Advertisement
E-Paper

আফসোস রয়ে গেল, সহজের বড় হওয়াটা আর দেখা হল না ভাইয়ের, কত পরিকল্পনাও আর পূরণ হল না!

গত ২৯ মার্চ মৃত্যু হয়েছিল অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেই ঘটনার পর কেটেছে গোটা একটি মাস। ভাইকে হারানোর যন্ত্রণা এখনও দগদগে দাদা অনির্বাণের মনে।

অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:০০
রাহুলের স্মৃতিতে ডুব দাদা অনির্বাণের।

রাহুলের স্মৃতিতে ডুব দাদা অনির্বাণের। ছবি: সংগৃহীত।

এক মাস হয়ে গেল। ভাই নেই। আজ তো আবার ভোট। ৩০ দিন আগেও ভাবিনি এমন একটা সময় আসবে। ওকে ছাড়া দিন কাটাতে হবে আমাদের। ভোটের দিন তো, সহজ-প্রিয়াঙ্কারা কতটা আসতে পারবে এই বাড়িতে, জানি না। তবে মা যাবেন ভোট দিতে। আমি থাকব সঙ্গে। আমার কাঁধে তো গুরুদায়িত্ব দিয়ে গিয়েছে ভাই। এই কয়েক দিনে বার বার একটাই প্রশ্ন মনে ঘুরছে আমার, কী করে ঘটে গেল এমনটা? হয়তো আমি পুলিশে এফআইআর করিনি। কিন্তু আমি চাই সঠিক তদন্ত হোক। আমার ভাইকে কী করে হারালাম? সেই উত্তর চাই আমি।

গত ১৪ বছর ধরে আমি বাড়ির বাইরে। মা আর ভাই-ই তো একসঙ্গে থাকত। সারা ক্ষণ মায়ের সুবিধা-অসুবিধা, খুঁটিনাটি সবটাই তো ভাই দেখত। আমিও তাই বাইরে কিছুটা নিশ্চিন্তেই থাকতাম। আমার থেকে ছ’বছরের ছোট ছিল ও। আমাদের সম্পর্কটা ছিল স্নেহ আর সম্ভ্রমের।

পরিবারের সঙ্গে বিশেষ মুহূর্তে রাহুল

পরিবারের সঙ্গে বিশেষ মুহূর্তে রাহুল ছবি: ফেসবুক।

ছোটবেলায় মাকে বলতাম ভাই এনে দাও, খেলব। মা খালি বলতেন, যে-ই আসুক, সে যেন সুস্থ হয়। তার পরে যখন ভাই আসে, ফুটফুটে সুন্দর যেন দেবশিশু। একটুও চোখের আড়াল করতাম না ওকে। আমি তো ভাবতাম, বাড়িতে এসেই আমার সঙ্গে খেলবে। সব খেলনা গুছিয়ে রেখেছিলাম একসঙ্গে খেলব বলে। ছোটবেলার এই মুহূর্তুগুলো বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে। ছোটবেলায় ও ‘র’ উচ্চারণ করতে পারত না। সেটাও ভারী মজার ছিল। এটা কি ওর চলে যাওয়ার বয়স হল? মাকে তো সামলাতেই পারছিলাম না। এখনও মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে ডুকরে উঠছেন।

সে দিনই ঘুমের মধ্যে মা বলছিলেন, “এত আগলে রাখতাম ওকে, তাও ধরে রাখতে পারলাম না!” ২৯ মার্চ ও চলে গেল। তার ১২ দিন আগেই আমি আয়ারল্যান্ড ফিরেছিলাম। প্রায় ২৫ দিন টানা কলকাতায় ছিলাম। তখন তো আমরা পরিকল্পনাও করেছিলাম যে, মা আর ভাই আমার ওখানে যাবে। আয়ারল্যান্ডে কিছু দিন আগে আমি নিজের বাড়ি কিনেছি। তার পরেই ভেবেছিলাম মা আর ভাই যাবে আমার ওখানে। সেই মতো সব আলোচনাও করেছিলাম আমরা। একসঙ্গে কাটানো সেই ২৫ দিন আমার কাছে এখন স্বপ্নের মতো।

আমি আর ভাই একসঙ্গে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দেখতে গিয়েছি। একসঙ্গে খেতে গিয়েছি। ১৭ মার্চ তারিখ আমাকে বিমানবন্দরেও তো ছাড়তে গিয়েছিল। তখন কি জানতাম...!

আমি সায়েন্স-টেকনোলজির মানুষ। কিন্তু ভাইয়ের জ্ঞান ছিল বিভিন্ন জিনিস নিয়ে। ‘সহজকথা’ ছাড়াও পরিকল্পনা করেছিল আরও চ্যানেল খোলার। একটার নাম ভেবেছিল ‘অবাক পৃথিবী’। সারা সপ্তাহে অবাক হওয়ার মতো কিছু ঘটনাকে এক জায়গায় করে বলবে বলে ঠিক করেছিল। কত তথ্যচিত্র শুট করার পরিকল্পনা করেছিল। সব কিছু অপূর্ণ রয়ে গেল।

আমার কাজ আর ওর কাজ তো সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। গত এক বছরে প্রথম বার দুই ভাই মিলে এই সব নিয়েও কাজ করছিলাম। যেখানে অন্যান্য জগতের মানুষদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথাও ভেবেছিল ও। আমরা আলোচনা করতাম। আগে কথা হত শুধুই বাড়ি, মা, খেলাধূলা নিয়ে। এই এক বছরে আলোচনা হয়েছে ওর এই নতুন ধরনের কাজকে কেন্দ্র করে।

সহজের বড় হওয়া দেখা হল না রাহুলের, আফসোস অভিনেতার দাদার।

সহজের বড় হওয়া দেখা হল না রাহুলের, আফসোস অভিনেতার দাদার। ছবি: ফেসবুক।

আমাদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই সে ভাবে কোনও দিন ঝগড়া, মারামারি হয়নি। ভাই আসায় আমি না একটা সঙ্গী পেয়েছিলাম। বিজয়া দশমীর দিন ওর জন্ম হয়, ভোর ৫টার সময়ে। ঠাকুরদা নাম দিয়েছিলেন তাই অরুণোদয়। আর ‘শুকতারা’ থেকে বেছে ডাকনাম দিয়েছিলেন বাবা। তাই এই বছরের পুজোয় কিছুতেই কলকাতায় থাকবেন না মা। আমাকে বলেছেন, পুজোর সময়ে কলকাতায় থাকা মায়ের পক্ষে সম্ভব নয়। ভেবেছি, এমন ভাবে ভিসার আবেদন করব, যাতে ১৬ অক্টোবর ভাইয়ের জন্মদিনে যেন মা আমার ওখানেই থাকেন। কাগজপত্রের কিছু সমস্যা থাকায় পাসপোর্ট ছিল না মায়ের। পাসপোর্ট তৈরির জন্য আবেদন করেছি। যত তাড়াতাড়ি সেটা হয়ে যাবে, মাকে নিয়ে যাব আয়ারল্যান্ডে। ওখানে আমার স্ত্রী, দুই ছেলে-মেয়ে আছে। কিছুটা ভাল লাগবে, পরিবেশও পরিবর্তন হবে।

১৫ মে আমাকে আয়ারল্যান্ডে ফিরতে হবে। ছেলের দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা। তাই যেতেই হবে ওই সময়টা। ওর পরীক্ষার জন্যই এই পরিস্থিতিতে আসতে পারেনি ওরা কলকাতায়। এক দিকে ভাইকে হারানো, সঙ্গে বাস্তবের সঙ্গে লড়াই। কাউকে বলতে পারছি না আমার মনের অবস্থা ঠিক কী!

ভাইপোর সঙ্গেও ভাল বন্ধুত্ব রাহুলের দাদার।

ভাইপোর সঙ্গেও ভাল বন্ধুত্ব রাহুলের দাদার। ছবি: ফেসবুক।

সহজ আমার ভাইপো ও খুব পরিণত, শক্ত। ভাইয়ের কাজের দিন তো আমরা একসঙ্গে বসেছিলাম। দু’জনে মিলে শেষকাজ করেছি। দেখছিলাম ওকে, কী মনের জোর। না, ভাইকে নিয়ে ওর সঙ্গে কোনও কথা বলতে পারিনি। আমরা গান নিয়ে গল্প করেছি। লেখা নিয়ে গল্প করেছি। সহজের মধ্যে ভাইয়ের অনেক ছাপ রয়েছে।

বাবিনও তো খুব বই পড়তে ভালবাসত। রবিবার ও চলে গেল। শুক্রবার চারটে বই কিনেছিল। একটা বই কোনও এক জনকে উপহার দেয়। আর তিনটে বই নিজের জন্য রেখেছিল। সেগুলো তো আর পড়া হয়নি ওর। ভাইয়ের ছবির সামনে ওই তিনটে বই রেখে দিয়েছি। খুব আফসোস হচ্ছে। আমরা তো হারিয়েছি কাছের মানুষকে। কিন্তু ভাইয়ের তো কত কী করা বাকি ছিল। কত কী দেখার বাকি ছিল। সহজের বড় হওয়াটা আর দেখা হল না।

প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে আনন্দের মুহূর্তে রাহুল।

প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে আনন্দের মুহূর্তে রাহুল। ছবি: ফেসবুক।

ওর নিজের পরিকল্পনাগুলো রয়েই গেল। সব শূন্যস্থান তো আমি পূরণ করতে পারব না। কিন্তু চেষ্টা করব মানসিক ভাবে সহজ-প্রিয়াঙ্কার পাশে থাকার। যত তাড়িতাড়ি সম্ভব মাকে নিয়ে যাব আয়ারল্যান্ডে।

Rahul Arunoday Banerjee Tollywood
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy