• মধুরিমা দত্ত
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সিনেমা তৈরির পাঠে দুই কেন্দ্রের দুই ছবি কলকাতায়

Roopkala Kendra
রূপকলা কেন্দ্র।

Advertisement

ঘটনা এক: হাতেকলমে কাজ শিখতে প্রয়োজন আধুনিক কম্পিউটার। তা নেই।

কম্পিউটারে নির্বিঘ্নে কাজের জন্য প্রয়োজন অত্যাধুনিক সফ্‌টওয়্যার, প্রজেক্টর। তা-ও নেই।

কম্পিউটার ঠিক রাখতে প্রয়োজন অ্যান্টিভাইরাস প্রযুক্তি। সে সবও নেই।

এমনকী, নেই গ্রন্থাগারিকও।

ঘটনা দুই: নিয়মিত কর্মশালা।

সম্পাদনার জন্য ব্যবহার করা হয় উন্নতমানের সফ্‌টওয়্যার। আলো এবং শব্দক্ষেপণের যন্ত্রও রয়েছে অত্যাধুনিক মানের।

যে সমস্ত ক্যামেরা ব্যবহার করা হয় সিনেমা তৈরি শিখতে, তা বিশ্বমানের। এবং তা ব্যবহারের জন্য  পড়ুয়াদের রয়েছে অবাধ ছাড়পত্র।

দু’টি ঘটনা এই রাজ্যেরই দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। প্রথম নেই রাজ্যটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রকের আওতায় থাকা রূপকলা কেন্দ্র। দ্বিতীয় প্রাচুর্যনগরীটি কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের আওতায় থাকা সত্যজিত্ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (এসআরএফটিআই)।

যদিও রূপকলা কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে চোখ রাখলেই মিলবে হরেক প্রতিশ্রুতি। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে মুড়ে থাকার কথা ওয়েবসাইটে উল্লেখ থাকলেও পড়ুয়াদের অভিযোগ, প্রযুক্তির অভাবে পঠনপাঠনই শিকেয় উঠেছে। বিশেষ করে অ্যানিমেশন বিভাগে হাতেকলমে শিখতে গিয়ে বার বারই পড়ুয়াদের সমস্যায় পড়তে হয়।

অন্য দিকে, এসআরএফটিআই-তে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির অধিকাংশই উচ্চমানের। দেশের বাইরে যে প্রযুক্তিতে কাজ শেখানো হয়, এসআরএফটিআইতে মজুত রয়েছে প্রায় সব ক’টিই। শুধু তাই নয়, পড়ুয়াদের কাছে এই যন্ত্রপাতির ব্যবহারও সহজসাধ্য। রূপকলার এক ছাত্রী জানান, অ্যানিমেশন এমন এক বিষয় যাতে প্রতি দু’বছর অন্তরই নতুন নতুন সফ্‌টওয়্যারের মাধ্যমে কাজ শিখতে হয়। ‘‘সবসময় আধুনিকতম প্রযুক্তিতে আমাদের কাজ শেখার কথা, যাতে বৃহত্তর প্রতিযোগিতার বাজারে আমরা এগিয়ে থাকতে পারি। কিন্তু আধুনিক তো দূরের কথা, প্রাথমিক চাহিদার যন্ত্রপাতিই নেই আমাদের।’’— জানান তিনি।

এসআরএফটিআইয়ের এক পড়ুয়া জানান, পরিকাঠামোগত বা প্রযুক্তিগত কোনও সমস্যায় তাঁদের কখনও পড়তে হয় না। ‘‘এমন উন্নতমানের ক্যামেরা ভারতের কোনও ফিল্ম স্কুলে খুব কমই রয়েছে। আর যেহেতু আমরা নিজে হাতে সেই সব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারি তাই কাজ শেখার মানও বেড়ে যায় স্বাভাবিক ভাবেই।’’

কিন্তু রাজ্য সরকারের কেন্দ্র রূপকলার এমন দশা কেন?

১৯৯৫ সালে ভারত এবং ইতালি সরকারের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয় রূপকলা কেন্দ্র। যার অ্যানিমেশন বিভাগের মূল লক্ষ্য ছিল গ্রামোন্নয়নের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র তৈরি করা। কিন্তু পরিকাঠামো এবং প্রযুক্তির অভাবে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রের জগতে কার্যত বন্ধ্যা হয়ে পড়েছে রাজ্য সরকারের রূপকলা কেন্দ্র। কেন্দ্রের প্রাক্তন অধিকর্তা সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘রূপকলা আসলে দিশাহীনতায় ভুগছে। কোন ধরনের প্রকল্প করলে ভাল হয়, কী ভাবে আরও সময়োপযোগী চলচ্চিত্র তৈরি করা যায় এ নিয়ে কোনও ভাবনাচিন্তাই নেই।’’

কিন্তু একই রাজ্যে দুই প্রতিষ্ঠানে এমন বৈপরীত্য কেন?

রাজ্যের আমলাতন্ত্রের প্রভাব যে রূপকলার অন্দরেও গিয়ে পড়েছে এ নিয়ে একমত কেন্দ্রের প্রাক্তন কর্তাদের অনেকেই। বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে যে ভাবে আমলাতন্ত্রের মুখাপেক্ষী হতে হয়, তাতে আখেরে ক্ষতি হয় কাজেরই— মনে করছেন শিক্ষকেরা। অন্য দিকে, কেন্দ্র সরকারের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে থাকার ফলে সেই সমস্যায় প্রত্যক্ষ ভাবে ভুগতে হয় না এসআরএফটিআইয়ের পড়ুয়াদের।

সত্যজিত্ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (এসআরএফটিআই)।

অন্য একটি সমস্যার কথাও তুলে ধরেছেন এক কর্মকর্তা। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব মিস্ত্রি তৈরি নয়। বরং চিন্তার উন্মেষ ঘটানো। ‘‘পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়াতে যে ভাবে ঋত্বিক ঘটক নিজে পড়াতেন, চিন্তাভাবনার আকর ছড়াতেন, রূপকলাতে তেমন দিশা দেখানোর মানুষ কই?’’— প্রশ্ন ওই কর্তার। ফিল্ম তৈরির খুঁটিনাটি শেখার স্বপ্ন নিয়ে আসা এক পড়ুয়া তবে কেন অপর্যাপ্ত পরিকাঠামোর এক প্রতিষ্ঠানে আসবে? সরকারি হওয়ার পঠনপাঠনের খরচ রূপকলাতে বেশ কম, জানান এক শিক্ষক। কিন্তু শিক্ষার পরিবেশই যদি না থাকে, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তো আখেরে পিছিয়েই পড়তে হবে এই পড়ুয়াদের।

কী বলছেন দুই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তনীরা?

এসআরএফটিআইয়ের প্রাক্তনী হরিন্দর সিংহ জানান, প্রতিষ্ঠান কখনওই প্রতিভা তৈরি করে না, কিন্তু আমাদের প্রতিভাগুলোকে আকার দেওয়া বা সঠিক পথে চালিত করার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানেরই। ‘‘সেই দায়িত্ব এসআরএফটিআই নিপুণ ভাবেই পালন করে। প্রযুক্তিগত, পরিকাঠামোগত কোনও সমস্যাই আমাদের নেই সেই অর্থে, এখানকার গ্রন্থাগারও বিশ্বমানের। আমার কাছে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফিল্মস্কুলের মধ্যে এসআরএফটিআই একটি।’’

রূপকলাকেন্দ্রের প্রাক্তনী প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য অবশ্য মনে করেন সমস্যা সমস্ত প্রতিষ্ঠানেই অল্পবিস্তর থেকে থাকে। কিন্তু রূপকলা থেকে পড়াশোনা করে সিনেমা জগতে ভাল কাজ করছেন এমন উদাহরণও নেহাত কম নয়। ‘‘আমি রূপকলার প্রথম ব্যাচের পড়ুয়া। তখন যন্ত্রপাতি আরও কম ছিল। কিন্তু এখনও যদি সেই আমলের যন্ত্রপাতি দিয়েই কাজ চালানো হয় তা হলে সত্যিই মুশকিল।’’ তবে দিশাহীনতাই যে  রূপকলাকেন্দ্রের সমস্যার গোড়ার কথা সে নিয়ে একমত তিনি। কোথাও যেন আক্ষেপই শোনা যায় এই প্রাক্তনীর গলাতেও, ‘‘বেশ বুঝতে পারি কোথাও যেন এখন বাঁধুনিটা আলগা হয়ে গিয়েছে রূপকলার। অথচ, এমনটা হওয়ার তো কথা ছিল না।’’

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন