গত মে মাসে রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরে তাঁরা ভেবেছিলেন, গত ১৫ বছরের বঞ্চনার অবসান হবে। রাজ্যের প্রথম বাজেটের দিকেই চোখ ছিল তাঁদের। তবে গত সোমবারের বাজেটে তাঁদের অবস্থার কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত না পেয়ে হতাশ স্কুলস্তরের চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক, স্কিল এডুকেশনের শিক্ষক-সহ সমগ্রশিক্ষা মিশনের ম্যানেজমেন্ট কর্মচারীরা। স্কিল এডুকেশনের শিক্ষকদের দাবি, তাঁরা ইতিমধ্যে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের সঙ্গে দেখা করে ফের তাঁদের দাবি জানিয়েছেন। এই মুহূর্তে বিধানসভায় যে অধিবেশন চলছে এই সময়কালের মধ্যে সরকার ফের তাঁদের বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের সংগঠন পশ্চিমবঙ্গ উচ্চ মাধ্যমিক চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কল্যাণ সরকার জানান, সম-কাজে সম-বেতন, এই তত্ত্ব তাঁদের ক্ষেত্রে কার্যকরী নয়। অন্য শিক্ষকদের মতোই কাজ করতে হয় তাঁদের। অথচ, ওই শিক্ষকদের বেতনের সিকি ভাগও পান না তাঁরা। সংসার চালাতেও হিমশিম খেতে হয়। বিজেপির সংকল্পপত্রে সম-কাজে সম-বেতনের কথা উল্লেখ থাকলেও বাজেটে তার প্রতিফলন দেখা গেল না বলে আক্ষেপ তাঁদের।
২০০২ থেকে রাজ্যের সরকার পোষিত স্কুলগুলিতে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। নামমাত্র বেতনেই কাজ শুরু করেছিলেন তাঁরা। ২০১৮ সালে ৪০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি হয় তাঁদের। তার পরে গত ৮ বছরে আর বেতন বৃদ্ধি হয়নি। এই মুহূর্তে সারা রাজ্যে প্রায় ৭০০ শিক্ষক কাজ করেন চুক্তির ভিত্তিতে। কোনও কোনও স্কুলে, কোনও কোনও বিষয় পড়ানোর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকেরাই ভরসা।
যেমন কলকাতার এন্টালি হিন্দু বালিকা বিদ্যামন্দির। উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাবিজ্ঞান পড়ান মাত্র এক জন শিক্ষিকা, তিনি চুক্তিভিত্তিক। বারাসত ছোটজাগুলিয়া হাইস্কুলের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক জন শিক্ষক রয়েছেন চুক্তিভিত্তিক। অথচ, তাঁরা ২০২৬-এও বেতন পান মাত্র ১৫,২০০ টাকা।
হিসাব বলছে, এই মুহূর্তে স্কুলগুলিতে শিক্ষাকর্মীরা যা বেতন পান, তার অর্ধেকও পাচ্ছেন না এই চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকেরা। তাঁদের দাবি, যে কোনও সরকারি কার্যালয়ে ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গ্রুপ-সি কর্মী বেতন পান ৩৯,০০০ বেতন কাঠামোয়। গ্রুপ-ডি কর্মীরা সেখানে পান ৩৭,০০০। অথচ, প্রায় ২৪ বছর শিক্ষকতার কাজ করেও এই শিক্ষকেরা পান ১৫,২০০ টাকা। এর উপরও কর বাবদ ১৩০ টাকা কেটে নেওয়া হয়। অথচ, পূর্ণ সময়ের শিক্ষকদের তুলনায় দায়িত্ব তাঁদের কোনও অংশে কম নয়। তাই এই বাজেটে বঞ্চনার অভিযোগও তুলছেন তাঁরা।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, স্কিল এডুকেশনের শিক্ষকদের সংগঠন ইউনাইটেড ওয়েস্টবেঙ্গল এনএসকিউএফ (ন্যাশনাল স্কিল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক) টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নিরুপম কোলে জানান, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে রাজ্যের স্কুলগুলিতে ১৬টি বৃত্তিমূলক বিষয় পড়ানো হয়। জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী, এই শিক্ষা পুরোপুরি স্কুলশিক্ষা দফতরের অধীনেই হওয়ার কথা। অতীতের সরকার সেই নিয়ম লঙ্ঘন করে গোটা বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থাকে কারিগরি শিক্ষা দফতরের অধীনে নিয়ে আসে। তাঁর অভিযোগ, তৎকালীন সরকার নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে নিয়ম লঙ্ঘন করেছিল। এ ছাড়া, গত ১৩ বছরে এক টাকাও বেতন বৃদ্ধি হয়নি তাঁদের। এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ হওয়াতে বেতনও পান অনিয়মিত। তাই তাঁরা নতুন সরকারের কাছে তাঁদের অবস্থার পরিবর্তনের দাবি জানান। এমনকি, নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরেও আবেদনপত্র দিয়ে আসেন। কিন্তু এই বাজেটে তাঁদের ভাগ্যও অপরিবর্তিত রয়ে গেল বলেই জানাচ্ছেন তাঁরা। তাই সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আর্জি করেছেন বলে জানান নিরুপম। তিনি বলেন, ‘‘আশায় রয়েছি যে সরকার ফের বিষয়টি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করবে। তাই অর্থমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছি। অধিবেশন শেষ হওয়ার আগে আমাদের বিষয়টি নিয়ে সুরাহা হবে, এই আশা করছি।’’
এর সঙ্গে গত প্রায় দু’দশক ধরে সমগ্র শিক্ষা মিশন (তৎকালীন সর্বশিক্ষা মিশন) প্রকল্পের অধীনে রাজ্যের জেলা স্কুল পরিদর্শকের অফিসে বা সার্কেল অফিসে কাজ করছেন প্রায় আড়াই হাজার কর্মচারী। কেউ সহ-ইঞ্জিনিয়ার, কেউ আধিকারিক পদে রয়েছেন। আবার গ্রুপ-সি এবং গ্রুপ-ডি কর্মীরাও রয়েছেন। দাবি, একসময় প্রতি বছর তাঁদের চুক্তির পুনর্নবীকরণ হত। কিন্তু ২০১৬ সালে সেই চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয় ৬০ বছর পর্যন্ত। ২০১৮ সালে এক বার ৪০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। তার পর থেকে আর কোনও বৃদ্ধি হয়নি। অভিযোগ, প্রতি বছর জেলা স্তরের স্কুলশিক্ষা দফতরের যাবতীয় কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁদের। কিন্তু বেতন নগণ্য। গ্রুপ-ডি পদমর্যাদার কর্মীদের বেতন ১০-১১ হাজার টাকায় আটকে রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান বাজারমূল্যে এই বেতনে সংসার চালানো সম্ভব নয়।
পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশনের ম্যানেজমেন্ট কর্মীদের তরফে সন্তু মুখোপাধ্যায় জানান, তাঁদের বঞ্চনার কথা সরকারকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু বাজেটে তাঁদের অবস্থা ফেরানোর কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি। সরকারের কাছে ফের তাঁরা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছেন।