Advertisement

নবান্ন অভিযান

প্রায় দু’মাস ধরে কলকাতায় ঘাঁটি গেড়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী ব্যবস্থাপনা মসৃণ রাখছেন শাহের প্রতিমন্ত্রী! গণনা মিটিয়ে ফিরবেন দিল্লিতে

তিন বছর আট মাস আগে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাংগঠনিক পর্যবেক্ষক হিসাবে সুনীল বনসলের নাম ঘোষিত হয়েছিল। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ দায়িত্ব বুঝে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সংগঠনকে ‘শূন্য থেকে শুরু’ করার কাজ হাতে নিয়েছিলেন তিনি।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ২২:৪৩
(বাঁ দিক থেকে) নিত্যানন্দ রাই, সুনীল বনসল ও ভূপেন্দ্র যাদব।

(বাঁ দিক থেকে) নিত্যানন্দ রাই, সুনীল বনসল ও ভূপেন্দ্র যাদব। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

প্রথমে সংগঠন গুছিয়ে নেওয়া। তার পরে জনসংযোগ বাড়ানো। শেষ ধাপে প্রচার তুঙ্গে তোলা। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এ বার এ ভাবেই ধাপে ধাপে কৌশল সাজিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু ধাপ বা কৌশল সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। ভোটগ্রহণ মিটলেও ভোটগণনা এখনও বাকি। তাই কৌশল বাস্তবায়নের শেষ ধাপও বাকি। যাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অমিত শাহের ‘ডেপুটি’। দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণের আগেই পশ্চিমবঙ্গ ছেড়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু রেখে গিয়েছেন নিজের প্রতিমন্ত্রীকে। গত প্রায় দু’মাস ধরে তিনি প্রায় নিঃশব্দে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যবস্থাপনা দেখভাল করছেন। গণনা পর্বেও দিনভর তীক্ষ্ণ নজর রাখার জন্য কলকাতাতেই রয়ে গিয়েছেন নিত্যানন্দ রাই।

তিন বছর আট মাস আগে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাংগঠনিক পর্যবেক্ষক হিসাবে সুনীল বনসলের নাম ঘোষিত হয়েছিল। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ দায়িত্ব বুঝে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সংগঠনকে ‘শূন্য থেকে শুরু’ করার কাজ হাতে নিয়েছিলেন তিনি। আর নির্বাচনী রণকৌশল রচনার ক্ষেত্রে তাঁকে সঙ্গত করার জন্য ভোট ঘোষণার মাস ছয়েক আগে পশ্চিমবঙ্গের ‘নির্বাচন প্রভারী’ এবং ‘সহকারী প্রভারী’ হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছিল ভূপেন্দ্র যাদব এবং বিপ্লব দেবকে। বনসল পুরোপুরি আড়ালে থেকে কাজ করছিলেন। কখনও ‘সদস্যতা অভিযান’, কখনও ‘বুথ সশক্তিকরণ’ আবার কখনও ‘কমল মেলা’ আয়োজনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সংগঠনকে জাগিয়ে তুলছিলেন। ভূপেন্দ্রও পশ্চিমবঙ্গে এসে প্রথম চার মাস নিজেকে সম্পূর্ণ আড়ালে রেখে রাজ্যের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত চষে ফেলছিলেন। বাঙালি নেতা তথা ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লবকে বরং কিছুটা সামনে ঠেলে দিয়েছিলেন প্রকাশ্য কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। পশ্চিমবঙ্গে যে জেলা বিজেপির জন্য সবচেয়ে কঠিন ঠাঁই, সেই দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ‘পরিবর্তন যাত্রা’র নেতৃত্ব দিয়ে বিপ্লব দলের অন্দরে প্রশংসাও কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু গত দু’মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আরও এক জন সক্রিয়। তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিত্যানন্দ। এতটাই আড়ালে থেকে সব কিছু সামলেছেন তিনি যে, ভোটগ্রহণ পর্ব মিটে যাওয়ার আগে পর্যন্ত নিত্যানন্দের সক্রিয়তার কথা ঘুণাক্ষরেও কেউ টের পাননি।

এ বারের নির্বাচনে প্রচার পর্ব মোটের উপরে নির্বিঘ্নে মিটেছে। দু’দফা ভোটও প্রায় শান্তিতেই হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রশ্নে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নানা মহলের প্রশংসা পাচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় বাহিনীর গতিবিধি, বাহিনীর উপযুক্ত ব্যবহার তথা ব্যবস্থাপনার উপরে নিরন্তর নজরদারি যে নিত্যানন্দ চালিয়ে গিয়েছেন, তা কেউ সে ভাবে জানতেই পারেননি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে শাহের ‘ডেপুটি’ কলকাতায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকছেন। তাঁর নজরদারি তথা তত্ত্বাবধানে প্রচার এবং ভোটগ্রহণ প্রাণহানি ছাড়াই মিটেছে। গণনাকেও তেমনই নির্বিঘ্ন রাখা এখন নিত্যানন্দের কাছে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ। স্ট্রংরুম এবং গণনাকেন্দ্রগুলির নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করতে নির্বাচন কমিশন তথা প্রশাসন সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপরেই। আর সে কাজে যাতে কোনও বিঘ্ন না ঘটে, কলকাতায় বসে থেকে তা নিশ্চিত করছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

প্রথম দফার ভোটগ্রহণের দিনে শাহ পশ্চিমবঙ্গেই ছিলেন। দ্বিতীয় দফায় তিনি অবশ্য কলকাতায় আর ছিলেন না। গণনার আগে শাহ আবার কলকাতায় ফিরবেন কি না, গণনা নির্বিঘ্ন রাখতে তিনি কলকাতায় বসে থেকে নজরদারি করবেন কি না, তা নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু বিজেপি সূত্রের খবর, গণনার আগে শাহ আর কলকাতায় আসছেন না। তবে নিজের মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রীকে তিনি কলকাতাতেই রেখে গিয়েছেন। গণনা নির্বিঘ্নে মিটিয়েই তিনি দিল্লি ফিরবেন।

গণনা পর্ব নির্বিঘ্নে মেটানোর আগে পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাঁবু গোটানোর কথা বনসল বা ভূপেন্দ্রও ভাবছেন না। গত ছ’মাসে এই জুটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আবহাওয়া কী ভাবে বদলে দিয়েছেন, তা নিয়ে বিজেপির অন্দরেও এ বার আলোচনা শুরু হয়েছে। ছ’মাস আগেও তৃণমূল নেতৃত্ব আত্মবিশ্বাসের হাসি নিয়ে বলেছিলেন যে, বিজেপি ৫০টি আসন পাবে না। কিন্তু ভোটগ্রহণ মিটে যাওয়ার পরে আড়ালে আবডালে তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মীই নানা মহলে খোঁজখবর নিচ্ছেন, সরকার টিকে যাবে কি না নিশ্চিত ভাবে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। মাত্র ছ’মাসে রাজ্যের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় এই বদল আমার প্রধান কারিগর বনসল এবং ভূপেন্দ্র বলেই রাজ্য বিজেপির অধিকাংশ নেতানেত্রী মেনে নিচ্ছেন।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে বিজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরু করে দিয়েছিল। শুরু হয়েছিল প্রতিটি মণ্ডলে পথসভা আয়োজনের মাধ্যমে। তার পরে পরীক্ষার মরসুমে মাইক বাজানোয় বিধিনিষেধ আরোপ হয়। তখন এক মাস ধরে বুথে বুথে ‘উঠোন বৈঠক’ গোছের কর্মসূচি শুরু করে বিজেপি। সে সময়েই স্লোগান তোলা হয়— বাঁচতে চাই, বিজেপি তাই। মার্চ মাসে শুরু হয় পরিবর্তন যাত্রা। ১ থেকে ১০ মার্চ রাজ্য জুড়ে সে কর্মসূচি চলে। আর তার পরিসমাপ্তি হয় ১৪ মার্চ ব্রিগেড সমাবেশের মাধ্যমে। সে সমাবেশে নজরকাড়া ভিড় জমিয়েছিল বিজেপি।

ভোট ঘোষণার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ১৯টি জনসভা করেন রাজ‍্যের নানা প্রান্তে। তিনটি রোড শো-ও করেন। আর শাহ করেন ৪০টি সভা। বেশ কিছু রোড শো। বিজেপি-কে ‘বাঙালি বিরোধী’ বলে তৃণমূল যে আক্রমণ শুরু করেছিল, বিজেপি সরাসরি তর্কে জড়িয়ে তার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কখনও রাস্তার ধারে ঝালমুড়ি খেয়ে, কখনও গঙ্গায় নৌকাবিহার করে, কখনও ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে পুজো দিয়ে বাঙালিয়ানার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্তির বার্তা দিতে থাকেন। বিজেপি মনে করছে, প্রধানমন্ত্রীর তৈরি করা এই সব ‘চমক’ তৃণমূলের প্রচারের ধারকে ভোঁতা করেছিল। পশ্চিমবঙ্গে প্রচার শেষ হয়ে যাওয়ার পরে সিকিমে গিয়ে বাঙালির ফুটবল আবেগকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেন মোদী। পাহাড়ি রাজ্যের গিয়ে জার্সি পরে মাঠে নেমে ফুটবল খেলার ছবি সিকিমবাসীর চেয়ে পশ্চিমবঙ্গবাসীকেই বেশি ছুঁয়েছে বলে রাজ‍্য বিজেপি মনে করছে।

সব শেষে ছিল মাতৃশক্তি এবং যুবশক্তি ‘ভরসা কার্ড’ প্রকাশ। ক্ষমতায় এলে মহিলাদের জন‍্য এবং বেকার যুবক-যুবতীদের জন‍্য মাসে ৩০০০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার কথা ইস্তেহারেই বিজেপি ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সে ঘোষণার প্রতি জনতার বিশ্বাস দৃঢ় করতে বিজেপি ফর্ম পূরণ করানো শুরু করে। ফর্ম পূরণ করে যাঁরা কার্ড নিয়ে যাচ্ছেন, বিজেপি জিতলে তাঁরা প্রত‍্যেকে মাসে ৩০০০ টাকা করে ভাতা পাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া শুরু হয়। শাহের নজরদারিতে এবং বনসল-ভূপেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে এত রকম কাজ গত ছ’মাসে ‘সফল’ ভাবে করা গিয়েছে বলেই রাজনৈতিক আবহাওয়া বদলানো গিয়েছে। মানছেন রাজ্য বিজেপির প্রায় সকলেই।

সংক্ষেপে
  • প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
  • ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
Nityanand Rai CAPF Home Ministry
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy