স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অনেক আগেই কড়া পদক্ষেপ করা উচিত ছিল। কিছু জিনিস আগেই আটকানো যেত। এখানে শুধু আমি একা ভুক্তভোগী নই। বহু বছর ধরে অনেক পরিচালক, শিল্পী— বিশেষত যাঁদের সাক্ষাৎকার সচরাচর কেউ নেন না বা জানতে পারেন না, তাঁরা ভুগেছেন। অনেক টেকনিশিয়ানকে হুমকি দিয়ে, ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হচ্ছিল। আমার বরাবর মনে হয়েছে, স্বরূপ বিশ্বাসের মতো এক জন মানুষ, যিনি চলচ্চিত্রজগতের কেউ নন বা কোনও দিন যুক্তও ছিলেন না, তাঁকে একটা ইন্ডাস্ট্রি এতটা ক্ষমতা বিস্তার করার সুযোগ দিয়েছিল কেন?
প্রায় ১৫ বছর ধরে তাঁর এই ক্ষমতার আস্ফালন, একটা গোটা ইন্ডাস্ট্রি কেন মেনে নিয়েছিল? কেউ কেউ মেনে নিয়ে কেন চুপ করে ছিলেন? ইন্ডাস্ট্রির প্রভাবশালী মাথারা শুরুতেই স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারতেন। তিনি চলচ্চিত্রজগতের লোক নন, কোনও কার্ড নেই তাঁর, কখনও কোনও ছবির শুটিং ফ্লোরে পা রাখেননি। তিনি কী করে কলাকুশলী বা চলচ্চিত্রজগতের কোনও নিয়ম তৈরি করে দিতে পারেন? এটা গোড়াতেই উচ্ছেদ করে দিতে পারত। যদি আমাদের ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষে বসে থাকা মানুষেরা তখনই এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। সেটা বললে ‘ব্যান’ বা ‘থ্রেট কালচার’-এর সৃষ্টি হত না।
আরও পড়ুন:
এটাই আমার কাছে হতাশাজনক যে, সময় থাকতে এটা করা যেত। এক জন জুনিয়র টেকনিশিয়ান বা নতুন শিল্পী, যাঁরা কাজের সুযোগ কম পান— তাঁদের ভয় দেখিয়ে, তাঁদের উপরে জুলুম করা সহজ। কিন্তু, ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র যাঁরা বা যাঁদের আমরা তারকা বলি। যাঁদের কথা মানুষ শোনেন, যাঁদের কথা প্রশাসন শুনতেও বাধ্য হবেন— তাঁরা যখন চুপ করে থাকেন, সেইটা আমার কাছে অনেক বেশি বিপজ্জনক। তখন বোঝা যায় যে, আজ এক জন স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেফতার হলেন। পরবর্তীকালে আরও এক জন ‘স্বরূপ’ তৈরি হলে, তাঁরা সেই ব্যক্তির ভয়েও চুপ করে থাকবেন আগামীতে। সেই প্রবণতা খুবই বিপজ্জনক।
আমি পেশাগত ভাবে কাজ করতে শুরু করেছি ছোট থেকে। ছোটবেলা থেকে দেখেছি বিভিন্ন সরকারের আগ্রাসনের মুখে আমার পরিবারের সবাই (মা, বাবা যে কেউ হতে পারেন) নিজেদের মতো করে প্রতিবাদ করেছেন। সেই সরকারের রোষ বা আগ্রাসন তাঁদের উপরে পড়েছে। কিন্তু, তার জন্য তাঁরা কখনও চুপ করে থাকেননি। কারণ, তাঁরা যে কোনও ‘লাইফস্টাইল’–এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন। কারণ, জীবন থেকে তাঁদের বেশি আকাঙ্খা নেই। বেশি চাহিদা নেই। আগ্রাসনের মুখে পড়লেও যেখানে প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন, সেখানে সেটাই করেছেন। চাইলে অনেক কিছু করা যায়।
আরও পড়ুন:
আমার কাছে ভয়ের হল, স্বরূপের মতো মানুষকে যাঁরা প্রশ্রয় দিয়ে আজ এই পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। তাঁরা আমার কাছে অনেক বেশি ভয়ের। এখানে দেবের প্রসঙ্গ উঠবেই। কারণ, গত কয়েক মাসে এই কারণে তাঁকে অনেক কথা বলতে শোনা গিয়েছে। কিন্তু, একটা কথা আমার বার বার মনে হয়েছে যে, দেব তো এক জন ব্যক্তি। ইন্ডাস্ট্রিতে আরও অনেকে আছেন। আরও অনেকে আছেন যাঁরা প্রভাবশালী। ২০ থেকে ৪০ জন মানুষ একসঙ্গে রুখে দাঁড়িয়ে যদি কথা বলেন, তা হলে যে কোনও ক্ষমতাকে চাপে ফেলে দেওয়া যায়। এটা কোনও কঠিন কাজ নয়। সবাই শুধু বিষয়টাকে কঠিন করে দেখানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়। এই অপারগতার পুরোটাই দেখনদারি। আসলে তাঁরা সত্যিই চাননি বিরোধিতা করতে। কারণ, তাঁরা নিজেরাও বিভিন্ন সময়ে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। এই ব্যক্তিসুবিধার জন্য তাঁরা চুপ করে থেকেছেন।
এখন যে হেতু ক্ষমতা বদলে গিয়েছে, তাই কথাগুলো এখন বলা সহজ। সেই সরকারই আর ক্ষমতায় নেই। কারণ, এখন আমি ‘সেফ’। এইটা আমি পারিবারিক ভাবে কখনও দেখিনি। মানুষ আসলে সুবিধা দেখে প্রতিবাদ করে। এখন স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেফতার হবেন, সেটাই স্বাভাবিক। ওঁর গ্রেফতার হওয়ার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কিন্তু এত দিন সবাই সবকিছু জেনে কিছুই করেননি।
এটা অনেক আগেই হতে পারত। তবে একটা কথা বলতে চাই, এই সবের মাঝে অনেকেই ভাবছেন যে, রাজনীতিমুক্ত হয়ে যাবে ইন্ডাস্ট্রি। কোনও কিছুই কিন্তু, কখনও রাজনীতিমুক্ত হয়নি। সুতরাং, এটা একটা আকাশ-কুসুম ভাবনা।