×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৩ মে ২০২১ ই-পেপার

মেয়েদের দেখার চশমার পাওয়ার চেঞ্জ

স্বরলিপি ভট্টাচার্য
১৭ এপ্রিল ২০১৫ ১৭:৪৯

কেউ স্রেফ ক্যানসারের আশঙ্কায় বাদ দিচ্ছেন ডিম্বাশয়। কেউ বা ‘মাই বডি মাই চয়েস’ রবে হিট বাড়াচ্ছেন ইউটিউবে। আবার এক দল স্যানিটারি ন্যাপকিনে প্রতিবাদ ঝোলাচ্ছেন ক্যাম্পাস ওয়ালে। দুনিয়া জুড়ে এ সবই কি প্রচারে থাকার স্ট্র্যাটেজি? না কি মেয়েদের দেখার চশমাটা বদলে ফেলল সমাজ?

ইতিহাস বলছে দ্রৌপদীকে পাঁচ ছেলের হাতে ভাগ করে দিয়েছিলেন শাউড়ি। সীতার পতিভক্তি তো মাউন্ট এভারেস্ট অথবা গ্রামোফোনের প্রভুভক্ত কুকুরটার মতোই ইয়েস বস। বঙ্কিমের নারীদের বিয়ে হত বারো বছরে। আর এখন ওবামাকে বরণ করছেন সেনাবাহিনীর মহিলা প্রধান, শর্মিলা চানুর প্রতিবাদ স্যালুট পাচ্ছে দুনিয়া জো়ড়া। তবু একটা রানাঘাট, একটা দিল্লি আর অনেক ইন্ডিয়াজ ডটার কিছু অপ্রিয় প্রশ্ন তুলছে। ওয়ান ইজটু ওয়ান ভাবনাটা কোথাও ক্লিক করছে কি?

পারফেক্ট সেলেবের ডেফিনিশন লেখা হতে পারত যাঁকে নিয়ে সেই অ্যাঞ্জেলিনা দিন কয়েক আগেই কাঁচি চালালেন ওভারিতে। স্রেফ ক্যানসারের আশঙ্কায়। হেলথ কনশাসনেশের বিরাট মেডেল ঝোলাবেন যে বুকে, সেটাও তো অপরেশন থিয়েটারে রেখে এসেছেন। ফার্স্ট বলেই স্ট্রেট ব্যাটে স্টেপ আউট করেছিলেন পুং-বীরদের। আর এ বার সপাট লাথিতে স্রেফ কোমায় পাঠিয়ে দিলেন। তাতে আপনি মহিলা সমিতির আরাধ্যা দেবী হয়ে উঠলেন বটে, কিন্তু নিন্দুকেরা বলছেন, ধাপে ধাপে না এগিয়ে একবারেই সেক্স চে়ঞ্জ করে ফেলো না বাওয়া! আশঙ্কার যদি এই দাওয়াই হয় তবে তো বেতো রোগীর হাঁটু-স্কোয়ার বা গনোরিয়ার ভয়ে ‘ওই’টাই বাদ দিতে হয়! কলেজ ক্যান্টিনের ফোক্ক়ড়দের প্রশ্ন, ‘‘ব্রেন ক্যানসারের জুজুবু়ড়ি আবার ব্র্যাড ঘরণীকে মেসেজ পাঠালো না তো!’’

Advertisement

এটা কি নেহাতই গিমিক? সাহিত্যিক তিলোত্তমা মজুমদারের মতে, “অ্যাঞ্জেলিনা যা করেন তাতেই তো শিরোনামে জায়গা পাকা। তাই অর্গান বাদ দেওয়াটা গিমিক নয়। এ প্রসঙ্গে মাইকেল জ্যাকসনের কথাও বলা যায়। আসলে এই মাপের সেলেবরা খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে মানসিক ভাবে খুব একলা হয়ে পড়েন। নিজের শরীর নিয়ে এক্সপেরিমেন্টের মধ্য দিয়ে সেই অস্থিরতার প্রকাশ ঘটে। এটা প্রচলিত নারীবাদী ভাবনা থেকে নেওয়া স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নয়।”

গিমিক বলতে রাজি নন অভিনেত্রী পাওলি দামও। পাওলি এখন ক্যানসার আক্রান্ত ‘তিস্তা’র ভূমিকায়। মুঠোফোনে বললেন, “অ্যাঞ্জেলিনার ঘটনাটা অ্যাওয়ারনেস বা কনসাশনেস বলব। ব্যক্তিগত ভয়ের জায়গা থেকেই এই পদক্ষেপ। ”

পাওলির সুরেই মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তার জায়গা থেকেই অ্যাঞ্জলিনার এই পদক্ষেপ। সেক্স অর্গানের বাইরেও যে নারী সৌন্দর্য রয়েছে এটা তারই বার্তা। কিন্তু এটা কি কোনও নতুন ট্রেন্ড? অনুত্তমার সাফ জবাব, “ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে শুধু ভয়ের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্ত নেবেন না। নিজেকে দেখার নতুন চোখ তৈরি করুন। মনে রাখবেন সুন্দরের পাশাপাশি আপনার অসুন্দর হওয়ারও অধিকার রয়েছে।” তিলোত্তমা মনে করেন, মানুষ শেষ পর্যন্ত জীবন ভালবাসে। এমন নিশ্চয়তা যদি থাকে যে অঙ্গ বাদ দিলে ক্যানসার হবে না, তা হলে মানুষ তাই করবে।

অন্য দিকে, ফেসবুক সমুদ্রে জয়জয়কার যাবতীয় মেগা কালচারের পীঠস্থান যাদবপুরের। সম্রাট যুদ্ধ ঘোষণায় হাতে তুলে নিতেন তরোয়াল, কবি কলম, শিল্পী তুলি, তিতুমির একটা বাঁশ জোগাড় করেছিলেন, আর যাদবপুর ন্যাপকিন। প্রতিবাদের গুরুত্বকে টেনে নামাচ্ছি না। কিন্তু বিষয়ের থেকে মাধ্যম বেশি ফুটেজ পেলে প্রতিবাদের গুরুত্ব খাটো হয় বৈকি! আরও একটা ‘হোক কলরব’ আলোড়ন দেখে কলকাতা। যা মানতে নারাজ যাদবপুরের ‘পিরিয়ডস্’। “স্যানিটারি ন্যাপকিন এমন একটা জিনিস যেটা প্রকাশ্যে দেখলে প্রথমেই একটা ঝটকা লাগে। আমাদের প্রতিবাদটা পৌঁছে দিতে মানুষকে সেই ধাক্কাটাই দিতে চেয়েছিলাম,” বক্তব্য ‘পিরিয়ডস্’-এর তরুণ তুর্কীদের।

কিন্তু ন্যাপকিন নিশান উড়িয়ে যা ইচ্ছে তাই-এর দল কোন ‘আচ্ছে দিন’ দেখাবে আপনাকে? পাওলির দাবি, “গ্রামে গিয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে শিক্ষিত করতে হবে। এ ভাবে কয়েক জনের প্রতিবাদে মেয়েদের নিয়ে সমাজের ধারণা কিছু বদলাবে না।” তিলোত্তমাও মনে করেন, “বিজ্ঞ়াপন স‌ংস্থা বহু দিন আগেই নিঃশব্দে ন্যাপকিন ঢুকিয়েছে আমাদের ড্রইংরুমে। এতে কোনও অভিনবত্ব নেই”।

নারী শরীর আতসকাচের তলায় ছানবিন তো চলবেই, কিন্তু লাভ? সব মিলিয়ে নারী সম্পর্কে ধারণা বদলাচ্ছে। প্রত্যেক প্রতিবাদের নতুন সংলাপ মানুষকে ভাবাচ্ছে বলেই মনে করেন সেলেবরা। তাই কি অ্যাঞ্জেলিনা ফেমিনিন আইকন। আর কর্কটের বাসা ভাঙতে জরায়ু বাদ দেওয়া ছোটপিসির পাত্রই জুটল না!

Advertisement