আইসক্রিমের গাড়ি ভর্তি বাচ্চাদের নিথর দেহ। গাজা-ইজরায়েল লড়াইয়ের সময় ছবিটা ইন্টারনেটে ঘুরেছিল বেশ কিছু দিন। তার পর আস্তে আস্তে ইন্টারনেটের সঙ্গে জনমানসেও আবছা হয়েছে ছবি। কিন্তু গাজার জীবনে আতঙ্ক ফিকে হয়নি।
খাস কলকাতায় বসে সেই মৃত্যু উপত্যকার কথা বলছিলেন ফয়জল আবু আলহায়জা। অবাক হচ্ছিলেন শহরে নিশ্চিন্ত ভিড় দেখে। চেকপোস্ট আর ট্যাঙ্কারের ভিড় নেই, ভয় নেই— এমনটা তাঁদের দেশে হয় না।
প্যালেস্তাইনের জেনিন থেকে কলকাতায় এসেছেন ওসামা, ফয়জল, ইউসুফরা। জেনিনের এক চিলতে শরণার্থী শিবিরে তৈরি হওয়া নাটকের দল ‘ফ্রিডম থিয়েটারে’র সদস্যরা এসেছেন তাঁদের দেশের কথা শোনাতে। ওঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে নয়াদিল্লির জন নাট্য মঞ্চ (জনম)। প্রতিবাদের ভাষা আর প্রতিরোধের আগুনে মুছেছে ভাষার তফাত, ভূগোলের দূরত্ব। দু’টি দল মিলে মুম্বই, কেরল, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, পটনা কলকাতা-সহ দেশের ১১টা শহরে পরিবেশন করেছে ‘দ্য ফ্রিডম জাঠা’। দেখিয়েছে তাদের নাটক ‘হামেশা সমিদা’। বাংলায় যার মানে ‘সর্বদা অটল’।
বন্দুকের সামনে অনড় শিল্পীদের প্রতিবাদের নজির তো দেখেছে ভারতও। দেখেছে এম এম কালবুর্গী গোবিন্দ পানসারে-কে। ফয়জলের কথায়, ‘‘ভারতের সঙ্গে আমাদের অনেক মিল। স্বাধীনতার জন্য ভারতের লড়াইয়ের ইতিহাস আছে। আমরাও পশ্চিমী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছি সেই ১৯৪৮ থেকে।’’
মিল আছে ইতিহাসেও। জনমের সুধন্য দেশপাণ্ডে মনে করিয়ে দিলেন, ১৯৮৯ সালে ‘হল্লা বোল’ নাটকের মঞ্চেই খুন হয়েছিলেন জনমের প্রতিষ্ঠাতা সফদর হাসমি। ২০১১ সালে একই ভাবে মঞ্চে অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীর হাতে খুন হন ফ্রিডম থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ানো মের-খামিস!
এই সব মিলের কারণেই ফয়জল-ইউসুফরা এ দেশে এসে সমাদর পেয়েছেন, ভালবাসা পেয়েছেন। সর্বত্র এই উষ্ণতা মেলেনি কিন্তু। ব্রিটেনের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে যেমন হোঁচট খেলেন ইউসুফ, ‘‘ওরা তো আমাদের জঙ্গি ভাবে!’’ ফয়জল বললেন, ‘‘লন্ডনের বিমানবন্দরে নেমেই বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছিল। প্রতিটা শো-য়ে বিক্ষোভ হয়েছে। তবু আমরা নাটক দেখিয়েছি ওদের। বলতে চেয়েছি, বোঝাতে চেয়েছি। জঙ্গি নই। এ আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ।’’
কলকাতায় এসে, নাটক দেখিয়ে আপ্লুত ওঁরা। ফয়জল জানালেন, আবার আসবেন অন্য কোনও নাটক নিয়ে। বললেন, ‘‘যে যতই অস্ত্র শানাক, শিল্প তো নষ্ট হয় না। থেকেই যাবে। গোটা ভারতকে নাটক দেখানোর স্বপ্ন নিয়ে ফিরছি। ফিরে আসব। ইন আ নিউ ডন।’’
অন্য গানের ভোরে? বাংলার এই গানটির কথা তাঁকে জানাতেই লাফিয়ে উঠলেন ফয়জল। বললেন, ‘‘বলেছিলাম না, ভারতের সঙ্গে আমাদের অনেক মিল!’’