনও প্রকার বাধা দেখতে পাই না আমি। এই ইন্ডাস্ট্রিতে এখন ভারসাম্য এসেছে। নারীরা শেফ হতে পারবেন না বা হলে কটাক্ষ করা হবে— এই ধারণার দিন চলে গিয়েছে। এখন বাড়ি বা রেস্তরাঁ-হোটেলের হেঁশেলে এই ভেদাভেদ নেই। তার থেকেও বড় কথা, আমি নিজে আসলে এমন এক পরিবেশে বড় হয়েছি, যেখানে এই ছবিটা উল্টো ছিল। সমাজে নির্দিষ্ট কিছু লিঙ্গ-ভূমিকা রয়েছে, যা আমরা সবাই পালন করে থাকি। ভারত ও বিদেশেও এই ছবিটা একই রকমের।

রান্নার পারফর্ম্যান্সে কুণাল।

রান্নার পারফর্ম্যান্সে কুণাল। — নিজস্ব চিত্র

প্রশ্ন: গোটা বিশ্বের রন্ধনশৈলীর নিরিখে এ দেশ কী ভাবে আলাদা?

কুণাল: বেশির ভাগ বাইরের দেশের রান্নার সঙ্গে ভারতের রান্নার তুলনা করতে হল বলব, আমাদের দেশের রান্না অনেক বেশি কঠিন। ধরুন ওদের চা, গরম জলে টি ব্যাগ চুবিয়ে খেয়ে নিলেই হল। আর এখানে? ৬-৭ রকমের মশলা দিয়ে চা বানানো হয়। আমাদের উপকরণগুলির মতো আর কোথাও নেই। আমাদের রান্নায় সময়ও বেশি লাগে। তবে হ্যাঁ, আমাদেরও বদল দরকার। দেশজ খাবারের প্রতি আরও বেশি গর্বিত হওয়া উচিত আমাদের। ভারতীয় হিসেবে আমাদের যা শেখা দরকার তা হল, আমাদের নিজেদের উৎপাদিত ফসল, দেশের কৃষকের শ্রম, মায়েদের রান্না, নিজেদের বাড়ির রান্নাঘর, নিজেদের খাবার এবং নিজেদের সংস্কৃতিকে সম্মান করা। এক বার যখন সেটা শিখে যাব এবং উদ্‌যাপন করতে শুরু করব, তখন সত্যিই আমাদের নিজস্ব রন্ধনশিল্প বা খাবারের ঐতিহ্য আরও শিকড়ের কাছাকাছি পৌঁছোবে।

প্রশ্ন: ভারতীয় রন্ধনের কোন দিকটা তেমন প্রচারের আলো পায় না?

কুণাল: ঘরের রান্না। রেস্তরাঁয় গিয়ে বাটার চিকেন, ডাল মাখানি, নান খাওয়ার চল বেড়েছে। কিন্তু ঘরোয়া রান্নার দিকটা সে ভাবে স্পটলাইট পায়নি কখনও। অথচ বাইরের দুনিয়া জানেই না যে, আমাদের হাজারো রান্নার মাঝে ঘরোয়া খাবারের ঐতিহ্য আলাদাই!

প্রশ্ন: কোন কোন বাঙালি রান্না পছন্দ?

কুণাল: পান্তাভাত, শুক্তো, নিরামিষ নানা পদ, যা কিছু সাদামাঠা খাবার, তা-ই আমার পছন্দ। আর মিষ্টি তো বটেই! শীতের সময়ে নলেন গুড়ের রসগোল্লা, মিষ্টি দই, ভাপা দই…

প্রশ্ন: আমিষ পদ ভাল লাগে না?

কুণাল: ভীষণ ভাল লাগে। কষা মাংস, ভেটকি, ইলিশের ঝোল— দারুণ পছন্দ আমার। নিজেও রান্না করি নানা রকমের বাঙালি খাবার।

‘মাস্টারশেফ’ রিয়্যালিটি শোয়ের বিচারক।

‘মাস্টারশেফ’ রিয়্যালিটি শোয়ের বিচারক। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: সর্বভারতীয় খাবারের ভিড়ে বাঙালি রান্না কোথায় আলাদা?

কুণাল: আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় যেটা মনে হয় তা হল, বাংলার খাবার আর কলকাতার খাবার কিন্তু আলাদা। এখানেই সবার থেকে আলাদা হয়ে যায় বাংলার খাবার। খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, উত্তরবঙ্গ আর দক্ষিণবঙ্গের খাবার আলাদা, পূর্ব আর পশ্চিমের বর্ডারে গেলেও একেবারে অন্য রকম মনে হবে। আবার রাজ্যের মধ্যভাগে অন্য রকমের খাবার পাওয়া যায়। একটি রাজ্যেই খাবারে কত বৈচিত্র! এমনকি, কলকাতার মধ্যেও এক এক সম্প্রদায়, এক এক গোষ্ঠীর খাবারের স্বাদ আলাদা।

প্রশ্ন: আপনি নিজে রান্না শিখেছেন, কিন্তু কেউ বলেন, রান্না এমন এক শিল্প যা শেখা যায় না।

কুণাল: কে বলেছে শেখা যায় না? লিখতে-পড়তে শেখাতে পারলে, রান্না শেখানো যাবে না কেন? তবে হ্যাঁ কঠিন বা সহজ লাগাটা আলাদা বিষয়। আমি যেমন অঙ্ক পারি না, তেমনই কারও হয়তো রান্নাকে রকেট সায়েন্স মনে হতে পারে। কিন্তু শেখা তো যায়ই। আর রান্না তো শিল্প বটেই, এমন এক শিল্প যা প্রত্যেকটি ইন্দ্রিয়কে একসঙ্গে জাগিয়ে তোলে। দেখা, গন্ধ পাওয়া, ছুঁতে পারা, রান্নার আওয়াজ শোনা, স্বাদ পাওয়া, সব মিলে মিশে রয়েছে। আর এটি একমাত্র শিল্প, যা আপনি খেতেও পারেন।

প্রশ্ন: সেই কারণেই কি এখন রান্নার প্রতিটি ধাপের শব্দ বাড়িয়ে রিল বানানোর চল এতটা বেড়েছে?

কুণাল: হ্যাঁ, বলাই যায়। কারণ খিদের বোধ আসলে এতটাই ভিতর থেকে আসে যে, সে রকম রিল ভিডিয়ো দেখলে আপনার শরীরে ও মনে আরাম হয়। ‘কোন’ থেকে আইসক্রিম বেরিয়ে আসছে অথবা চিজ়ের সস টুপটাপ করে পড়ছে কিছুর উপর, বা চিজ় কাটা হচ্ছে তার আওয়াজ— এ সব দৃশ্যত বড্ড সুন্দর। পাশাপাশি, এ সবের আওয়াজেও আরাম পাওয়ার অবকাশ রয়েছে। আপনার মন শান্ত হয় এই ভিডিয়োগুলি দেখে, খেতেও ইচ্ছে করে। এটাই রান্না নামে শিল্পটির সৌন্দর্য।

প্রশ্ন: ‘মাস্টারশেফ’ রিয়্যালিটি শোয়ের বিচারক ছিলেন ৪টি সিজ়নেই, কেমন ছিল অভিজ্ঞতা?

কুণাল: বিচারকের আসনে ছিলাম বটে, কিন্তু প্রচুর কিছু শেখার সুযোগ পেয়েছিলাম সেখান থেকে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিযোগীরা নিজেদের খাবার আনতেন। রান্নার প্রতি তাঁদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতেন। বিভিন্ন পদে তাঁদের নিজস্ব আঞ্চলিক ফসল, উপকরণ ও রান্নার শৈলী নিয়ে আসতেন। তাই শুধু রান্না করা খাবারের বিচার করেছি, এটা বললে ভুল হবে। অনেক কিছু শিখেছি সেখান থেকে।

প্রশ্ন: রান্না ও খাবারের বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ কী?

কুণাল: লোকের চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন এসেছে, যা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা এখন নতুন নতুন খাবার আর বিভিন্ন দেশের রান্নাবান্না চেখে দেখতে বেশ আগ্রহী। এখন প্রায় ২-৩ দিন অন্তর রেস্তরাঁয় যাচ্ছেন, ক্যাফেতে যাচ্ছেন, নয়তো বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে বা কিনে খাচ্ছেন। এর সঙ্গে আবার ভ্রমণও জুড়ে গিয়েছে কিন্তু। সব মিলিয়ে রান্নাবান্না, রেস্তরাঁ ও হোটেল ব্যবসা এখন দারুণ লাভজনক। আমার মনে হয়, সত্যিই এক চমৎকার সময়ে বাস করছি, যেখানে শুধু একটা বেলার ভাল খাবারের খোঁজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ পেরিয়ে দূর-দূরান্তে চলে যেতেও দু’বার ভাবছেন না অনেকে।

প্রশ্ন: নতুন প্রজন্মের পেশাদার রাঁধুনীদের কী উপদেশ দেবেন?

কুণাল: নতুন প্রজন্মকে দেখে আমি নিজেই বিস্মিত। কত নতুন নতুন খাবারদাবার বানাচ্ছেন তাঁরা। তবে আমার পরামর্শ, মাথা নিচু করে শিখে যেতে হবে। কেবল শিখতেই হবে। কোনও প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হোন বা কাছের কেউ শেখান, সে যা-ই হোক। শুরুর দিকেই এটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি। আর ভুল করতে ভয় পেলে চলবে না। ভুলই সবচেয়ে বড় শিক্ষক।

Kunal Kapoor MasterChef India Bengali Cuisines Culinary skills Cooking
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy