১. মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কাকে দেখতে চান?
পরমব্রত: এমন একজনকে দেখতে চাই যিনি বাঙালি, বাংলার হৃদয়কে চেনেন এবং সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে চলার চেষ্টা করেন। এমন একজনকে দেখতে চাই, যিনি অনেক লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছেন। যিনি রাজনীতি বলতে আজও শুধু কূটনীতিই বোঝেন না। যিনি রাস্তায় নেমে লড়াই করতে জানেন, তাঁকেই দেখতে চাই মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে।
২. দল দেখে ভোট দেন না কি প্রার্থী দেখে?
পরমব্রত: বৃহত্তর রাজনীতি এবং মোটের উপর সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখে ভোট দিই।
৩. প্রার্থী বাছাইয়ের পরীক্ষা হলে কেমন হয়? আর জেতার পরে যদি হয় বিধায়কের প্রশিক্ষণ?
পরমব্রত: ভালই হয়। তবে ভাবনাটা বড়ই ‘ইউটোপিয়ান’। আদর্শের আকাশ কুসুম! প্রশিক্ষণটা মানুষের দেওয়া উচিত। সমর্থন করা হচ্ছে যাঁকে প্রয়োজনে তাঁকেও সমালোচনার কড়া দাওয়াই দেওয়া যায়। দক্ষিণ ভারতে এই ধরনের মানসিকতা দেখতে পাই। সমালোচনা করার এবং গ্রহণ করার পরিসর হচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রশিক্ষণ।
৪. নিজে বিধায়ক হলে কী বদলাতে চাইতেন?
পরমব্রত: বিধায়ক বা সাংসদ হয়ে গেলে অনেকের মধ্যে একটা সাপের পাঁচ পা দেখার বা লঙ্কায় বসে রাবণ হওয়ার প্রবৃত্তি দেখতে পাই। এমন কোনও সুযোগ এলে সবার আগে নিজে মনে রাখার চেষ্টা করব, আমি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাই তাঁদের এক মুহূর্তও ভুললে চলবে না।
৫. আপনার পেশার জগতের কোনও অভিযোগ কি ভোট প্রচারে গুরুত্ব পাওয়া দরকার?
পরমব্রত: সত্যি কথা বলতে, আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সাধারণ মানুষের প্রয়োজন, দুঃখ কষ্ট চাওয়া পাওয়ার তুলনায় আমাদের জগতের প্রয়োজনগুলি নেহাতই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো। তাই প্রচারে সেগুলি কতটা জায়গা পাবে, সে বিষয়ে আমি সন্দিহান। তবে সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের কাছে নিশ্চয়ই কথা বলার আছে। আমাদের জগতের চাওয়া-পাওয়া দরকারগুলি তুলে ধরার পরিসর থাকা উচিত।
৬. নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে পারে কী কী?
পরমব্রত: আমাদের দেশে নির্বাচন একটি বিশাল নাটকীয় প্রক্রিয়া এবং এই সুবিশাল দেশের রাজনৈতিক আঙিনায় কোথাও না কোথাও ক্ষমতায় থাকার লোভ মানুষের মধ্যে প্রবল। এত ক্ষমতা এত প্রতিপত্তির হাথছানির মধ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত থাকবে, এটা আশা করা আবার আকাশকুসুম ভাবনা।
৭. ঘন ঘন দলবদলের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার?
পরমব্রত: ‘দিস শিপ হ্যাজ় সেলড’! আগেই বললাম রাজনীতি আজকের ভারতে একটি পেশা বা ব্যবসাও বলা যেতে পারে। আজকাল মতাদর্শের জন্য রাজনীতি বড়জোর ১০ শতাংশ লোক করে। বাকিরা চাকরি বদলানোর মতোই না পোষালে দল বদলায়। এটাই বাস্তব চিত্র। তবে নির্বাচিত সরকার গঠন হওয়ার পরে ঘোড়া কেনাবেচার মতো সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কড়া নিয়ম হওয়া দরকার। কারণ, এটাকে দেশের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা করা বলে।
৮. রাজনীতিতে অপশব্দের প্রয়োগ কি জরুরি?
পরমব্রত: না! বন্ধ হওয়া দরকার।
৯. দেশজ সংস্কৃতি, উন্নয়ন না কি সমান অধিকার— ভোট প্রচারে কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
পরমব্রত: এগুলো পৃথক নয়। পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। সব ক’টিই জরুরি।
১০. ভাতা-র রাজনীতি সমাজের উন্নতি করে কি?
পরমব্রত: গরিব মানুষের হাতে টাকা দিয়ে তাদের স্বনির্ভর করাকে ভাতার রাজনীতি বলে হেয় করাটা কিছুটা নির্বুদ্ধিতা বলে মনে করি। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে মহিলাদের হাতে টাকা পাওয়ার সুদূরপ্রসারি সুফল আছে। অর্থনীতিবিদদের মত এমনই। আর যাঁরা এটাকে ভিক্ষা বলে এ রাজ্যে প্রচার চালান, তাঁরা যে রাজ্যে নিজেরা ক্ষমতায় আছেন, সেখানে আইনের তোয়াক্কা না করে ভোটের আগে দেদার ভাতা বিলিয়ে থাকেন। ওই সব মিথ্যা দ্বিচারিতা লোকে দেখে ফেলেছে। তবে হ্যাঁ, সমাজকল্যাণের পাশাপাশি আধুনিক কর্মক্ষেত্রগুলির বিকাশ এবং কাজের সুযোগ তৈরি না করলে মানুষের কাজ করার ইচ্ছে বা তাগিদ ভাতাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে। সেটাও কাম্য নয়।
১১. প্রায় বিরোধীশূন্য রাজনীতি কি স্বাস্থ্যকর?
পরমব্রত: বিরোধীশূন্য রাজনীতি ভয়ানক বিপজ্জনক জিনিস। পৃথিবীতে কোথাও এমন হওয়া উচিত নয়। গণতন্ত্রের পক্ষে, স্বাভাবিক ভাবনার অবকাশের জন্য প্রবল ভাবে ক্ষতিকারক বিরোধীশূন্য রাজনীতি।
১২. তারকারা কি ভোট টানার শর্টকাট?
পরমব্রত: তারকার রাজনীতি আমার খুব একটা পছন্দের বিষয় নয়। কারণ, কিছু ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ তারকারই রাজনীতি, ইতিহাস, সমাজ নিয়ে প্রয়োজনীয় মাত্রায় সচেতনতা থাকেন না। আর আমি মনে করি, রাজনীতি করতে গেলে সেটা মৌলিক প্রয়োজন। আমি নিজে কখনও রাজনীতি করলে সেটা জনপ্রিয় মুখ হিসাবে শুরু হবে ঠিকই। তবে এক বার রাজনীতি করতে শুরু করলে দু’ নৌকোয় পা দিয়ে চলা আমার হবে না। আমি তখন শুধু মন দিয়ে রাজনীতিটাই করব।
১৩. পছন্দের রাজনীতিবিদ কে?
পরমব্রত: অনেকে। যাদের নাম করব, তাঁদের সকলের রাজনৈতিক মতাদর্শ আমার পছন্দের, এমনটা নয়। কিন্তু রাজনীতিক হিসাবে তাঁদের সম্মান করি। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু বা নেতাজির মতো দেশনায়কদের কথা টানছি না। যদিও আমার মতে মহাত্মা গান্ধী গত ১০০ বছরে সারা পৃথিবীর সেরা পাঁচজন রাজনীতিবিদদের মধ্যে একজন। আবার ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে বিআর অম্বেদকরের গুরুত্ব অপরিসীম। আমার ছোটবেলা থেকে দেখা মানুষদের মধ্যে রাজীব গান্ধী, অনিল বিশ্বাস, সুভাষ চক্রবর্তী, অটল বিহারী বাজপেয়ীর কথা বলব। বর্তমানে দক্ষিণের রাজনীতিতে এমকে স্তালিন এবং ডি শিবকুমারকে ভাল লাগে। অল্প বয়সিদের মধ্যে অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক মস্তিস্ক অসম্ভব পরিণত বলে মনে হয়। মহুয়া মৈত্রের মধ্যে লড়াকু ভাব দেখতে পাই। বামেদের মধ্যে মিনাক্ষী এবং সৃজনের মধ্যে সম্ভাবনা দেখি। অতীত এবং বর্তমান মিলিয়ে এই মুহূর্তে ভারতের অন্যতম সেরা রাজনীতিবিদের নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।