E-Paper

শেষ পর্যন্ত রাজ্যের নেত্রী

খন স্পষ্ট হয়ে গেল যে, অনুষ্ঠানটি মোটের উপরে ব্যর্থ হতে চলেছে, তখন অণ্ণা হজারে তার সঙ্গে নিজেকে জড়াতে সম্মত হলেন না।

অপূর্বানন্দ

শেষ আপডেট: ২৪ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫২
একা: দিল্লির রামলীলা ময়দানের জনসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১২ মার্চ ২০১৪।

একা: দিল্লির রামলীলা ময়দানের জনসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১২ মার্চ ২০১৪।

এক যুগ আগের কথা— ২০১৪ সালের মার্চ। লোকসভা নির্বাচন আসন্নপ্রায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন, তিনি দিল্লির রামলীলা ময়দানে একটি সমাবেশ করবেন। সভাটির অভীষ্ট ছিল জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর চূড়ান্ত অভ্যুদয়ের বার্তা দেওয়া— অণ্ণা হজারে কথা দিয়েছিলেন, তিনি মমতার সঙ্গে এই মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন। বিপুল জল্পনা ছিল, এই সমাবেশই মমতাকে ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তুলে ধরবে। মমতাও নিশ্চয়ই মনে করেছিলেন যে, অণ্ণা হজারের সমর্থন পেলে ভারতের মানুষের— বিশেষত উত্তর ভারতের— মন ও মানসে প্রবেশ করা তাঁর পক্ষে সহজ হবে। ভুললে চলবে না, অনেকেই সে সময় হজারেকে ‘দ্বিতীয় গান্ধী’ বলে অভিহিত করেছিলেন। অণ্ণার মধ্যে মমতা স্পষ্টতই দেখেছিলেন এক ধরনের নৈতিক বৈধতার উৎস— এমন এক জন ব্যক্তিত্ব, যার উপস্থিতি তাঁকে ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় মঞ্চে স্থাপন করতে পারে।

কিন্তু সমাবেশটি শেষ পর্যন্ত এক লজ্জাজনক ঘটনায় পরিণত হল। বড় জোর হাজার দুয়েক মানুষ হাজির হলেন। যখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে, অনুষ্ঠানটি মোটের উপরে ব্যর্থ হতে চলেছে, তখন অণ্ণা হজারে তার সঙ্গে নিজেকে জড়াতে সম্মত হলেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তখন দ্বিগুণ অপমানের মুখে পড়তে হল— এক দিকে অণ্ণার মঞ্চে উঠতে অস্বীকৃতি, অন্য দিকে দিল্লির জনতার স্পষ্ট অনাগ্রহ। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি বলেছিলেন, এটি নাকি তাঁর সমাবেশই নয়; কলকাতায় চাইলে তিনি পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ জড়ো করতে পারেন। অন্য দিকে অণ্ণা হজারে— যিনি কয়েক দিন আগেও মুক্তকণ্ঠে মমতার প্রশংসা করেছিলেন— হঠাৎই সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলেন। জানালেন, মমতা দুর্নীতিগ্রস্ত লোকজন দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকায় তিনি আর তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারবেন না। ঘটনাটি ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য স্পষ্ট ও তীব্র অপমানের।

ফলে নরেন্দ্র মোদীকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম এক সর্বভারতীয় নেতা হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জাতীয় মঞ্চে আবির্ভাবের যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছিল, তা ঠিক ভাবে শুরু হওয়ার আগেই কার্যত শেষ হয়ে গেল। কিন্তু, এই ঘটনাটিতে তাঁর রাজনৈতিক বোধের একটি সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পেয়েছিল। বিস্ময়কর ভাবে তিনি বুঝতে পারেননি যে, যখন তিনি অণ্ণা হজারেকে তাঁর পাশে পেতে মরিয়া, তত দিনে ‘ইন্ডিয়া এগেনস্ট করাপশন’ আন্দোলন অতীত হয়ে গেছে। জনমানসে এই আন্দোলনকে ঘিরে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, অরবিন্দ কেজরীওয়ালের আম আদমি পার্টির জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। দিল্লির রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র তখন কেজরীওয়াল, অণ্ণা হজারে নন।

অণ্ণার আশীর্বাদ পেতে মমতার অত্যুৎসাহ এই ইঙ্গিত দেয় যে, তিনি ইন্ডিয়া এগেনস্ট করাপশনের আন্দোলনকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক নাট্যের মনোযোগী পর্যবেক্ষক ছিলেন না। তত দিনে অনেকেই বলতে শুরু করেছিলেন যে, আন্দোলনের প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ছিলেন কেজরীওয়াল; অণ্ণা ছিলেন তার প্রতীকী মুখমাত্র, স্থপতি নন। রালেগাঁও সিদ্ধির অপরিচিত পরিসর থেকে হজারেকে দিল্লির রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চে তুলে এনে আইএসি আন্দোলনের প্রতীক করে তুলেছিলেন কেজরীওয়ালই। সেই পরিস্থিতিতে কেবল অণ্ণার সমর্থন অর্জনের জন্য রাজনৈতিক শক্তি ব্যয় করা সম্ভবত সুবিবেচনার পরিচয় ছিল না।

এই ব্যর্থতার পরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। শোনা গিয়েছিল, তিনি মায়াবতী ও এআইএডিএমকে-র মতো রাজনৈতিক শক্তিগুলির সঙ্গে কথাবার্তা চালাচ্ছেন। কিন্তু, অল্প দিনের মধ্যেই তিনি সম্ভবত উপলব্ধি করেন যে, সর্বভারতীয় রাজনৈতিক পরিসরটি যেমন তাঁর অচেনা, তেমনই সেই পরিসরটিকে নিয়ন্ত্রণ করাও তাঁর সাধ্যাতীত। ফলে তিনি ফের মন দিলেন সেই রাজনৈতিক ভূখণ্ডে, যেটি তাঁর নিজের হাতের তালুর চেয়েও বেশি চেনা— পশ্চিমবঙ্গ।

মহীরুহ পতন ঘটাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগ্যতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। সিপিএম-এর নেতৃত্বাধীন বাম ফ্রন্টকে ধরাশায়ী করা কোনও ছোট সাফল্য ছিল না— দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটার আগে পর্যন্ত সমাজের গভীরে প্রোথিত সেই শক্তিকে অপ্রতিরোধ্য বলেই মনে করা হত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাম ফ্রন্টকে দুর্বল করে দেয় তাদেরই ঔদ্ধত্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বাম রাজনীতির এক অতি মনোযোগী ছাত্র। অনেক দিক থেকেই তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন বামপন্থী রাজনীতির আদলে— সেই রাজনীতির ভাষা, রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করে। সেই অস্ত্র দিয়েই তিনি তাদের পরাজিত করেছিলেন। কিন্তু সেখানেই তিনি থেমে থাকেননি। বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে বাম শক্তিকে তিনি প্রায় কঙ্কালসার করে ফেলেছেন; এখন তারা তাঁর কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার অবস্থায় নেই বললেই চলে।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর তৃতীয় মেয়াদে তিনি প্রায় নিরঙ্কুশ। তবু এটাও অস্বীকার করা যায় না যে এখন বিজেপি সেই অবস্থানটি দখল করেছে, বাম ফ্রন্টের শেষ পর্বে যে অবস্থানে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। এক শক্তিশালী প্রতিস্পর্ধীর অবস্থান, যা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার পায়ের তলায় মাটি কাঁপিয়ে দিতে পারে।

মুসলমানদের উদ্দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বার বার যে আশ্বাস দিয়ে চলেছেন, অর্থাৎ তাঁর জন্যই মুসলমানরা পশ্চিমবঙ্গে নিরাপদ— তার মধ্যেও এক ধরনের উদ্বেগের সুর ধরা পড়ে। এই ধরনের বক্তব্য আশ্বাসের চেয়ে অনেক সময় চেতাবনির মতো শোনাতে পারে। বাম ফ্রন্টও এক সময় প্রায় একই ভাষা ব্যবহার করত। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের ভূমি আন্দোলনে মুসলমান কৃষকেরা যোগ দেওয়ায় বাম ফ্রন্ট ক্ষুব্ধ হয়েছিল। তিন দশক ধরে সাম্প্রদায়িক হিংসা থেকে রক্ষা করার দাবি করা যে শাসনব্যবস্থা, তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দিয়ে তাঁরা নাকি অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন— এমন অভিযোগ উঠেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও যেন একই ভাবে মুসলমানদের কাছে দাবি করছেন— গত পনেরো বছরে তিনি যে নিরাপত্তা দিয়েছেন বলে দাবি করেন, তার বিনিময়ে তাঁরা যেন নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার বিসর্জন দেন।

অন্য দিকে, এ কথাও একই রকম অনস্বীকার্য যে, বিজেপির কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক অদম্য রাজনৈতিক শক্তি। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত, এবং ‘এসআইআর-এর চক্রান্ত’-র প্রতিবাদে তাঁর ধরনায় স্পষ্ট করে যে, তাঁকে সহজে ভয় দেখানো যায় না।

তবু তাঁর দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা সত্ত্বেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও সর্বভারতীয় রাজনৈতিক বিবেচনার পরিসরে তেমন ভাবে প্রবেশ করতে পারেননি। জনমানসে তিনি এখনও এক শক্তিশালী কিন্তু মূলত প্রাদেশিক বাঙালি নেত্রী হিসাবেই রয়ে গেছেন। বিভিন্ন পর্বে তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতিতে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুই রাজনৈতিক জোটেরই অংশ ছিলেন— এনডিএ এবং ইউপিএ— কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আজ তিনি ইন্ডিয়া জোটের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু সেখানে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার ব্যাপারে তাঁর উৎসাহ খুব বেশি দেখা যায় না। ঘন ঘন নিজের বাঙালি পরিচিতিকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসা, এবং তথাকথিত ‘জাতীয়’ প্রশ্নে স্পষ্ট অনাগ্রহও তাঁর বিরুদ্ধে কাজ করেছে।

এখন কি তিনি সর্বভারতীয় ভূমিকা নিতে পারবেন? সে সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে হয়। তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিটি দৃঢ় ভাবে বাংলার সীমানার মধ্যে বাঁধা। তিনি সেই পরিচিতি ভেঙে বেরোতে পারেননি। নিজের রাজ্যের বাইরে গিয়ে প্রতিবেশী অঞ্চলে— বিহার, ঝাড়খণ্ড, বা ওড়িশায়— স্থানীয় রাজনৈতিক প্রশ্নে জনসংযোগ গড়ে তোলার উদ্যোগও তিনি তেমন ভাবে করেননি। কেরল, তামিলনাড়ু বা কর্নাটকের মতো রাজ্য তাঁর রাজনৈতিক কল্পনায় প্রায় অনুপস্থিত। এমনকি অসম বা ত্রিপুরাতেও তাঁকে মূলত বাঙালি স্বার্থের প্রতিনিধি হিসাবেই দেখা হয়।

সত্যি বলতে, মমতা নিজেই জাতীয় রাজনীতিতে নিজের জন্য দ্বিতীয় সারির ভূমিকা বেছে নিয়েছেন। সংসদে তাঁর সংখ্যার জোরকে ব্যবহার করেছেন মূলত রাজ্যের জন্য জাতীয় বরাদ্দের অংশ বাড়ানোর দর-কষাকষির অস্ত্র হিসাবে। এই মুহূর্তে যখন সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এক বিকল্প নেতার খোঁজ চলছে, তখন দেখা যাচ্ছে যে, সেই শূন্যস্থান পূরণ করার মতো রাজনৈতিক পুঁজি মমতার হাতে নেই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Anna Hazare Ramlila Maidan

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy