Advertisement
E-Paper

যাঁরা চান তাঁদের কাছেই রাজনীতির প্রস্তাব আসে! এমন নয় রাজনৈতিক ছাতার তলাতেই শিল্পীকে থাকতে হবে: জয়

সুরকার হিসাবে সফর শুরুর ১২ বছর পর ছবির কাজে সুযোগ পান। তার পরে গিয়েছে নানা চড়াই-উতরাই। সঙ্গীত সফর নিয়ে খোলামেলা আড্ডায় জয় সরকার।

স্বরলিপি দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ০২ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৯
সঙ্গীত, লোপামুদ্রা ও রাজনীতি— সব নিয়ে অকপট জয়

সঙ্গীত, লোপামুদ্রা ও রাজনীতি— সব নিয়ে অকপট জয় ছবি: সংগৃহীত।

ঘরের প্রতিটি কোণে সঙ্গীত সংক্রান্ত নানা অনুষঙ্গ। বাদ্যযন্ত্র, গানের রেকর্ড ও বেশ কিছু পুরনো অ্যালবামের সংগ্রহে সাজানো ঘর। স্বামী-স্ত্রী দু’জনের গানের জগতের বিভিন্ন টুকরো টুকরো মুহূর্ত দেওয়াল জুড়ে। সেই ঘরে বসেই গানের সফর থেকে নতুন কাজ, রাজনীতি— নানা বিষয়ে কথা বললেন জয় সরকার। শুনল আনন্দবাজার ডট কম।

প্রশ্ন: দীর্ঘ ১৭ বছর আগে দেওয়া কথা রাখলেন নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। আবার একসঙ্গে কাজ করছেন..

জয়: একক ভাবে সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছিলাম ওঁদের ছবি ‘অ্যাক্সিডেন্ট’-এ। সালটা ২০০৯। প্রযোজনা সংস্থা তখন উইন্ডোজ় নয়। নন্দিতাদি ও শিবুর খুব পছন্দের ছবি ছিল ওটা। গানগুলো শ্রীজাতের লেখা ও আমার সুর। তার পর থেকে যত বারই দেখা হয়েছে, ওঁরা বলেছেন, আমার একটা পাওনা রয়েছে। অবশেষে ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’ ছবির সঙ্গীত পরিচালনার জন্য আমার কাছে ফোন আসে ডিসেম্বর মাসে।

প্রশ্ন: ছবির সঙ্গীত ও আবহ দুই দায়িত্বেই আপনি?

জয়: হ্যাঁ! ওঁরা জানেন, আমি একক ভাবে কাজ করতে পছন্দ করি। সেটাও ওঁরা মনে রেখেছেন। আজকাল সবাই সব ভুলে যান। কিন্তু ওঁরা মনে রেখেছেন। এটা দৃষ্টান্তমূলক বিষয়।

প্রশ্ন: ছবির গান ও স্বাধীন গান— দুটোই একসঙ্গে করেন। ছবির গানের ক্ষেত্রের প্রযোজকের মতামত থাকে। সেই জায়গায় স্বাধীন গানবাজনায় নিজের স্বাধীনতা বেশি। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কী ভাবে বজায় রাখেন?

জয়: আমি দুটোকে আলাদা ভাবে দেখিই না। সঙ্গীত নিজেই একটা ‘ইন্ডিপেনডেন্ট আর্ট ফর্ম’। আমাদের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেরই হাজার বছরের উপর ইতিহাস রয়েছে। অন্য দিকে, চলচ্চিত্রের তো মাত্র ১০০ বছর বয়স হয়েছে। সঙ্গীত নানা শিল্পের সঙ্গে মেলবন্ধন করতে পারে। তা ছাড়াও, তার নিজস্ব পরিচিতি রয়েছে। ছবির গান হোক বা স্বাধীন কাজ, বিষয়টা তো ঘুরেফিরে গানবাজনাই!

্রশ্ন: কিন্তু চলচ্চিত্রজগৎ যেমন নিজেকে ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে, ভারতে কি সঙ্গীতজগৎ সেটা করে উঠতে পেরেছে?

জয়: এটা বিশ্বের অন্য কোনও দেশে কিন্তু হয় না। অথচ আমাদের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, লোকসঙ্গীত কত সমৃদ্ধ! এ দেশেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো শিল্পী রয়েছেন। তাই সঙ্গীত বলতেই যাঁরা ছবির গান ভাবেন, তাঁদের সাংঘাতিক সঙ্কীর্ণতা ও অজ্ঞতা প্রকাশ পায়।

প্রশ্ন: কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে যত সহজে ছবির গান পৌঁছে যায়, স্বাধীন গান কি তা পারে?

জয়: তার নেপথ্যে কিছু কারণ রয়েছে। গানবাজনার জগতে নানা টানাপড়েন থাকে। ছবিতে অনেকে বিনিয়োগ করেন। এক সময়ে অ্যালবামের জন্য রেকর্ডিং কোম্পানিগুলো খরচ করত। কিন্তু এখন আর তা হয় না। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে অনবরত ফরম্যাট পরিবর্তন হয়েছে। আগে রেকর্ড, ক্যাসেট, সিডির পরে এখন অনলাইন মাধ্যমে গান শোনা হয়।

প্রশ্ন: নতুন শিল্পীদের জন্য বেশ কঠিন পরিস্থিতি বলছেন?

জয়: হ্যাঁ, খুবই কঠিন। একসময় একজন শিল্পীর গোটা অ্যালবাম শুনে আমরা তাঁকে চিনতাম। আর এখন সিঙ্গল-এর যুগ। আবার এটাও ঠিক, আগে নিজেদের সীমিত পরিসরেই মানুষ গান শুনতে পেত। আর এখন সারা বিশ্বের মানুষ নির্দিষ্ট শিল্পীর গান শুনতে পান। আমার একটি গিটার অ্যালবাম মুক্তি পেয়েছে। সেটি আন্তর্জাতিক শ্রোতার কথা ভেবেই তৈরি করা। কিন্তু হ্যাঁ, ছবির ক্ষেত্রে প্রযোজকেরা থাকেন। গানের ক্ষেত্রে তো থাকে না!

প্রশ্ন: অরিজিৎ সিংহ প্লেব্যাক গাওয়া থেকে অবসর নিয়েছেন। নানা রকমের জল্পনা চলছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

জয়: অরিজিৎ একজন ‘কমপ্লিট মিউজ়িশিয়ান’। শুধু গান গাওয়া নয়, সবটায় ও পরিপূর্ণ। আমি প্রায় ২০ বছর ধরে ওকে চিনি।

প্রশ্ন: কোনও পরিবর্তন আসেনি ওঁর মধ্যে?

জয়: ও একেবারে এক রকম রয়েছে। ওকে দেখে মনে হয়, যেন কোনও রূপকথার চরিত্র। খ্যাতির শীর্ষে থেকেও একটা মানুষ মাটির এত কাছাকাছি থাকতে পারেন! এটা তো হয় না। এটা আমি কাউকে শিখতে বলি না। কারণ এটা শিখে হয় না। ও এই গুণটা নিয়ে জন্মছে। ও যে পারিবারিক আবহে বড় হয়েছে, তারই শিক্ষা এটা। ও সঙ্গীতটাকে উপভোগ করে। আনন্দ করে সঙ্গীতের মধ্যে থাকাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। অরিজিৎ এই আনন্দটা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে। আনন্দের জন্যই তো সঙ্গীতকে পেশা হিসাবে বেছে নিই আমরা। আর্থিক দিক থেকে তো খুবই অনিশ্চয়তা এই জগতে। ভালবাসার তাগিদেই এখানে আসা।

জয় ও অরিজিৎ একসঙ্গে।

জয় ও অরিজিৎ একসঙ্গে। ছবি- সংগৃহীত

প্রশ্ন: অরিজিতের এই ভালবাসার জায়গায় কি কোনও ভাবে প্রযোজকদের হস্তক্ষেপ বেড়ে গিয়েছিল? তাই এই ঘোষণা?

জয়: সেটা বলতে পারব না। তবে ও নিশ্চয়ই এমন একটা জায়গা খুঁজছিল, যেখানে নিজের মতো গাইতে পারবে। সঙ্গীত মানেই ছবির গান নয়, এটা তো ও নিজেও জানত। শিল্পীরা ‘স্যাচুরেটেড’ হয়ে গেলে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ওর ক্ষেত্রেও এমন কারণ হতেও পারে বলে আমার অনুমান।

প্রশ্ন: আপনারও কখনও এমন মনে হয়েছে?

জয়: হ্যাঁ। সালটা ২০১৭-১৮ হবে। গানবাজনা থেকে অনেক কিছু প্রত্যাশা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এটা কেন হচ্ছে, ওটা কেন হচ্ছে না, ওর কেন হচ্ছে, আমার কেন হচ্ছে না— এমন নানা ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তার পর নিজেই উপলব্ধি করলাম— আমি আনন্দের জন্য এসেছি গানে। কেন এত প্রত্যাশা করব? টিকে থাকার একটা লড়াই আছে ঠিকই। ওটাই তো শিল্পীর লড়াই।

প্রশ্ন: আপনি তো গান গাইতে পারেন! আরও বেশি করে গানটা গান না কেন?

জয়: আমার বাবা ও দাদা ভাল গান। গান গাইতে ভাল লাগত না। খুব ভয় লাগত, পাছে গলা ভেঙে যায়, উঁচু স্বরে যদি গলা না পৌঁছোয়। এখনও ভয় লাগে। গানের সঙ্গে কী কী বাজছে, সেই দিকে বেশি আগ্রহ ছিল। গিটার আমার প্রথম প্রেম। আমি কথা বলে মনের কথা যতটা প্রকাশ করতে পারি, তার চেয়ে বেশি প্রকাশ করতে পারি গিটার বাজিয়ে। ‘জয়লোপা এক্সপ্রেস’-এর অনুষ্ঠান হলে ২-৩টে গান এখন গাইতে হয়। লোপাই (লোপামুদ্রা) বলে দিয়েছে, গাইতেই হবে।

প্রশ্ন: লোপামুদ্রার সঙ্গে এখনও নিয়ম করে গান নিয়ে বসেন? বাড়িতে একসঙ্গে রেওয়াজ করেন আপনারা?

জয়: গান নিয়ে একসঙ্গে কাজ তো করিই। বাড়িতে তো ঝগড়াঝাঁটির মধ্যে আর গান হয় না (হাসি)। অবশ্য ঝগড়াই বা এখন কতটুকু হয়! বিয়ের তো ২৫ বছর হয়ে গেল।

প্রশ্ন: গান নিয়ে মতবিরোধ বা ঝগড়াঝাঁটি হয় না?

জয়: প্রচুর হয়েছে (হাসি)। ২০০১ সালে একটি রেকর্ড কোম্পানির জন্য ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ গানটি গাওয়ার কথা লোপার। আমি একেবারে অন্য ভাবে সঙ্গীতায়োজন করেছিলাম। সেটা শুনে লোপা স্পষ্ট বলে দেয়, ‘এই ট্র্যাকে গাইব না। লোকে ছি ছি করবে।’ আমিও বলে দিই, ‘আমি কাজটা করব না, অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নাও। আমি বদলাব না।’ সবে বিয়ে হয়েছে তখন আমাদের। আমাদের ঝগড়া শুনে মা-বাবা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন।

জয়-লোপা।

জয়-লোপা। ছবি- সংগৃহীত

প্রশ্ন: তার পর সঙ্গীতায়োজনে বদল আনলেন?

জয়: আমি কিছু পরিবর্তন করিনি। আরও এক বার লোপা শুনল গানটা। অবশেষে বলল, ‘ঠিক আছে, চলো এটাই করছি।’ ও আসলে ভয় পেয়েছিল। এই সঙ্গীতায়োজনের জন্য যদি কেউ কিছু বলে! আসলে গানবাজনার ক্ষেত্রে আমি কাউকে চিনি না। কে আমার স্ত্রী, কার সঙ্গে কী সম্পর্ক, এগুলো আমি সঙ্গীতের মাঝে আসতেই দিই না। সেটা লোপাও জানে। এখানে আমি ১০০ শতাংশ সৎ থাকি, তা হলে উল্টো দিকের মানুষটাও আমার সঙ্গে ১০০ শতাংশই সৎ থাকবে।

প্রশ্ন: আপস না করে অন্যদের সঙ্গে কাজে অসুবিধা হয়নি?

জয়: হয়েছে। অনেক কাজ ছেড়ে দিয়েছি। এমনও হয়েছে, অগ্রিম নেওয়া টাকা ফেরত দিয়ে দিয়েছি কাজটা করব না বলে। লোপা জানে, আমি খুব গোঁয়ার।

প্রশ্ন: অন্য শিল্পীরাও আপনার সুরে গান গেয়েছেন। এমন কোনও গান রয়েছে, যেটা শুনে লোপামুদ্রার মনে হয়েছে, ‘এই গান আমাকে দিয়ে গাওয়ালেও পারতে’?

জয়: কিছু দিন আগেই লোপা, জয়তী সবার একসঙ্গে একটি অনুষ্ঠান ছিল। আমার সুরে জয়তী একটি গান গায়। সেটা নিয়েই লোপা বলল, ‘ইশ! এটা মিস্ হয়ে গেল’। ওর কিন্তু আমার গানের উপর একটা অধিকারবোধ আছে। সেটা গায়িকা হিসাবে নয়। আমাকে গানগুলো তৈরি করতে ও সামনে থেকে দেখে। সেখান থেকে তৈরি হয়ে যায় এই অধিকারবোধ।

প্রশ্ন: আপনার দিক থেকেও সেই অধিকারবোধ রয়েছে?

জয়: হ্যাঁ। ওঁর গানবাজনাকেও আমি আমার গানবাজনাই ভাবি। এমনও কিন্তু হয়েছে, অন্য শিল্পীর জন্য হয়তো গান তৈরি করছি। পুরোটা তৈরি হওয়ার পরে মনে হল, এ গান তো লোপার কণ্ঠেই মানাবে। ‘যাও পাখি’ বলে একটি গান আছে লোপার। ওটা আসলে কিন্তু শ্রীকান্তদার গাওয়ার কথা ছিল।

প্রশ্ন: স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই সঙ্গীতশিল্পী। একসঙ্গে আপনারা কাজ করেন। তবে এর কি কোনও অসুবিধা রয়েছে ইন্ডাস্ট্রিতে?

জয়: এমন অনেক সময়ে মনে হয়, এই গানটা লোপা গাইলে ভাল হয়। কিন্তু অস্বস্তি হয় বলে কাউকে সেটা বলতে পারি না। লোপার দিক থেকেও এটা হয়। আগ বাড়িয়ে আমার হয়ে কোথাও ও কিছু বলে না।

প্রশ্ন: আচ্ছা আপনি তো রিয়্যালিটি শো-এর বিচারকের আসনেও থাকেন। রিয়্যালিটি শো-এর ফরম্যাটেও বহু পরিবর্তন এসেছে। এখন কি আর একে শুধু গানের প্রতিযোগিতা বলা যায়?

জয়: ২০১২ সালে প্রথম আমার কাছে ‘গ্রুমার’ হওয়ার প্রস্তাব আসে। সময় দিতে পারিনি। তখন বিচারক হওয়ার প্রস্তাব আসে। এখন যেটা মনে হয়, রিয়্যালিটি শো আসলে টি২০ ক্রিকেটের মতো। সেখানে মনোরঞ্জনকারী তৈরি হতে পারে। শিল্পী তৈরি হওয়া মুশকিল। ৫-৬ মাসের মধ্যে শিল্পী তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। এটা ঠিক, ওই মঞ্চে গাইতে গাইতে জড়তা কাটে। ব্যান্ডের সঙ্গে গানবাজনার অভিজ্ঞতা বাড়ে, লোকের চোখেও পড়ে যান অনেকে। সেটা সাময়িক। কিন্তু ভাল শিল্পী হওয়া যায় না।

প্রশ্ন: তা হলে ভাল শিল্পী হওয়ার পদ্ধতি কোনটা?

জয়: দীর্ঘ সময় এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সাধনা, শিক্ষা, প্রতিভা ও শ্রমের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাতে হয়। তার সঙ্গে আসে লড়াই। রিয়্যালিটি শো-এর মঞ্চে থাকায় দ্রুত খ্যাতি আসে, সমাজমাধ্যমে ফল‌োয়ার সংখ্যা বাড়ে। সেখান থেকে অনেকে দিগ্‌ভ্রষ্ট হয়ে যান প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও। যে শিল্পী হওয়ার, সে আসলে রিয়্যালিটি শো ছাড়াও শিল্পী হতে পারে। রিয়্যালিটি শো আগে সত্যিই প্রতিযোগিতাই ছিল। কিন্তু এখন স্টেজ শো-এর মতো হয়ে গিয়েছে। এখন গান গাওয়ার দক্ষতার চেয়ে অনেক অপ্রাসঙ্গিক জিনিস বেশি গুরুত্ব পায়।

প্রশ্ন: প্লেব্যাক গেয়ে নাকি তেমন কোনও উপার্জনই হয় না। জনপ্রিয় শিল্পীরাও অনেকে এমন দাবি করেছেন। তাঁদের উপার্জনের আসল উৎস মঞ্চের অনুষ্ঠান। তাই কি?

জয়: একসময় রেকর্ডিং কোম্পানিগুলি অ্যালবামের জন্য খরচ করতেন ঠিকই। কিন্তু তখনও কণ্ঠশিল্পী বা সুরকার, গীতিকাররা যে অনেক টাকা উপার্জন করতেন, তা কিন্তু নয়। আমার প্রথম জনপ্রিয় গান ছিল, ‘বৃষ্টি তোমাকে দিলাম’। শ্রীকান্তদা (শ্রীকান্ত আচার্য) গেয়েছিলেন ২০০০ সালে। সেই গানে সুর দিয়ে ও সঙ্গীতায়োজন করে আমি পেয়েছিলাম ১০০০ টাকা। ২০০৫ সালে শুভমিতার গাওয়া ‘বৃষ্টি পায়ে পায়ে’র জন্য পেয়েছিলাম ৫০০০ টাকা। এই দুটো গান আমাকে সঙ্গীতজগতে অনেক দিয়েছে।

প্রশ্ন: উপার্জনের মূল জায়গা তাহলে মঞ্চ। তাই কি সঙ্গীতশিল্পীদের গান নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছুটা আপস করতে হয়? শ্রোতাদর্শকের জন্য অপছন্দের গানও গাইতে হয়?

জয়: নতুন শিল্পীদের ক্ষেত্রে তো এটা খুবই হয়। তাঁরা সাধারণত কভার গান করেন। সেই কভার গানের জন্যই তাঁরা পর পর অনুষ্ঠান হয়তো পান। কিন্তু তিনি আর শিল্পী হয়ে উঠতে পারছেন না। নিজের পরিচিতি তৈরি হচ্ছে না। এখন যেমন অনুপম রায়, সোমলতা আচার্য ও ইমন চক্রবর্তীকে তাঁদের গান দিয়েই মানুষ চেনেন। নিজস্ব পরিচিতি রয়েছে ওঁদের।

প্রশ্ন: এঁদের স্বাধীন গানও রয়েছে। তবে এঁদের পরিচিতির নেপথ্যে কিন্তু ছবির গানেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।

জয়: হ্যাঁ, ছবির গানের মাধ্যমে ওঁদের চিনেছে মানুষ। তার পরে ওঁদের গান শুনেছেন। ৯০-এর দশকে আবার নচিদা, সুমনদা, শিলাজিৎদা, অঞ্জন দত্ত, মৌসুমী ভৌমিক, লোপা এঁদের কিন্তু পরিচিতি তৈরি হয়েছিল নিজস্ব অ্যালবাম থেকে। এখনও কিন্তু এঁদের গান শোনার জন্যই এঁরা অনুষ্ঠানে ডাক পান।

প্রশ্ন: এখন বিনোদনজগতের সঙ্গে রাজনীতির দুনিয়ার সম্পর্ক খুব কাছের। সঙ্গীতশিল্পীরাও রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। আপনার কাছে এসেছে প্রস্তাব?

জয়: আমার কাছে আসেনি। আমার মনে হয়, তাঁদের কাছেই রাজনীতির প্রস্তাব আসে, যাঁরা আসলে চান। এটা ‘ল অফ অ্যাট্রাকশন’। প্রত্যেকের কিছু শখ-আহ্লাদ থাকে। তবে সেটার একটা সীমা থাকে। এমন তো নয়, কোনও রাজনৈতিক ছাতার তলায় গিয়েই আমাকে শিল্পী হতে হবে। আমার নিজের কাজের প্রতি ভরসা থাকলে, এগুলোর প্রয়োজন পড়ে না। আর আমি ব্যক্তি হিসাবে মানুষের সঙ্গে কেমন ভাবে মিশছি সেটা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সমাজমাধ্যমে লিখলেই লোকে কোনও একটা দলের ছাপ দিয়ে দেয়।

প্রশ্ন: অরিজিতের গান ‘আর কবে’ একটি নির্দিষ্ট সময় তৈরি হয়েছিল। সঙ্গীত কি সত্যিই প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে?

জয়: আমার তা মনে হয় না। খুব দুঃখের সঙ্গেই বলছি, ছবি ও সঙ্গীত— এগুলি মানুষ বিনোদন হিসাবেই নেয়। একসময় আইপিটিএ-র দারুণ দারুণ গান হয়েছে। সেগুলি কিন্তু এখন শুধুই গান হিসাবে থেকে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে হয়তো গানগুলো কিছুটা ট্রিগার করতে পারে। কিন্তু দিনের শেষে আমরা মনোরঞ্জনকারী হয়েই থেকে যাই। সব গান তো ইতিবাচক কথাই বলে। তাও চারপাশে কত নেতিবাচকতা। তাই আমার মনে হয় না, গান সমাজ বদলাতে পারে।

প্রশ্ন: আপনি মুম্বই গেলেন না কেন?

জয়: একসময় ভেবেছিলাম। আসলে সুরকার হওয়ার ১২ বছর পরে আমি ছবিতে কাজ করার সুযোগ পাই। আর্থিক সমস্যাও ছিল। আমার একটা ফ্ল্যাট ছিল, সেখানে স্টুডিয়ো ছিল আমার। সেটা বিক্রি করে দিতে হয়। তখন ভেবেছিলাম মুম্বই চলে যাব। ঠিক তার পরেই ছবিতে সুযোগ আসে। সবটা বদলে যায়। স্থির করি, যা করব এখানেই করব। বাংলা ভাষায় করব। এখন মনে হয়, ওখান থেকে কাজের সুযোগ এলে, তা করব। কিন্তু এখানে থেকেই করব।

প্রশ্ন: তা হলে, সঙ্গীতশিল্পীদের আর্থিক জায়গা তেমন জোরালো নয়?

জয়: একদমই নয়। আগে আরও খারাপ ছিল। বলা হত স্বর্ণযুগ ঠিকই। কিন্তু সঞ্চয়ের পরিমাণ কম ছিল। এখন শিল্পীরা কিছুটা হিসেবি হয়েছে। কতটা খরচ করলে সঞ্চয় করা যাবে, সেই ধারণা স্পষ্ট হয়েছে। তা ছাড়া কিছু হলেই সবার আগে সঙ্গীতশিল্পীদের কাজই বন্ধ হয়ে যায়। করোনা অতিমারিই তার প্রমাণ। কত শিল্পী নিজেদের বাদ্যযন্ত্র বেচে দিয়েছেন। কেউ কেউ আর সঙ্গীতে ফিরতেই পারেননি।

প্রশ্ন: তা হলে কি সঙ্গীত ছাড়াও একটি স্থায়ী আর্থিক উপার্জনের জায়গা খোলা রাখা উচিত?

জয়: আমি তা সমর্থন করি না। এখানেই তো শিল্পীদের লড়াই করতে হয়। গানবাজনা হোলটাইমার ছাড়া হয় না। আমার বাবা সরকারি চাকরির পাশাপাশি গাইতেন। আমি ঠিক করেছিলাম, ঝাঁপ দিলে পুরোপুরি ঝাঁপ দেব।

Joy Sarkar Lopamudra Mitra Arijit Singh
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy