Advertisement
E-Paper

টলি-সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরব ইম্পা

জোটের দাপটে ভোটের হাওয়া খানিকটা এলোমেলো হতেই মুখ খোলা শুরু। নির্বাচন কমিশনের বরাভয় পেয়ে রাজ্য পুলিশ শিরদাঁড়া সোজা করে দেখিয়েছে। হলদিয়ার তেল শোধন কারখানায় শাসকের নজরদারির সামনে মাথা না-নুইয়ে রুখে দাঁড়িয়েছেন শ্রমিকরা। বিনোদন জগতও এ বার শাসকের জুলুম নিয়ে এককাট্টা হয়ে মুখ খুলছে।

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০১৬ ০৩:৫৯

জোটের দাপটে ভোটের হাওয়া খানিকটা এলোমেলো হতেই মুখ খোলা শুরু।

নির্বাচন কমিশনের বরাভয় পেয়ে রাজ্য পুলিশ শিরদাঁড়া সোজা করে দেখিয়েছে। হলদিয়ার তেল শোধন কারখানায় শাসকের নজরদারির সামনে মাথা না-নুইয়ে রুখে দাঁড়িয়েছেন শ্রমিকরা। বিনোদন জগতও এ বার শাসকের জুলুম নিয়ে এককাট্টা হয়ে মুখ খুলছে। সোমবার প্রযোজকদের সংগঠন ইম্পা-র সঙ্গে কলাকুশলীদের সংগঠনের বৈঠকে সেই বিরল দৃশ্যই দেখা গেল।

শাসক দলের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ফেডারেশন অব সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’র জুলুমবাজি নিয়ে আড়ালে-আবডালে অনেক দিনই ফোঁসফোঁস করতেন প্রযোজকরা। মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই, ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস অনেকটা ইমারতি ব্যবসার সিন্ডিকেটের ধাঁচেই ইন্ডাস্ট্রিতে কলাকুশলী সরবরাহের সিন্ডিকেট ফেঁদে বসেছেন বলে অভিযোগ। তাঁর ঠিক করে দেওয়া ‘কোটা’ মেনে কলাকুশলী না-নিয়ে বহু শ্যুটিং‌ হোঁচট খেয়েছে। টালিগঞ্জের একাধিক প্রযোজক-পরিচালকের অভিজ্ঞতা, এখন আউটডোর শ্যুটিং থাকলেও ফেডারেশন আলো বসানোর ‘ক্যাটওয়াক’ তৈরির লোক নিতে বাধ্য করে কিংবা ট্রলি দরকার না-হলেও ট্রলি সেট করতে কোন কলাকুশলীকে নিয়ে যেতে হবে বলে দেয়।

এ সব ঘটনা কোনওটাই নতুন নয়। নতুন ব্যাপার একটাই। এত দিনে এগুলো নিয়ে খোলাখুলি গলা তুললেন প্রযোজকেরা এবং সেখানে পারস্পরিক রেষারেষি দূরে রেখে পরস্পরের পাশে দাঁড়ালেন টালিগঞ্জের ভিন্ন মেরুর প্রযোজকরাও। এস কে মুভিজ-এর কর্ণধার অশোক ধানুকা ফেডারেশনের ফরমানের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন বলে তাঁকে কোণঠাসা করতে চেয়েছিল স্বরূপ-শিবির। এ দিন তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ধানুকার পাশে দাঁড়ায় শাসক দলের ঘনিষ্ঠ ভেঙ্কটেশ-গোষ্ঠী।

বৈঠকে হাজির ইন্ডাস্ট্রি-সদস্যদের সূ্ত্রে জানা গিয়েছে, স্বরূপ বিশ্বাসের উপস্থিতিতে কলাকুশলীদের সঙ্গে প্রযোজক-পরিচালকদের কথা কাটাকাটি এ দিন এতটাই তুঙ্গে ওঠে যে, শেষমেশ মিটিং পণ্ড হয়ে যায়। দু’পক্ষের তরজা তর্কাতর্কি থেকে শুরু হয়ে গালাগালির পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ফেডারেশনের কেউ কেউ তো ঘুষি পাকাতেও শুরু করেছিলেন বলে অভিযোগ। স্বরূপ নিজে অবশ্য এই উত্তপ্ত চাপান-উতোরের কথা স্বীকার করেননি। আর শাসক দলের বিদায়ী মন্ত্রী তথা টালিগঞ্জ কেন্দ্রের প্রার্থী অরূপ বলেন, ‘‘এ সব মিটিংয়ের খবর আমার জানা নেই।’’ কিন্তু জনৈক তরুণ প্রযোজকের কথায়, ‘‘স্বরূপের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি গিল্ডের নেতা টেবিল চাপড়ে অভব্য ব্যবহার করলে বাধ্য হয়ে ওঁদের বেরিয়ে যেতে বলি। ফলে মিটিংটাই বন্ধ হয়ে যায়।’’

ভেঙ্কটেশের কর্ণধার শ্রীকান্ত মোহতাই এখন ইম্পা-র সভাপতি। ভোটে দাঁড় করানোর জন্য তারকা সরবরাহ করা বা শাসকের প্রচারে নায়ক-নায়িকাদের হাজির করানোর পিছনে এই শ্রীকান্তেরই হাতযশ থাকে বলে শোনা যায়। কিন্তু এ হেন শ্রীকান্তও ইদানীং ফেডারেশনের একতরফা জুলুমে ক্ষিপ্ত বলে খবর। সম্প্রতি তুরস্কে দেবকে নিয়ে ভেঙ্কটেশের একটি শ্যুটিংয়ে স্বরূপ কলাকুশলী নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি করেছিলেন, অভিযোগ এমনই। আর ধানুকা তো ধারাবাহিক ভাবে কখনও লন্ডনে, কখনও বোলপুরে শ্যুটিং করতে গিয়ে কলাকুশলী বাছাই নিয়ে ফেডারেশনের তোপের মুখে পড়েছেন। সূত্রের খবর, এ দিন শ্রীকান্ত আর ধানুকার শিবির এককাট্টা হয়ে প্রতিবাদে সামিল হন।

শুধু শ্রীকান্ত নন। বাম-শিবির ছেড়ে মমতার ঘনিষ্ঠ বৃত্তে ঢুকে পড়া অরিন্দম শীলও এ দিন স্বরূপ-বাহিনীর চালচলন নিয়ে আপত্তি তোলেন বলে মিটিংয়ের ভিতরকার লোকেরা জানিয়েছেন। অরিন্দম শীল, রাজ চক্রবর্তী প্রমুখ সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা ভোটে মমতার হয়েই প্রচারে গিয়েছিলেন। এ দিনও তাঁরা স্বরূপ-বাহিনীকে বলতে চেষ্টা করেন যে, মমতা চান না শ্যুটিং বন্ধ হোক ! তাতেই চেঁচামেচির মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের। সূত্রের খবর, রাজ চক্রবর্তী কথা বলার সময়ে ফেডারেশনের কয়েক জন সদস্য অভব্যতা শুরু করেন। তার পরেই মিটিং ভেস্তে যায়। ফেডারেশনের বিভিন্ন গিল্ডেই এখন স্বরূপের লোক ছেয়ে গিয়েছে। এদের মধ্যে ট্রলি সেটিং, আর্ট সেটিং বা ড্রাইভার গিল্ডের মতো কয়েকটি সংগঠনে ‘বাড়াবাড়ি’ নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। এ দিনও ওই গিল্ডের লোকেরাই গোলমাল বাধান।

শ্রীকান্ত, অরিন্দম বা রাজ— কেউই অবশ্য পরে সংবাদমাধ্যমকে কিছু বলতে চাননি। অশোক ধানুকা শুধু বলেছেন, ‘‘আশা করব, পরের বৈঠকে আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান বেরোবে।’’ কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির ভিতরের একাধিক সূত্র বলছে, স্বরূপ-বাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযোগ মমতার কানেও তুলেছেন শ্রীকান্তরা।

টলিউডি সিন্ডিকেটের এই হাঁকডাক অজানা নয় ইন্ডাস্ট্রির কারওরই। ২০১২ সালে অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীর ‘অপরাজিতা তুমি’ ছবির জন্য আমেরিকায় শ্যুটিং-পর্বে তাদের পছন্দসই কলাকুশলী নিয়ে যাওয়া হয়নি বলে স্বরূপ-বাহিনী পরে তাঁকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ। ফেডারেশনের ‘অত্যাচারে’র আর এক ভুক্তভোগী বলিউডের অনির। চৌরঙ্গা ছবিটির জন্য তাঁকে বেশি টাকায় অকারণে অতিরিক্ত কলাকুশলী নিয়ে কাজ করতে বলা হয় বলে টালিগঞ্জ সূত্রের খবর। অনিরের কথায়, ‘‘আমার যা অভিজ্ঞতা, প্রযোজকের বেশি রেস্ত না-থাকলে বাংলায় শ্যুটিং করা যে কোনও পরিচালকের পক্ষেই কষ্টকর।’’ এ ভাবেই চলছিল। কিন্তু ভোটের বাজারে দমকা হাওয়ায় চিত্রনাট্যে টুইস্ট! চাপা পড়া কথারা তাই মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে পড়ছে।

assembly election 2016 EIMPA
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy