Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৮ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

অমিত শাহের সঙ্গে আলাপে আনন্দবাজার ডিজিটাল, সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অভীক সরকার

‘সিঙ্গুর? নন্দীগ্রাম? ছুটকো-ছাটকা প্রতীকী কাজে পরিবর্তন হয় না’

১২ এপ্রিল ২০২১ ০৮:৫৫

আনন্দবাজার ডিজিটাল: এই নির্বাচনে তো আপনার একটা লাভ হয়েছে। গোটা বাংলাটা দেখে নিতে পেরেছেন।
(হাসিমুখে মাথা নাড়লেন)
এটা বাংলায় আপনার কততম সফর?
অমিত শাহ: একবার খুব ছোটবেলায় গঙ্গাসাগরের মেলায় গিয়েছিলাম। কিন্তু বাংলা ঘুরে দেখেছি ২০১৬ সাল থেকে। বাংলার সমস্ত জেলা আমার ঘোরা হয়ে গিয়েছে। ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ তহসিলে গিয়েছি। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল, গোটা দেশটা ঘুরে দেখব। ঈশ্বরের দয়ায় আমি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি হয়েছিলাম। সারা দেশের প্রায় ৯৩ শতাংশ জেলায় ঘুরেছি। পশ্চিমবঙ্গ নিয়েও একটা আকর্ষণ তো ছিলই। স্বামী বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ পরমহংস, চৈতন্য মহাপ্রভু— এঁরা সব সময় সারা দেশের মানুষকে বাংলায় টেনে নিয়ে এসেছেন। সাহিত্যের কথা বললে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এঁদের লেখা পড়েছি। আর এঁদের সম্পর্কে আরও জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখানে আসার সুযোগ তখন খুব একটা হয়নি।

তা হলে তো বিজেপি এখানে নতুন সরকার গড়লে আপনি পর্যটনমন্ত্রী হয়ে যেতে পারেন!

হা-হা-হা। পর্যটনমন্ত্রী কে হবেন, সেটা আমি বলতে পারব না। নতুন মুখ্যমন্ত্রী সেটা ঠিক করবেন।

Advertisement

পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের আকর্ষণ কি কমে গিয়েছে?

এটা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি যে, বাংলার আধ্যাত্মিক চেতনা, সাহিত্যচেতনা এবং দেশভক্তি সারা দেশের কাছে চরম পরাকাষ্ঠা বলে মনে করা হত। এই তিনটি বিষয়কে প্রথমে কমিউনিস্ট সরকার এবং পরে তৃণমূল সরকার লঘু করে দিয়েছে। তবে তার অর্থ এটা নয় যে, বাংলার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমে গিয়েছে। কিন্তু আপনি যদি এই প্লাস পয়েন্টগুলো জনতার সামনে মুখর হয়ে না বলেন, তখন বাকি ভারতের সঙ্গে বাংলাকে জোড়ার আবহটাই তৈরি হয় না। আমি মনে করি, বিজেপি সরকার হওয়ার পর বাংলা শুধু ভারতই নয়, গোটা বিশ্বের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে।



কতগুলো কেন্দ্রে কতগুলো বক্তৃতা করলেন?

সঠিক বলতে পারব না। কিন্তু অক্টোবরের পর থেকে এখনও পর্যন্ত রোড শো এবং সভা মিলিয়ে প্রায় ৪৮টা কেন্দ্র হয়ে গিয়েছে।

আপনি তো ২০১৪ আর ২০১৯-এর ভোটেও এসেছিলেন?

২০১৪ সালে অতটা আসিনি। তখন আমার কর্মক্ষেত্র অন্যত্র ছিল। ২০১৬ আর ২০১৯ সালে এসেছি। তখন প্রচুর জায়গায় ঘুরেছি।

১০০ হবে?

তার বেশিই হবে। এই ভোট শেষ হতে হতে ১২৫ বা ১৩০-এ পৌঁছে যাবে।

তা হলে তো এটা গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে উঠে যাবে!

না-না। অতটাও নয়। তবে আমি প্রচুর রাজ্যে প্রচুর ঘুরেছি। কর্নাটক, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড, বিহার, মণিপুর, ত্রিপুরা আর অসম।

ক্লান্ত লাগে না?

নাহ্। বরং উৎসাহ বাড়ে। ভিতরে আরও শক্তি তৈরি হয়।

একঘেয়ে লাগে না?

একটুও একঘেয়ে লাগে না। একঘেয়ে তো তখন লাগবে, ক্লান্তি তো তখন আসবে, যদি আপনি এটাকে বোঝা মনে করে করেন। আপনি যদি আপনার দায়িত্বটা উপভোগ করেন, তা হলে ক্লান্তিও আসে না। একঘেয়েও লাগে না। আমি তো আমায় যে দায়িত্ব দেওয়া হয় সেটা উপভোগ করি। আর মনোযোগ দিয়ে সেটা পূরণ করার চেষ্টা করি।

এই যে আপনি এত সাংবাদিক বৈঠক করেন? সাক্ষাৎকার দেন?

দিই। অনেক সময়েই প্রশ্ন প্রায় একই রকমের হয়। কিন্তু তাতে রাগ করা উচিত নয়। কারণ, সেটা ওঁদের চাহিদা। ওঁরা নিজেদের কাগজ বা নিউজ চ্যানেলের প্রতিনিধি। ওঁদের জবাবগুলো দরকার। যাঁরা জবাব দিতে বসেন, তাঁদের ধৈর্য ধরে শুনে জবাব দেওয়া উচিত। যদি একই জবাব পুনরাবৃত্তি করতে না চান, তা না-ও করতে পারেন। কিন্তু ধৈর্য ধরে শোনা উচিত বলে আমি মনে করি। এতে আমার কোনও মানসিক বা শারীরিক ক্লান্তি আসে না।



আপনার দেখছি প্রচুর ধৈর্য!

ধৈর্য? (হাসি) মনে হয় আপনার বিশ্লেষণটা ঠিক হল না। ধৈর্য প্রচুর তা নয়। আমি বুঝতে পারি, ওটা ওঁদের দরকার। ওটা ওঁদের কাজ। আমি কেন মনঃক্ষুণ্ণ হতে যাব? আমি তো রোজ বলি, তোলাবাজির সরকার হটান। দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার হটান। অনুপ্রবেশকারীদের মদতদাতা সরকারকে হটান। জনতার কি তাতে একঘেয়ে লাগে? এটা তো আমার কাজ। যদি জনতার আমার কথা একঘেয়ে না লাগে, তা হলে আমারও সাংবাদিকদের প্রশ্ন শুনে একঘেয়ে লাগা উচিত নয়।

কিন্তু আপনার সামনে তো আলাদা আলাদা কেন্দ্রে আলাদা আলাদা জনতা থাকে?

তা-ও। এখন তো টিভি-তে সকলেই সব দেখে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার দায়িত্ব ওঁদের আমার কথাটা বলা। ওঁদেরও দায়িত্ব নিজেদের কাগজ বা চ্যানেলের জন্য জবাবটা নিয়ে যাওয়া।

আপনি বক্তৃতায় বলছেন, বাংলার কোনও অগ্রগতি হয়নি। কিন্তু সেটা তো শুধু দিদির সময়ে নয়, জ্যোতি বসুর সময় থেকেই কোনও অগ্রগতি হয়নি। যোগ করলে ৩৪ প্লাস ১০— মোট ৪৪ বছর। বিজেপি সরকার গঠন করলেই কি এটা বদলে যাবে?

দেখুন, অধোগতি তো নিশ্চিত ভাবেই বন্ধ করা যাবে। শুরুটাও খুব ভাল হবে। বাংলাকে আবার তার নিজের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে কত সময় লাগবে, সেটা বলতে পারব না। কিন্তু অবক্ষয়টা বন্ধ করা যাবে। এটা আমি খুব দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আপনাকে বলছি।

শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই?

নতুন সরকারের সঙ্গে নতুন প্রচেষ্টা শুরু হবে। ১৯৭৭ থেকে প্রথমে বামপন্থীরা এবং তার পর মমতাদিদি একটাই রাজনীতি করে এসেছেন— কেন্দ্রের সঙ্গে ঝগড়া করো! নিজেদের নিহিত রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্পগুলো বাংলায় ঢুকতে দেননি। ওঁরা চেয়েছেন, যাতে কেন্দ্রের সরকার রাজ্যে জনপ্রিয় না হয়ে যায়! সেটা যে কোনও সরকারই হোক না কেন। আমাদের সরকার তো সাড়ে ছ’বছর এসেছে। তার আগে অটলজির সরকার কিছু সময় ছিল। ইন্দিরা গাঁধীর সরকার ছিল। কংগ্রেসের সরকার ছিল। ওঁদের উচিত ছিল বাংলার অধিকার নিয়ে সেই সময় ভারত সরকারের সঙ্গে কথা বলা। সেই অধিকার থেকে তাঁরা বাংলার মানুষকে বঞ্চিত করে রেখেছেন।



একটা উদাহরণ?

উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, নরেন্দ্র মোদী যেমন একটা প্রকল্প করেছেন, প্রত্যেক চাষিকে ছ’হাজার টাকা করে দেওয়ার। ৩ বছর ধরে এই প্রকল্প চলছে। কিন্তু বাংলার কৃষকরা এখনও সেটা পাননি। কারণ, দিদি তালিকাই পাঠাননি। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বরই পাঠাননি। আমরা আরও একটা প্রকল্প করেছি। প্রত্যেক দরিদ্র মানুষকে চিকিৎসা করানোর জন্য ভারত সরকারের তরফে পাঁচ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে। এটা বাংলার গরিব মানুষেরও পাওয়া উচিত। কিন্তু পাচ্ছেন না। কারণ, দিদি এটা চালুই করতে দিচ্ছেন না। একই রকম ভাবে প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ সড়ক যোজনাও চালু হচ্ছে না। কারণ, ওঁর ভয়, এর ফলে নরেন্দ্র মোদী জনপ্রিয় হয়ে যাবেন। আমি মনে করি, এটা বাংলার মানুষের অধিকার। ভারত সরকারের সিন্দুকের উপর বাংলার মানুষেরও অধিকার আছে। সে জ্যোতি বসু, মমতাদিদি বা বুদ্ধদেববাবু— এঁরা বাংলার মানুষকে তাঁদের সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছেন। বাংলার সঙ্গে কেন্দ্র কোনও অন্যায় করেনি। বাংলার শাসকরা করেছেন।

বুদ্ধবাবুও করেছেন?

উনিও করেছেন। কারণ, ওঁর দলের ক্যাডাররা ওঁর উপর ছড়ি ঘুরিয়েছে। আমি এটা নিয়ে বিশদে পড়াশোনা আর বিশ্লেষণ করেছি।

অনেকেই মনে করেন, জ্যোতিবাবু কোনও কাজ করার চেষ্টা করেননি বলেই অতদিন মুখ্যমন্ত্রী থাকতে পেরেছিলেন। তাঁরা মনে করেন, দিদিও তেমন কিছু কাজ করেননি বলেই ১০ বছর ক্ষমতায় রয়েছেন। বুদ্ধবাবু কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন। উন্নয়নের জন্য চেষ্টা করেছিলেন। শিল্প আনার চেষ্টা করেছিলেন। সেই জন্যই বাঙালি তাঁকে হারিয়ে দিয়েছে। বাঙালিরা কাজ করা পছন্দ করে না। কাজের লোকেদেরও করে না।

ব্যাপারটা তা নয়। আমার মনে হয়, ওঁর (বুদ্ধদেব) ক্যাডারদের মধ্যে দ্বিচারিতা ছিল। বাঙালি সমাজের মধ্যে কোনও দ্বিচারিতা নেই। কমিউনিস্টরা কখনও বাঙালি সমাজকে ভিত্তি করে ভোটে লড়েনি। ক্যাডারদের ভিত্তি করে লড়েছে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে কখনও ক্যাডাররা মেনে নেয়নি। এটা আমার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা। তবে এটা ভুলও হতে পারে। বিষয়টা এমন নয় যে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কাজ করতে চেয়েছিলেন বলেই ভোটে হেরে গিয়েছিলেন।



উনি তো টাটাকে আনতে চেয়েছিলেন। নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব তৈরিরও চেষ্টা করেছিলেন।

ওই সব ছুটকো-ছাটকা আর প্রতীকী কাজ করলে কোনও পরিবর্তন হয় না। সবচেয়ে বড় কাজ যেটা উনি করতে পারতেন, সরকারের রাজনীতিকরণ বন্ধ করা। প্রশাসনকে স্বাধীন করা। বুদ্ধদেববাবু সেটা করার কোনও চেষ্টাই করেননি। পার্টি ওঁর উপর চেপে বসে ছিল। প্রশাসনকেও পার্টি নিয়ন্ত্রণ করত। যত ক্ষণ না প্রশাসন স্বাধীন হয়, তত ক্ষণ কোনও রাজ্য তার রাজস্বকে জনতার কাছে, সত্যিকারের গরিব মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে না। মাঝখানে ক্যাডার চলে আসে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রশাসনকে স্বাধীন করার কোনও চেষ্টাই করেননি। সিঙ্গুর-টিঙ্গুর এদিকে-ওদিকে ভাবমূর্তি বদলানোর জন্য, কাগজের প্রথম পাতায় ছবি ছাপানোর জন্য ঠিক আছে।

কী করা উচিত ছিল?

ধরুন উত্তরপ্রদেশ। সেখানেও প্রশাসনের সম্পূর্ণ রাজনীতিকরণ হয়ে গিয়েছিল। আমরা ক্ষমতায় এসে প্রশাসনকে সম্পূর্ণ রাজনীতি থেকে মুক্ত করিয়ে দিয়েছি। ওখানে জেলাশাসককে কেউ ধমকাতে পারে না। কেউ জুতোপেটা করতে পারে না। বদলিও করতে পারে না। এসপি-কেও স্বাধীনতা দেওয়া আছে— আপনি অমুক জায়গায় গিয়েছেন। আড়াই বছর, তিন বছর কাজ করুন। উত্তরপ্রদেশে গড়ে তিন মাসে অফিসারদের বদলি হত। এখন সেটা তিন বছরে এসে দাঁড়িয়েছে। এই কাজটা না বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য করেছেন, না মমতাদিদি।

এটা আদৌ সম্ভব? লোকে তো মনে করে, রাজনীতির প্রভুরাই প্রশাসন চালান। দলই ঠিক করে, কে কোথায় পোস্টিং পাবে, কোথায় বদলি হবে। বাম আমলে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট থেকে হত। অনিল বিশ্বাস করতেন। দিদির আমলে মুকুল রায় করতেন। মুকুল চলে যাওয়ার পর অভিষেক করেন।

২ মে-র পর সম্ভব হয়ে যাবে। কোনও সংবিধান-বহির্ভূত ব্যবস্থাই প্রশাসনকে সফল হতে দেয় না। আমার দল মনে করে, সংবিধান-বহির্ভূত ব্যবস্থা থাকা উচিত নয়!



গত ৪৪ বছর ধরে যে ঐতিহ্য চলে আসছে, সেটা আপনারা বদলাতে পারবেন?

মনের জোর থাকলে অবশ্যই পারা যায়। বহু রাজ্যে হয়েছে। একটা সময়ে বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান আর উত্তরপ্রদেশকে অসুস্থ রাজ্য বলা হত। এই চারটে রাজ্য বিজেপি সরকার আসার পর থেকে উন্নয়নের রাস্তায় চলতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রদেশ আর ছত্তীসগঢ়— দুটো রাজ্যের অবস্থাই এখন আগের চেয়ে ভাল। রাজস্থানও আর অসুস্থ নয়। উত্তরপ্রদেশ আর বিহারও ওই অবস্থাটা থেকে অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে। ২৫ বছর যে রাজ্যগুলো অসুস্থ ছিল, তাদের আমরা পাঁচ-দশ বছরে সাফল্যের সঙ্গে বদলাতে পেরেছি। আমাদের ট্র্যাক রেকর্ডই সেটা বলছে। বিজেপি-র ট্র্যাক রেকর্ড বলছে।

কিন্তু যাঁরা এ রাজ্যে কাজ করেছেন এতদিন ধরে, তাঁরা তো একটা সিস্টেম দেখে এসেছেন। যেটা জ্যোতিবাবুর সময়ে শুরু হয়েছিল। দিদিও সেটাকেই বজায় রেখেছেন। সেটাকে বদলাতে গেলে তো আপনাকে আমলাদের নতুন করে শিক্ষিত করতে হবে!

আমলা বা প্রশাসন একদম জলের মতো। আপনি তাকে গ্লাসে রাখুন, তারা গ্লাসের মতো হবে। কাপে ভরলে কাপের মতো হবে। মগে ভরলে মগের আকৃতি নেবে। আপনি কী হতে চাইছেন, তার উপরেই জলের আধারটা নির্ভর করে। পাত্র ঠিক থাকলে জলও ঠিক থাকবে। ইউপিএ সরকারে ১২ লক্ষ কোটি টাকার ঘাপলা, কেলেঙ্কারি আর দুর্নীতি হয়েছিল। তখনও তো এই প্রশাসনই ছিল। কিন্তু আমাদের সাড়ে ছ’বছরে তো বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়নি। কেউ কোনও অভিযোগ করতে পারেনি। সেই প্রশাসনই তো আছে। টু জি বা ফোর জি কিছুই তো হয়নি।

কী ভাবে?

সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচিত সরকার। তা প্রয়োগ করবে প্রশাসন। কিন্তু আপনি যদি প্রয়োগের সময় ক্যাডার বসিয়ে দেন, তা হলে সেখানেই সমস্যা শুরু। সংবিধান অনুযায়ী চললে নির্বাচিত সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে আর প্রশাসন সেটা নিচুতলা পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। কোনও একটা দিক থেকে সেটা ভাঙতে গেলেই বিকৃতি আসবে। যেটা বাংলায় বছরের পর বছর ধরে হয়ে আসছে। আমরা ক্ষমতায় এলে নিয়োগ বা বদলিতে স্বাভাবিক ভাবেই কোনও রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে না। এটা তো আমরা জীবনে প্রথম সরকার বানাতে যাচ্ছি না! এই দেশে বিজেপি-র ১৬টা সরকার চলছে। ভাল ভাবেই চলছে।



একটা উদাহরণ?

অসমের উদাহরণ দিচ্ছি। যখন আমরা বলেছিলাম, ‘আন্দোলনমুক্ত অসম’ বা ‘জঙ্গিমুক্ত অসম’ তৈরি করব, কেউ বিশ্বাস করেননি। অথচ গত পাঁচ বছরে অসমে একটিও আন্দোলন হয়নি। ২০০০-এর বেশি জঙ্গি আত্মসমর্পণ করেছে। অসম উন্নয়নের রাস্তায় চলতে শুরু করেছে। ত্রিপুরাও তেমনই। মণিপুর? ২০০ দিন ধরে বন্‌ধ হত। অবরোধ হত। সাড়ে তিন বছর আগে বিজেপি সরকার আসার পর একটাও বন্‌ধ হয়নি। একটাও অবরোধ হয়নি। এটাই তো প্রশাসন।

এর পিছনে জাদুটা কী?

এতে কোনও জাদু নেই। আপনাকে আপনার মর্যাদাটা বুঝতে হবে আর সেই অনুযায়ী চলতে হবে।

আপনারা ক্ষমতায় এলে প্রথম কাজ কী হবে?

প্রথম কাজ হবে বাংলার সমস্ত শক্তিকে বাংলার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা। আমি মনে করি, বহু বছর ধরে এই কাজটা বাংলায় হয়নি। দুটো পার্টিই তাদের নিজেদের ক্যাডার দিয়ে রাজ্য চালিয়েছে। প্রত্যেক বাঙালিকে বাংলার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রত্যেক বাঙালিকে বাংলার সম্মান, গৌরব এবং স্বাভিমানের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। এটা খুব জরুরি। কমিউনিস্টরাও এই কাজটা করেনি। মমতাদিদিও সেই চেষ্টা করেননি। আমি এখনও মনে করি, এতদিন খারাপ থাকার পরেও বাংলাতেই সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

কেন?

আমি যে রাজ্যের বাসিন্দা, সেখানে মাটির ১,২০০ ফুট নীচে জল পাওয়া যায়। এখানে ৬০ ফুট খুঁড়লেই জল পাওয়া যায়। সারা দেশের উর্বরতা এই রাজ্যে নিয়ে আসে গঙ্গা নদী। পূর্ব ভারতে ব্যবসা করার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হতে পারে বাংলা। পুরো পূর্ব ভারতের বাজার খুলে যাবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময়ের পর যে রাস্তা খুলবে, সেটা উত্তর-পূর্বের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ এবং সংক্ষিপ্ত করে দেবে। আরও দুটো-তিনটে বন্দর তৈরি করে বিহার থেকে অসম পর্যন্ত পুরো শিল্পায়নের ফসল সারা পৃথিবীতে পৌঁছে দেওয়ার একটা বড় রাস্তা হতে পারে বাংলা। বাঙালির মাথায় বুদ্ধির অভাব কখনও ছিল না। গোখলে বলেছিলেন, বাংলা আজ যা ভাবে, গোটা দেশ কাল তা ভাবে। ফলে আমি মনে করি, যদি কেউ দূরদৃষ্টি নিয়ে সেই বুদ্ধিকে সঠিক পথে চালিত করে, তা হলে পরিস্থিতির অবশ্যই পরিবর্তন হবে। দারুণ পরিবর্তন হবে। মুর্শিদাবাদ জয় করে লর্ড ক্লাইভ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে চিঠি লিখেছিলেন, একটা মুর্শিদাবাদে ৮৬টা লন্ডনের সম্পত্তি আছে। তখনকার লন্ডনের কথা বলছি! এখানে উর্বর জমি। জলের অভাব নেই। বুদ্ধি আছে। আর এত পুরনো গৌরবের ইতিহাস আছে। আমার মনে হয় না রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর পরিশ্রম ছাড়া এখানে আর কোনও কিছু খামতি আছে।



বাংলার জমি উর্বর বলেই তো ছোট ছোট টুকরো হয়ে গিয়েছে। শিল্পের জন্য সেই ছোট ছোট জমি নিয়ে তো সমস্যা হবে।

যাঁরা উন্নয়ন করেননি, তাঁরাই এ সব মিথ তৈরি করেছেন। গুজরাতে আমূলে ২৫ লক্ষ মহিলা কাজ করেন। সারা পৃথিবীতে সেই দুধ যায়। এখানে বাড়িতে একটা গরু পালন করতে তার দশভাগের একভাগ খরচ করতে হয়। একটা মহিষ পুষতেও গুজরাতের দশভাগের একভাগ খরচ হয়। কিন্তু এখানে তো কোনও সমবায় ডেয়ারি গড়ে উঠল না? কোনও আন্দোলনই হল না। উল্টে সমস্ত গরু বাংলাদেশে পাচার হয়ে গেল! আসলে কেউ কোনও অভিমুখই ঠিক করেননি। প্রতিটি রাজ্যের কিছু প্লাস থাকে। কিছু মাইনাস থাকে। জমি ছোট ছোট টুকরো হয়ে গেলে বরং আপনাকে রোজগারের জন্য অনেক কম পরিশ্রম করতে হবে। শুধু ঠিক লাইনে চলতে হবে। প্রত্যেক মানুষের কাছে রোজগারের উপায় আছে। জমিদারি তো একজনের হয়। এখানে তো ১,২০০ লোকের কাছে জমি আছে। এটা তো একটা বড় শক্তি। বাংলায় এত সরকারি জমি পড়ে আছে যে, এখনও যদি কেউ নিষ্ঠাভরে ল্যান্ড ব্যাঙ্ক তৈরি করে, তা হলে আগামী ২০ বছর শিল্পের জন্য জমি দিতে পারবে।

বুদ্ধবাবুও বলতেন। দিদিও বলেন।

কিন্তু কেউ তো বানালেন না! পশ্চিমবঙ্গের ওয়েবসাইটে গিয়ে আমাকে বলুন তো দেখি, সুন্দরবনে কত জমি আছে শিল্প তৈরির জন্য? সমস্ত রাজ্যের সাইটে সমস্ত তথ্য আছে। গুজরাতের সাইট খুলুন। কচ্ছ জেলার মাণ্ডবী তালুকায় কত জমি আছে আপনি জানতে পারবেন। জম্মু-কাশ্মীরেও গত পাঁচ মাসে সব তথ্য ওয়েবসাইটে তুলে দেওয়ার কাজ হয়ে গিয়েছে।

জমির ঊর্ধ্বসীমা আইন তো সর্বত্র তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখানে এখনও আছে।

সেটা আমার রাজ্যেও আছে। কিন্তু অকৃষিজমি একবার নো অবজেকশন পেয়ে গেলে কোনও ঊর্ধ্বসীমা আইন চলে না। জমির ঊর্ধ্বসীমা আইন কৃষিজমি ধরে রাখার জন্য…।

আমদাবাদে তো শহরে জমির ঊর্ধ্বসীমা আইন নেই। সারা দেশে বাতিল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কলকাতায় আছে।

আমি তো মনে করি, কলকাতায়ও ওই আইন তুলে দেওয়া উচিত। এনডিএ সরকার থাকার সময় আমরা ওই আইনটা বাতিল করে দিয়েছিলাম।



বাঙালিরা ছুটি খুব ভালবাসে। লেনিনের জন্মশতবার্ষিকীতে রাশিয়াতে ছুটি দেওয়া হয়নি। কিন্তু বাংলায় জ্যোতিবাবু ছুটি ঘোষণা করেছিলেন! মমতাদিদিও অনেক ছুটি দেন। এখানে একটা কর্মহীনতার সংস্কৃতি আছে।

না, আমি মনে করি না বাংলায় কর্মহীনতার সংস্কৃতি আছে। দেশের জিডিপি-তে বাঙালিদের ৩০ শতাংশ অবদান ছিল। সেটাই তো সংস্কৃতি। সংস্কৃতির আয়ু অত কম নয়। ওটা দেড়শো বছরের পুরনো সংস্কৃতি। ধুতি থেকে পাজামায় আসতে আসতে এই দেশের সাড়ে ছ’শো বছর লেগেছে। সংস্কৃতি অত সহজে বদলায় না। ওটা ডিএনএ-তে থাকে। বাংলায় বিজেপি-র সরকার এলে ছুটির সংস্কৃতি বন্ধ করবে কি না, সেটা কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে আমি বলতে পারি না। এখানে যে সরকার আসবে, তারাই সেটা ঠিক করবে। এখানেই সেই সরকারের চালিকাশক্তি থাকবে। তারাই উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেবে। দরকার হলে কেন্দ্রের সঙ্গে পরামর্শ করবে। কিন্তু এই ধরনের সিদ্ধান্ত যদি আমি দিল্লিতে বসে নিতে থাকি, তা হলে সেটা ভাল দেখায় না। যাঁরা এখানে নির্বাচিত হয়ে আসবেন, যিনি মুখ্যমন্ত্রী হবেন, যাঁরা মন্ত্রী হবেন, তাঁরাই সিদ্ধান্ত নেবেন।

দিদি ক্ষমতায় ফিরলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন, তা নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। আপনারা?

আমাদের মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তা এখনও ঠিক হয়নি। দেখুন, আমাদের রাজনৈতিক শক্তি এটাই যে, এখনও আমাদের কোনও মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঠিক করা নেই। আমাদের শক্তি এটাও যে, দিদির নাম ওদের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঠিক হয়ে আছে (হাসি)। দিদির নাম ঠিক হয়ে আছে, সেটাই আমাদের পক্ষে ভাল।

যাঁরা অন্য দল থেকে আপনাদের দলে এসেছেন, তাঁদের কাজকর্মে আপনি খুশি?

আমাদের তো সর্বভারতীয় দল। সারা দেশে যেখানে যেখানে আমাদের পার্টি বড় হয়েছে, অন্য দল থেকে নেতা-কর্মীরা আমাদের দলে যোগ দিয়েছেন। ত্রিপুরায় ২০ শতাংশ লোক কমিউনিস্ট পার্টি থেকে যোগ দিয়েছেন। অসমেও এসেছেন কংগ্রেস থেকে। উত্তরপ্রদেশে সপা, বসপা থেকে ৩০ শতাংশ বিধায়ক এসেছেন। ৩০০-র মধ্যে তাঁরাই ১০০! কিন্তু যখন তাঁরা বিজেপি-র আদর্শ, কর্মসূচি এবং নেতৃত্ব মেনে নিয়ে আসেন, তখন তাঁদের আমাদের দলের শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। নইলে দল তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আমি কেন মনে করব যে, তাঁরা দলের অনুশাসন মেনে চলবেন না! আমি তো ইতিবাচক ভাবনার মানুষ। আমি তো ভালটাই ভাবি। প্রত্যেক ভোটের সময়েই তো এটা হয়। দিদি কোথা থেকে এসেছেন? কংগ্রেস থেকে। ওঁর তো গোটা দলই কংগ্রেস থেকে এসেছে। উনি কী ভাবে ওঁর দল ভাঙানোর অভিযোগ করছেন!



মমতা তো বলছেন বিজেপি-র মধ্যে আদি এবং নব্যর গোলমাল আছে

বিজেপি-র হজমশক্তি দারুণ ভাল। আমাদের দলে কী হচ্ছে, সেটা নিয়ে চিন্তা করা ছেড়ে ওঁর বরং ভাবা উচিত, উনি কী ভাবে বাঁচবেন (হাসি)! আমাদের হজম করার ক্ষমতা প্রবল।

কংগ্রেস বলুন বা সিপিএম— ভোটে হারের পর সকলেরই ক্রমাগত শক্তিক্ষয় হয়েছে। দুটো দলই সরকারি শক্তিতে দলের শক্তি বাড়িয়েছিল। সরকার চলে যাওয়ার পর দলেরও ক্ষয় হয়েছে। সেটাই দেখা গিয়েছে একের পর এক নির্বাচনে। মমতাদিদির সরকার যদি চলে যায়, তা হলে তৃণমূলের কী হবে? আপনার ভবিষ্যদ্বাণী কী?

আমার ভবিষ্যদ্বাণীর বিষয় নয়। কিন্তু উনি যে ভাবে সরকারের ভিত্তিতে দল চালিয়েছেন, তাতে ওঁর দল টিকিয়ে রাখা মুশকিল হবে! যেমন উত্তরপ্রদেশে আমরা বিরোধীদলে থেকে দলটাকে তৈরি করেছিলাম। অসমেও তাই। রাজস্থানেও তাই। বসুন্ধরা রাজে হেরে গিয়েছেন। কিন্তু দলটা উঠে যায়নি। দলটা আছে। আমরা শেষ হতে দিইনি। মণিপুরে, ত্রিপুরায় আমরা বিরোধী আসনে থেকে দলটাকে তৈরি করেছি। ভোটে হারজিত হতেই থাকে। কিন্তু আমাদের ভোট কমে না। আমরা থেকে যাই। কংগ্রেস যেমন উত্তরপ্রদেশ, বিহারে, বাংলায় শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমরা কোথাও শেষ হয়ে যাইনি। ভোটে জিতি বা হারি, প্রতিটি রাজ্যে আমরা আমাদের প্রভাব বাড়িয়েছি।

কিন্তু গণতন্ত্রে কি জোরদার বিরোধীর দরকার নেই? পশ্চিমবঙ্গে যদি বিরোধীদলই না থাকে, তা হলে কি ছোট ছোট জেলাভিত্তিক বা এলাকাভিত্তিক দল আসবে? সেটা কি রাজ্যের পক্ষে ভাল হবে?

মানছি, গণতন্ত্রে জোরাল বিরোধীর দরকার আছে। কিন্তু সেটার জোগান দেওয়া তো আমার কাজ নয়। সেটা জনতা দেবে। সেটা জনতার কাজ। আমি মনে করি না, প্রধান বিরোধীদল না থাকলে ছোট ছোট এলাকাভিত্তিক দল তৈরি হবে। রাজনীতি সেই জায়গাটা দেয় না। কেউ না কেউ এসে সেই ফাঁকা জায়গাটা ভরাট করে দেয়। যেমন উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেস পার্টি শেষ হয়ে গিয়েছে। তার জায়গায় সপা-বসপা তৈরি হয়েছে। বিহারে কংগ্রেস শেষ হয়ে গিয়েছে। তার জায়গায় বিজেপি, জনতা দল, লালুর দল তৈরি হয়েছে। রাজনীতিতে কোনও শূন্যস্থান থাকে না। তবুও যদি তেমনই হয়, তা হলে আমাদের দায়িত্ব আরও ২০ শতাংশ বেড়ে যাবে। পারফর্ম করার দায়িত্ব। এবং তার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকা উচিত। আমি মনে করি, গণতন্ত্রে কী হবে, সেটা জনতাই ঠিক করবে। অভীক সরকারের মতো থিয়োরি-লেখকরা তৈরি করবেন না (হাসি)। আপনারা তৈরি করবেন না। সেটা গণতন্ত্রে পাবলিক ঠিক করবে। তাই সেটা জনতার উপর ছেড়ে দেওয়াই ভাল।



বাংলায় একটা প্রতিষ্ঠান খুব জোরাল ছিল। যার ভয়ঙ্কর অবনতি হয়েছে— শিক্ষা। এখানে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আমলে শিক্ষার অনেক উন্নতি হয়েছিল।

আমি ওটা নিয়ে বিশদে পড়াশোনা করেছি। ওটা খুবই ভাল ছিল। কিন্তু এখন এখানকার যা অবস্থা, তাতে শিক্ষার পরিকাঠামো এবং হায়ারার্কি নতুন করে তৈরি করতে হবে।

কী ভাবে?

আমরা সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামোর জন্য ২০,০০০ কোটি টাকার তহবিল এবং বিশদ প্রকল্প তৈরি করেছি। যার নাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তহবিল। ১০,০০০ কোটি টাকার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তহবিল বানিয়েছি। যা ফাঁকগুলো ভরাট করবে। ধরা যাক, এখন এক লক্ষ শিশুর জন্য ১৩টা কলেজ আছে। যা জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক কম। তাই আমাদের পলিটেকনিক কলেজ খুলতে হবে, মেডিক্যাল কলেজ, সাধারণ কলেজও খুলতে হবে। তবেই শিক্ষা বাড়বে। এখন যা আছে, তার পরিকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে। কর্মী ইত্যাদিতে যা ঘাটতি আছে, সেগুলো দ্রুত পূরণ করতে হবে। প্রাইমারি থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত, টেকনিক্যাল থেকে মেডিক্যাল এডুকেশন এবং লিগ্যাল এডুকেশন পর্যন্ত ২০,০০০ কোটি টাকার সংস্থান করেছি ইস্তাহারে। ১০০টা সরকারি কলেজ বানাব। ৫০টা নতুন পলিটেকনিক কলেজ তৈরি করব। সব মিলিয়ে ২০টা মেডিক্যাল কলেজ তৈরি করব। যাতে ভারত সরকার সাহায্য করবে।

শান্তিনিকেতনে?

শান্তিনিকেতনের জন্যও ২০ কোটি টাকার তহবিল তৈরি করেছি। যা গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের নিরীক্ষাকে আবার সারা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরবে। এটা বন্ধ হওয়া উচিত নয়। নতুন কিছু তো করতেই হবে। কিন্তু আমি মনে করি, শান্তিনিকেতন নিজেই পৃথিবীর অনেক সমস্যার সমাধান। একজন সম্পূর্ণ মানুষ তৈরি করা, নির্ভীক মানুষ তৈরি করা, স্বাধীন ভাবে নিজের ইচ্ছার বিকাশ নিজে ঘটানোর যে পরীক্ষানিরীক্ষা গুরুদেব করেছিলেন, তা আগামী ২৩ বা ২৪ শতাব্দী পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও হবে বলে মনে হয় না। আমরা এর উপর আরও জোর দেব। দেশ জুড়ে বাংলার বিভিন্ন মহাপুরুষ যেমন ঋষি অরবিন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুভাষবাবু, চৈতন্য মহাপ্রভুর নামে চেয়ার তৈরি করব। শিক্ষা বিনিময়ের বিষয়টাও ভেবেছি। অর্থাৎ, আমরা সম্পূর্ণ সংযুক্তিকরণের দিকে লক্ষ্য রেখে এগোচ্ছি। আমরা এগুলো সবই করেছি ইস্তাহার নিয়ে আমাদের কাছে যে পরামর্শ এসেছিল, তার ভিত্তিতে। সরকার তৈরি হলে, প্রশাসন হাতে এলে যখন আমরা প্রশাসনের খামতিগুলো বিশ্লেষণ করব, তখন এর একটা সম্পূর্ণ নীল নকশা তৈরি হবে। এখন আমরা একটা বড় ধাঁচার ভিত্তিতে চলছি। কিন্তু আমরা নিশ্চিত ভাবেই শিক্ষার উন্নতির জন্য চেষ্টা করব। যেমন আমরা গুজরাতে ‘চাইল্ড ইউনিভার্সিটি’ তৈরি করেছি। শিশু যখন মাতৃগর্ভে থাকে, তখন থেকেই তার শিক্ষা শুরু হয়। আপনি তিন দিন সময় নিয়ে আমাদের ওই বিশ্ববিদ্যালয়টা দেখতে আসুন। এ জিনিস আর কোথাও নেই! মহাভারতে অভিমন্যুর শিক্ষা মাতৃগর্ভ থেকেই শুরু হয়েছিল। মায়ের ভাল ব্যবহার, মায়ের ভাল চিন্তার প্রভাব অবশ্যই তার গর্ভস্থ শিশুর উপর পড়ে। দুনিয়ায় কেউ এই বিষয়টা নিয়ে কিছু ভাবেনি। কিন্তু এখন সারা পৃথিবী থেকে লোকে ওই বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে আসে। তেমন পরীক্ষানিরীক্ষা এখানেও হবে। কিন্তু যত ক্ষণ না আমরা সরকার তৈরি করতে পারছি, তত ক্ষণ আমরা ঠিকঠাক বলতে পারব না যে, কোথায় কোথায় ঘাটতি আছে। সেজন্য আমরা এখন বড় বড় স্কেচ তৈরি করে রেখেছি। সরকারে আসার পর সেগুলো সমস্ত খতিয়ে দেখে শিক্ষার প্রসারের জন্য বিশদে নীল নকশা তৈরি করা হবে।



সিপিএমের সময় থেকেই এখানকার বৌদ্ধিক সম্পদ রাজ্যের বাইরে চলে যাওয়া শুরু হয়েছে। অনেকেই দিল্লি বা বেঙ্গালুরু চলে গিয়েছেন।

আমি তো মনে করি, বাংলার আরও অনেক মানুষকে বাইরে পাঠানো উচিত। তাঁরা বাংলার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হবেন। বাংলায় বুদ্ধির ঘাটতি নেই। ব্যবস্থার ঘাটতি আছে। প্রতিটি বাঙালির কাছে পৃথিবীর সেরা বুদ্ধি আছে। যত বাঙালি বাইরে যাবেন, তাঁরা আপনাদের রাজদূত হয়ে যাবেন। তাঁদের আটকাবেন না (হাসি)। বরং এখানকার পরিবেশটা ভাল করুন, যাতে এখানে যে বাঙালিরা থাকেন, তাঁরাও কাজের সুযোগ পান।

এটা একটা রাজনৈতিক জবাব হল! কিন্তু ভাল লোক না থাকলে শিক্ষা দেবেন কারা!

নাহ্, এটা রাজনৈতিক জবাব নয়। এটা আমার বিশ্বাস। এটাকে আপনি রাজনৈতিক জবাব হিসেবে ভেবে নেবেন না। আমি এখনও মনে করি, পরিবেশ না থাকায় এবং ভয়ের বাতাবরণ থাকায় লোকে কুঁকড়ে গিয়েছে। একটা খোলামেলা আবহাওয়া তৈরি হলে প্রচুর লোক বেরিয়ে আসবেন। যাঁরা খুব ভাল কাজ করবেন। শু‌ধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, সাহিত্যে, সঙ্গীতে, শিল্পে— সব জায়গায়। আগে অন্তরীক্ষ বিজ্ঞান বা স্পেস টেকনোলজি পড়তে ৯০ শতাংশ লোক বিদেশ যেতেন। এখন ১০ শতাংশও যান না। কারণ, এই দেশেই তাঁদের শিক্ষা পুরোপুরি কাজে লেগে যাচ্ছে। তা হলে যাবেন কেন! আমরা এই অনুপাতটা বদলাতে পেরেছি। অন্তরীক্ষ বিজ্ঞান আমরা বেসরকারি সংস্থার জন্য খুলে দিয়েছি। এখন এই দেশে সম্ভাবনা এত অপার, যে স্পেস সায়েন্সের জন্য নতুন কলেজ তৈরি করার দরকার হয়ে পড়েছে।



আরও পড়ুন

Advertisement