নদিয়ার বাসিন্দা মনীষা চক্রবর্তী জীবনবিজ্ঞানের শিক্ষিকা হিসাবে কাজ করতেন বাঁকুড়ার এক স্কুলে। দু’বছরের সন্তানকে নিয়েই কাজে যেতেন। মায়ের স্কুলেই এ দিক সে দিক ঘুরে বেড়াত ছোট্ট ছেলে। আর ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে পেত মায়ের দেখা।
২০১৬-এ মনীষা স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিয়ে পেলেন নতুন স্কুলে পড়ানোর চিঠি। বদলি হয়ে এলেন নদিয়ার একটি স্কুলে। মনে হয়েছিল, এত দিনে সুরাহা হল সংসারে। ছোট্ট ছেলেটি একসঙ্গে পেল বাবা, মা-কে।
কিন্তু গত বছর এপ্রিলে খোয়াতে হয়ে সে চাকরি। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির দায়ে বাতিল হয়েছে সে বছরের পুরো প্যানেল। তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মনীষাকে চাকরি হারাতে হয়নি। বরং তিনি ফিরে গিয়েছেন পুরনো স্কুলে— বাড়ি থেকে ২২০ কিলোমিটার দূরে, বাঁকুড়ায়।
একই পরিস্থিতি কলকাতার সরশুনা এলাকার বাসিন্দা প্রতাপ মিত্রের। ২০১১-এ তিনি প্রথম স্কুল শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছিলেন দক্ষিণ দিনাজপুরের পতিরাম হাই স্কুলে। ২০১৬-এ পরীক্ষা দিয়ে সুযোগ পান হুগলির হরিপালের একটি স্কুলে। তার পর উৎসশ্রী পোর্টালে আবেদন করে বদলি হন। তাঁর নতুন কর্মস্থল হয়, বাড়ির একেবারে কাছে সরশুনা হাই স্কুল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১৬ প্যানেল বাতিল হওয়ায় সেই চাকরি হারাতে হয়েছে তাঁকেও। সরকার প্রতাপকে ফিরিয়ে দিয়েছে ৪০০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ দিনাজপুরের স্কুলে।
বিকাশ ভবনে স্মারকলিপি শিক্ষকদের। নিজস্ব চিত্র।
পুরনো চাকরিতে ফিরে যাওয়া স্কুলশিক্ষকদের বেশির ভাগই অভিযোগ করেছেন, তাঁদের বাড়ি থেকে বহু দূরের স্কুলে কাজ করতে পাঠানো হচ্ছে। এত বছর পর অত দূরের স্কুলে কাজ করতে যাওয়া নানা সমস্যা রয়েছে। প্রথমত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বয়স বেড়েছে ১০ বছর। কারও পরিবারে রয়েছেন বয়স্ক বাবা-মা। ১০ বছর পর তাঁদের ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে থাকায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কারও সন্তানের প়ড়াশোনা রয়েছে।
যেমন মনীষার ছেলের এখন ১২ বছর বয়স। নদিয়ার স্কুলে পড়ে সে। মনীষা বলেন, “সোমবার ভোর ৫টায় বাড়ি থেকে বেরোই। ট্রেনে চাকদহ, নৈহাটি, ব্যান্ডেল হয়ে ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস ধরে রানিগঞ্জ পৌঁছে সহ-শিক্ষকের মোটরবাইকে চড়ে স্কুলে পৌঁছতে হয়। সে রাতে আর বাড়ি ফিরতে পারি না। একটি ভাড়া বাড়িতে থেকে কয়েক দিন স্কুল করে আবার বাড়ি ফিরি। ছেলে এখন একাই বড় হচ্ছে। স্বামীও নদিয়ার একটি স্কুলে পড়ান।” তাঁর দাবি, দু’বারই পরীক্ষা দিয়ে সফল হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি তাঁর সংসারও নষ্ট করে দিল।
অন্য দিকে প্রতাপ বলেন, “সরশুনা স্কুলেই পোস্টিং দিতে হবে না। কিন্তু বাড়ি থেকে যাতায়াত করা যায়, অন্তত এমন কোনও স্কুলে বদলির ব্যবস্থা করুক সরকার। আমাদের তো কোনও দোষ নেই, অথচ, ভুগতে হচ্ছে আমাদেরই।”
সোমবার, বাড়ির কাছে বদলির দাবি জানিয়ে বিকাশ ভবনে মনীষা, প্রতাপের মতো বহু শিক্ষক স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতি-র তরফে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডলের দাবি, “এই শিক্ষক-শিক্ষিকারা কোনও ভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। এত বছর পর তাঁরা কেন দায় বহন করবেন? সরকারের উচিত অবিলম্বে প্রশাসনিক বদলি পদ্ধতি ব্যবহার করে বাড়ির কাছাকাছি কোনও স্কুলে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া।