ছবির মাধ্যমেই মৃণাল সেনকে চেনা শুরু অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর। জীবনের বিভিন্ন পর্যায় মৃণাল সেনের ছবি দেখে তাঁকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করেছেন তিনি। তাঁর জীবনীচিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি মৃণাল সেনকে চেনা চঞ্চল চৌধুরীর। তাঁর জীবনদর্শন, বোধ, মনন— নতুন উপলব্ধি এনেছে অভিনেতার ব্যক্তি জীবনে। মৃণাল সেনের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে ভাগ করে নিলেন কাজের মানুষটিকে চেনার অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশ থেকে ফোনে বললেন অভিনেতা।
প্রশ্ন: মৃণাল সেনকে প্রথম চেনা কী ভাবে?
চঞ্চল চৌধুরী: মানুষটাকে চিনেছি অবশ্যই একজন নির্মাতা হিসাবে। ছোটবেলায় আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। ক্লাস টেন-এ পড়ার সময়েই সিনেমা দেখা শুরু করি। কলেজে পড়ার আগে ভিসিআরে সিনেমা দেখতাম। সেই সময়ই প্রথম ওঁর ছবি দেখি। যদিও সময়, বয়স এবং অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে ছবির অন্তর্নিহিত অর্থ বদলে বদলে গিয়েছে। সিনেমার মাধ্যমেই পরিচয় মৃণাল সেনের সঙ্গে। ওই নব্বই দশকের সময়। ওই সময়েই ওঁর ভক্ত হয়ে ওঠা। উপমহাদেশের তিন জন বড় পরিচালকের কথা মাথায় এলে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন এবং ঋত্বিক ঘটকের কথাই মাথায় আসে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নির্মাতাদের ছবি দেখি। একটা কাজ থেকে অন্য কাজ কী ভাবে আলাদা, কাজের ধরন দেখে সেটা বোঝার চেষ্টা করি। মৃণাল সেনের সব ছবিই আমার দেখা। আমার প্রিয় নির্মাতা। ওঁর ছবির গল্প বা নির্মাণ অন্য পরিচালকের থেকে একেবারেই আলাদা।
মৃণাল সেন (বাঁ দিকে), পরিচালকের চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী (ডান দিকে) ছবি: সংগৃহীত।
প্রশ্ন: তিনি স্রোতের বিপরীতে হাঁটা পছন্দ করতেন বলে মনে করেন?
চঞ্চল: আসলে ওঁর জীবনবোধ এবং দর্শন থেকে যেটা মনে করেছেন তিনি সেটাই করেছেন। পরিচিতির জন্য কখনও আপস করতে চাননি। আলাদা করে বিখ্যাত হওয়ারও চেষ্টা করেননি। ট্রেন্ডিংয়ের ধারকাছ দিয়েও ছোটেননি কোনওদিন।
প্রশ্ন: আপনার কাছে যখন মৃণাল সেনের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব এল, এক কথায় রাজি হয়েছিলেন?
চঞ্চল: না, প্রথমেই আমি রাজি হইনি। মৃণাল সেন একজন মহীরুহ। ওঁর নামভূমিকায় করতে হবে ভেবে খানিক অবাকই হয়েছিলাম। সৃজিতদা যখন আমায় এই ছবির প্রস্তাব দিলেন মনে হয়েছিল, আমি কী পারব? তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, আমি সাবলীল ভাবে অভিনয়টা পারব। কিন্তু ওটাই ছিল আমার চ্যালেঞ্জ। আমি মৃণাল সেনের ব্যক্তিত্ব বেশ কিছুটা যদি ধারণ করতে না পারি, তা হলে তো আর চরিত্র সম্পূর্ণ রূপ পাবে না। সৃজিতদার সঙ্গে একটা কাজ করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সেই সময় আগ্রহের থেকে ভয় বেশি ঘিরে ধরেছিল। আমার মনে হয়েছিল, আমি পর্দায় মৃণাল সেন হয়ে উঠতে পারব না।
প্রশ্ন: প্রস্থেটিক্স আপনাকে মৃণাল সেন হয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল?
চঞ্চল: একেবারেই! কিন্তু ব্যক্তি মৃণাল সেন হয়ে ওঠা সহজ ছিল না। চেহারায় মেকআপ দিয়ে কাছাকাছি ‘লুক’ আনা যায়। কিন্তু ব্যক্তিত্ব, চালচলন সবটা চরিত্রের মধ্যে দিয়ে দেখেই দর্শক বিশ্বাস করবেন। তাই সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জায়গায় ছিলাম না। এর পর আমার বাবা মারা গেলেন। সৃজিতদা বললেন ওঁর উপর ভরসা রাখতে। সেই থেকেই কথা শুরু হল। ওঁর বিষয়ে নানা বই পড়লাম। সৃজিতদা সিডি-ডিভিডি দিয়েছিলেন, সেটা দেখলাম। সিনেমায় তো সমাজ এবং বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটে। জীবনটাকে দেখা যায়। ওঁর সব সিনেমা আবার দেখালম। ওঁর উপর বই পড়ে যত না ওঁকে জানলাম তার থেকেও বেশি জানলাম ওঁর সিনেমা দেখে। তবু মৃণাল সেন হয়ে ওঠা অত সহজ নয়।
প্রশ্ন: ওঁর ছবি দেখে জীবন সম্পর্কে কী ধারণা হল আপনার?
চঞ্চল: মানুষের সামাজিক অবস্থান, তাদের পরিবার, শ্রমজীবী মানুষ, অবহেলিত মানুষ এবং তাঁদের জীবনদর্শন নিয়েই তাঁর অধিকাংশ কাজ, যা আমায় আকৃষ্ট করেছে। মানুষটা কোনওদিন খ্যাতির পিছনে ছোটেননি। নিজের নীতি আদর্শ থেকে ছিটকে যাননি। শত বাধা, শত লাঞ্ছনা, গঞ্জনা সহ্য করেছেন। তাঁর জীবনের আর্থিক সঙ্কটের কথা ‘পদাতিক’ করতে গিয়েই জেনেছি। তাঁর পারিবারিক জীবন, তাঁর প্রেম, সন্তান, তাঁর ব্যর্থতা, ঘুরে দাঁড়ানো, প্রতিজ্ঞা, সবটাই তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে। এটা খুবই কঠিন একটি কাজ। আমিও ব্যক্তিগত জীবনে অনেক লড়াই করেছি, তাই ওঁর জীবন আমায় ছুঁয়ে গিয়েছে।
প্রশ্ন: ব্যক্তি মৃণাল সেনকে উপলব্ধি করলেন কতটা?
চঞ্চল: মৃণাল সেনকে ব্যক্তিগত স্তরে জানার পর আমার জীবন সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি হয়। ওঁর মত মানুষ যাঁরা, কখনওই যাঁরা ব্যক্তিস্বার্থে নিজেকে বিক্রি করেন না। এটা আমার নিজের মত।
প্রশ্ন: ওঁর মতো নীতি-আদর্শে স্থির থাকা কি এই সমাজেও সম্ভব?
চঞ্চল: অনেকেই হয়তো পারেন, আবার অনেকেই পারেন না। আসলে সবাই তো মুখে সোনার চামচ নিয়ে জন্মান না। আজ আমার ছেলেকে সেই সংগ্রাম করতে হবে না, যা আমায় করতে হয়েছিল। কিন্তু যাঁদের বাবা মায়ের হয়তো সেই সামর্থ্য নেই, যোগ্যতা নিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছোতে চান, তাঁদের জন্য মৃণাল সেন বিরাট অনুপ্রেরণা।
প্রশ্ন: মৃণাল সেনের মতো সিনেমায় রাজনৈতিক বক্তব্য এখন কি দেখা যায়?
চঞ্চল: রাজনীতি আর আগের জায়গায় নেই। সেটা যে কোনও দেশেরই কথাই বলি না কেন। ওঁর সিনেমার মধ্যে ছিল সমসাময়িক রাজনীতি এবং যে জায়গাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার কথা সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন। শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তিনি যে কথা বলতে পেরেছেন, নিজের আদর্শের জায়গা থেকে যে ভাবে লড়াই করতে পেরেছেন এখন তা আরও জটিল।
প্রশ্ন: মৃণাল সেনের মতো সাহস এখনকার নির্মাতাদের মধ্যে দেখেন?
চঞ্চল: যে কোনও দেশের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে এখন রাজনীতি অন্য পথে হাঁটছে। নির্মাতারা এখন রাজনৈতিক বিষয় পাশ কাটিয়ে যান। কারণ রাজনৈতিক বক্তব্য থাকলে নানা জটিলতায় পড়তে হয়। কিন্তু সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক সকলের কাজেই সামাজিক বক্তব্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্যও উঠে এসেছে। এখন সিনেমা বিনোদনের জন্যই হয়। বিচ্ছিন্ন কিছু কাজ ছাড়া। এই কারণেই এখন নির্মাতাদের কাজে সমাজ এবং রাজনীতি অনুপস্থিত থাকে। সিনেমার মাধ্যমে যদি রাজনীতিককে চোখে আঙুল দিয়ে ভুল দেখানো হয় তা হলে শিল্পমাধ্যমে তাঁর টিকে থাকাই মুশকিল হবে। কারও মতাদর্শের বিরুদ্ধে গেলেই সমস্যা। রাজনৈতিক প্রতিশোধটা এখন মারাত্মক আকার আকার করেছে। এখন নেতিবাচক বিষয় কেউ মেনে নিতে পারেন না কেউ।
প্রশ্ন: লুক সেটের পর নিজেকে আয়নায় দেখে কী ভাবলেন?
চঞ্চল: আসলে নিজেকে দেখে অবাক হয়ে চেয়েছিলাম। আসলে ওঁকে ছবিতেই দেখেছি। আমার বাবা শুটিংয়ের কিছুদিন আগেই মারা গিয়েছিলেন। বাবার সঙ্গে মৃণাল সেনের আদলের মিল ছিল। আমি শুটিংয়ে মৃণাল সেন হয়ে ওঠার পর বাবার কথা ভুলে যেতাম। ঠিক যেই মেকআপ তুলতাম আবার বাবার কথা মনে পড়ত, মন খারাপ হত। নানা স্মৃতি ঘিরে ধরত আমায়। আমি আবার চিত্রনাট্যে মন দিতাম তখন। বাবার যুবক বয়সের ছবি দেখে মৃণাল সেনের সঙ্গে মিল পেয়েছিলাম। আর অদ্ভুত ভাবে আমার এক ভক্ত বাড়ির উঠোনে বসা বাবার কয়েকটি ছবি তুলেছিলেন। বাবা চলে যাওয়ার পর সেই ছবি পাই। দেখে মনে হয়েছিল যেন মৃণাল সেনেরই ছবি। আসলে আমার নিয়তিতে লেখা ছিল এই চরিত্রটা করা। তাই করতে হয়েছে।
প্রশ্ন: বাবা হিসাবে উনি কেমন?
চঞ্চল: আসলে মৃণাল সেনের সঙ্গে কুণাল সেনের খুব বন্ধুত্ব ছিল। বাবা মায়ের সঙ্গে ঠিক যেমন বন্ধুত্ব থাকা উচিত। আমার সঙ্গে আমার ছেলেরও বন্ধুত্ব আছে। সে ক্ষেত্রে মিল পেয়েছি। পরবর্তী কালে কুণাল সেনের সঙ্গেও দেখা হয়েছে। শিকাগোতে ছবি দেখানো হয়েছিল তখন। আমি কুণাল সেনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম কোনও এক মুহূর্তের জন্য হলেও মনে হয়েছিল বাবার মতো লাগছে? তিনি জানিয়েছিলেন এক জায়গায় নয় বেশ কয়েকটি জায়গায় মনে হয়েছে এ তো বাবা। এটাই আমার পরম প্রাপ্তি। তখন খানিক আফসোসও হয়েছিল, মনে হল কুণাল সেনের সঙ্গে আর কয়েকদিন আগে যদি দেখা হত তা হলে যেন আরও ওঁর সম্পর্কে জানতে পারতাম। আর চরিত্রটা হয়তো আরও ভাল ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতাম। দুর্ভাগ্য আমার, বাবা চলে যাওয়ার পর এতটাই আবেগতাড়িত ছিলাম যে এতটা সময় পেলাম না।
প্রশ্ন: যদি কোনওদিন ওঁর সঙ্গে দেখা হত কী বলতে চাইতেন?
চঞ্চল: এটা তো স্বপ্নের বাইরে। কল্পনার কথা। ওঁর সঙ্গে দেখা হলে আগে একটা প্রণাম করতাম। বলতাম, আপনার শুধু কাজ নয়, আপনার সিনেমা বা শুধু একজন নির্মাতা হিসাবেই নয়। আপনার ব্যক্তিজীবনটাও আমার কাছে অনুসরণীয়। আমি চেষ্টা করব, আপনার জীবনদর্শনকে নিজের ভিতর ধারণ করার।